কোহিনূর রহস্য পর্ব:৮

অর্পণ (শঙ্খচিল) ভট্টাচার্য্য
5 রেটিং
126 পাঠক

এবার পারস্যে কোহিনূর..

১৭৩৯ এর মে মাসের ষোলো তারিখে সর্বনাশা সাতান্ন দিনের দিল্লি আবাসের পর নাদির শাহ পারস্য ফেরার যাত্রা শুরু করলেন। সঙ্গে নিলেন আট পুরুষের মুঘল ঐশ্বর্য। তাঁর সবচাইতে বড় অর্জন ছিল কোহিনূর আর তিমুর রুবি খচিত ময়ূর সিংহাসন। কিন্তু তা বাদ দিয়েও যে পরিমান ঐশ্বর্য তিনি লুট করেছিলেন তা বহন করতে তাঁর ৭০০ হাতি ৪০০০ উট আর ১২০০০ ঘোড়া চালিত শকট লেগেছিলো। ফেরার পথে জায়গায় জায়গায় ‘উলঙ্গ কৃষকের দল’ (নাদির শাহের সভা-ঐতিহাসিক অস্ত্রাবাদী এইভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন) বাটপারি করেছিল।

Nadir Shah, Shah of Persia (1732–1747) | Art UK

এছাড়াও নাদির শাহের বাহিনীর অনেক সৈন্যও বেশ কিছু মূল্যবান সামগ্রী সরিয়েছিলো। চন্দ্রভাগা অতিক্রমের সময় অনেক সেনা নদীতটের বালিতে গর্ত করে তাদের হাতিয়ে নেওয়া সামগ্রী লুকিয়ে রেখেছিলো পরে কোনো সময় ফিরে এসে সংগ্রহ করবে বলে। বর্ষার প্লাবনে কিছু উট জলে তলিয়ে যায়। হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রমের সময় কিছু শকটের স্থান হয় গভীর খাদে। তবে লুটের সিংহভাগ সামগ্রী নাদির শাহ তাঁর সাথে খোরাসান নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। পরে তিনি তাঁর ‘রত্নসজ্জিত দপ্তর’ (বহুমূল্য তাঁবু) ও ময়ূর সিংহাসন হেরাটে পাঠিয়ে দেন। নাদির লুটের সামগ্রী নিয়ে এক বিশাল প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন সেখানে। আব্দুল করিম পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে এই প্রদর্শনীর বিবরণ দিয়েছেন। এক বিশাল রত্নখচিত তাঁবুর ভেতরে রাখা থাকতো সমস্ত সামগ্রী – ময়ূর সিংহাসন ছাড়াও ছিল নানা মাপের রত্নখচিত রাজদণ্ড, ঘোড়ার লাগাম, তরবারি, বর্ষা, ঢাল। হিরে, মুক্তো, লোহিতক, চুনি, পান্না ইত্যাদি বিভিন্ন রত্ন ও বহুমূল্য কাপড়ে সুসজ্জিত ছিল তাঁর তাবু। তাঁবুটির স্তম্ভ, এমনকি ব্যবহৃত পেরেকও ছিল সোনা ও রুপোর তৈরী। তাঁবুর ছাদের সাতটি অংশ ছিল, যা বহন করতে একটি হাতির প্রয়োজন হতো। তাঁবুর বাকি অংশ বহন করতে প্রয়োজন পড়তো আরও ছ’টি হাতির। নাদির শাহের শাসনকালে হেরাটের দিওয়ান খানায় যে কোনো অনুষ্ঠানেই নাদির শাহ সাধারণের জন্য এই প্রদর্শনীর আয়োজন করতেন।

দু’বছর পর ১৭৪১ এর মে মাসের এক দিনে নাদির তাঁর হারেমের মহিলাদের নিয়ে বেরিয়েছিলেন প্রমোদ ভ্রমণে। তেহরানের কাছে এলবুর্জ পর্বতের এক গাছপালায় ঢাকা সরু উপত্যকা দিয়ে যখন যাচ্ছিলেন তখন তাঁর ওপর বন্দুকবাজের হামলা হলো। সিসের গুলি নাদিরের হাত ঘেঁষে লাগলো তাঁর লাগাম ধরা হাতের বুড়ো আঙুলে, আর গুলি ঢুকে গেলো তাঁর ঘোড়ার ঘাড়ে। ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে নাদির হলেন আহত। কয়েক সপ্তাহ পর সেরে উঠে তদন্তে তিনি জানতে পারলেন এই হামলার পেছনে তাঁর নিজের সন্তান রেজা কুলির চক্রান্তের কথা। শাস্তিস্বরূপ নিজের সন্তানের চোখ উপরে ফেলবার আদেশ দিলেন। শাস্তি সমাপনে একটি থালায় নিয়ে আসা হলো রাজকুমারের দুটি চোখ। তা দেখে নাদির নাকি দুঃখে চিৎকার করে তাঁর সভাসদদের জিজ্ঞেস করেন, ‘কে পিতা? কে পুত্র?’
এই ঘটনার পর নাদির মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েন। দিন দিন তাঁর পাগলামোর মাত্রা বেড়ে চলে। যেখানেই যেতেন সেখানকার মানুষদের ওপর চালাতেন নিপীড়ন ও নৃশংস অত্যাচার। নিরাপরাধ মানুষদের ওপর চালাতেন অমানবিক অত্যাচার। গণ-মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত মানুষের খুলির ভয়াবহ স্তম্ভ শোভা পেত তাঁর সেনাবাহিনীর যাত্রাপথে।

১৭৪৭-এ বিদ্রোহীদের হাতে পারস্য সম্রাট নাদির শাহের মৃত্যুর পর তাঁর দেহরক্ষী বাহিনীর নেতা আহমদ খান আবদালি সারারাত যুদ্ধ করে সম্রাটের হারেমকে রেখেছিলেন সুরক্ষিত। এই বিশ্বস্ততার মূল্য হিসেবে রানীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন নাদিরের সেই কোহিনূর আর তিমুরের রুবি খচিত বাজুবন্ধনী। সেই রাতেই তিনি তাঁর বাহিনী দ্বিখণ্ডিত করে এক অংশ পাঠালেন হেরাতের দিকে, পারসিক বিদ্রোহীদের বিভ্রান্ত করবার কৌশল হিসেবে। আর নিজে মূল বাহিনী নিয়ে নিরাপদে ফিরে এলেন কান্দাহারে, কোহিনূর সুরক্ষিত ছিল তাঁর বাহুতে।

Why didn't Ahmad Shah Abdali rule in India after defeating the ...
বাদশাহ আহমদ শাহ দুররানি

কথায় আছে, ভাগ্যবানের বোঝা ভগবানে বয়। এদিকে ঠিক সেই সময়েই নাদিরের পদাতিক বাহিনীর পাহারায় সোনা, মূল্যবান রত্ন ও প্রচুর মুদ্রা বোঝাই শকট এসে পৌঁছলো কান্দাহারে। আহমদ খান সেই সম্পদের দখল নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা বা সময় ব্যয় করলেন না। আবদালি জনজাতির নেতা আহমদ শাহ সেই সম্পদের কিছু ব্যয় করলেন অন্য পাঠান জনজাতির সমর্থন আদায়ের উদ্দেশে। কয়েক মাসের মধ্যেই ১৭৪৭ এর জুলাইয়ে কান্দাহারের অদূরে শের সুর্খ -এর দরগায় বছর চব্বিশের তরুণ আবদালি জননায়ক আহমদ শাহের মাথার পাগড়ির ওপর সুফি দরবেশ স্থাপন করলেন এক গোছা যবের শীষ; শুধু আবদালি জনজাতির নয়, সমস্ত পাঠান জনজাতির নেতা নির্বাচিত হলেন তিনি। উপাধি পেলেন বাদশাহ, দুররান-ই-দুররান (উৎকৃষ্টতম মুক্তো)। আহমদ খান আবদালি পরিচিত হলেন বাদশাহ আহমদ শাহ দুররানি নামে।

আহমদ শাহ প্রথমে দখল নিলেন হেরাত ও কাবুল শহরের। এরপর তাঁর চিন্তা-নায়ক নাদির শাহের মতোই তিনি নজর দিলেন হিন্দুস্থানের ওপর। একে একে দখল করলেন লাহোর, মুলতান, পশ্চিম পাঞ্জাব। ধ্বংস করলেন অগণিত শিখ উপাসনা গৃহ। অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরও রক্ষা পেলো না তাঁর ধ্বংসাত্মক আক্রমণের হাত থেকে। ভূস্বর্গ কাশ্মীরও পদানত হতে বেশি সময় নিলো না।গুরুর দেখানো পথেই চেলাও ১৭৪৮ থেকে ১৭৬৭, এই উনিশ বছরে সর্বমোট আট বার ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। না, ভারতবর্ষে আফগান শাসন কায়েম করবার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না তাঁর। নাদির শাহের নারকীয় লুন্ঠনের পরেও ভারতবর্ষ তখনও ছিল বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র। আর গুরু নাদির শাহের মতোই আহমদ শাহ দুররানির একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সেই সম্পদ লুন্ঠন করে আফগানিস্তানে ফেরত গিয়ে পরজীবীর জীবন যাপন। দিল্লিবাসীর উপর তাঁর এই উপর্যুপরি অত্যাচার নাদির শাহের বর্বরতাকেও হার মানিয়ে দেয়।

Who won the Battle of Panipat? - Quora
পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ

আহমদ শাহের আট বার ভারত আক্রমণের মধ্যে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ন ছিল ১৭৬১ সালের জানুয়ারি মাসে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ। এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে মারাঠা জোটশক্তির শোচনীয় পরাজয় হয়; সেনানায়ক সদাশিবরাও ভাউ আর পেশোয়া-পুত্র বিশ্বাসরাও ভাট সহ মৃত্যু হয় আঠাশ হাজার মারাঠি সেনার। তেষট্টি হাজারের আফগান-মুঘল সম্মিলিত শক্তি, সেই সময়ের নিরিখে অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের সাহায্যে পঁয়তাল্লিশ হাজারের মারাঠা সেনাকে পিষে ফেলতে সময় নিয়েছিল শুধু একটা দিন।

পরদিন আহমদ শাহ সিরহিন্দের সুফি দরগায় উপস্থিত হলেন, বাহুতে তাঁর কোহিনূর সুরক্ষিত।কোহিনূর যিনি ধারণ করতেন, তিনি পৌঁছতেন সাফল্যের শিখরে, ক্ষমতার শীর্ষে। আহমদ শাহ দুররানিও পৌঁছলেন সাফল্যের শিখরে, ক্ষমতার শীর্ষে। সমস্ত দৃশ্যমান শক্তিকে তিনি করেছিলেন পদানত।

পরবর্তী পর্বে জানবো কোহিনূরের বর্ণময় ইতিহাসের পাশাপাশি কিচু বিবর্ণতার সাক্ষী থাকার কথা.. কেমন লাগছে জানাতে থাকুন..
©️শঙ্খচিল 

চিত্র সৌজন্য : গুগল

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 1 Average: 5]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত