ব্লু ডায়মন্ড রহস্য

শান্তনু দাস
5 রেটিং
424 পাঠক

( ১ )

মাকড়সার জাল

ঝড়ের গতিতে ট্রেন ছুটে চলেছে । জানলার বাইরে চোখ রেখে আছি । মাথার উপর কখন জ্বলন্ত সূর্য উঠেছে খেয়ালই হয়নি । গলানো গিনির মত রোদের বুকে সন্তরণরত শঙ্খচিলের ডানা । জল টলমলে খালগুলো জানালার বাইরে দিয়ে ছুটে চলেছে । হঠাৎ একটা ছুটন্ত ট্রেন বিশ্রী শব্দ করে প্রকৃতির বেনিয়াসহকলা মাড়িয়ে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল আমাদের ট্রেনটা অতিক্রম করে । পাশের সিটে ইন্দ্রদার দিকে চোখ ফেরালাম । দেখি তখনও “ স্পাইডার নোট ” বইটা নিয়ে পড়ে আছে । তিনদিন আগে ইন্দ্রদার সঙ্গে দেখা করতে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক এসেছিলেন । তাঁরই গ্রামে আমরা আজ যাবার জন্য বেরিয়েছি । সরাইঘাট এক্সপ্রেসে রিজার্ভেশন পেতে অসুবিধে হয়নি । এর আগে অবশ্য আমি পৌষ মেলার সময় শান্তিনিকেতন এসেছি । আর তাছাড়া বীরভূমে সবচেয়ে বড় অ্যাডভেঞ্চার হয়েছিল ইন্দ্রদার সঙ্গে মামাভাগ্নে পাহাড়ে । সোমনীল বাবুর মৃত্যু রহস্যের কিনারা করার পর ইন্দ্রদার ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে তেমন কোনো কাজও ছিল না । আর আমার তো স্কুলের পরীক্ষার এক মাস আগে ছাড়া বাকি দিনগুলো ঝাড়া হাত পা । তাই রহস্যের কথা না ভেবেই অনেকটা লাল মাটির টানেই দুজনে বেরিয়ে পড়লাম । যাইহোক তিনদিন আগে সেই বিকেলটার কথা না বললে আজকের গল্পে ঢুকতেই পারবো না ।

ইন্দ্রদা ফোনে তখন ঝিলিকদির সাথে কথা বলছিল । আর আমি মিস ঝিলিক সেনগুপ্তের দিদি তকমাটা কবে বউদিতে রূপান্তরিত হবে সেটা ভাবতে ভাবতে জানলার বাইরে একটা মাকড়সার জাল বোনা দেখছিলাম । তখনই কলিং বেলটা সশব্দে বেজে উঠল । আমি দরজা খুলতেই একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোককে দেখতে পেলাম । বয়স ষাটের কাছাকাছি , ফরসা গায়ের রং , মসৃণ ত্বকে এতটুকু কুঞ্চন নেই , বিস্তৃত কপাল , গোল মুখ , কাঁচাপাকা চুল সযত্নে পেছনে ওলটানো , মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতরে ঝকঝকে চোখকে ঘিরে অলৌকিক ব্যাক্তিত্ব । আমি ঘরে ডেকে ওনাকে সোফায় বসতে দিলাম ।

“ আমার নাম গুরুচরণ পাত্র । তুমিই নিশ্চয় ইন্দ্রজিৎ সান্যাল আর তুমি সৌম্য , তাই তো ? ”

“ হ্যাঁ সৌমাভ । ” … আমি বললাম ।

“ তোমাকে তুমিই বলছি , কিছু মনে কোরো না , আসলে তুমি যে এতটা ইয়ং ডিটেকটিভ জানতাম না । দার্জিলিঙে ক্রিকেট রহস্যের সমাধান হবার পর তোমার নাম আমি খবরের কাগজে দেখেছিলাম । ”

“ আই ডোন্ট মাইন্ড । কিন্তু আপনি আমার কাছে … ”

ভদ্রলোক আমার কাছে এক গ্লাস জল চেয়ে নিয়ে প্রায় পুরো জলটুকু শেষ করে বলতে শুরু করলেন … “ দেখো আমি তোমার কাছে না এসে পুলিশে ইনফরম করতে পারতাম । কিন্তু আমার সমস্যাটা আপনার মত … মানে তোমার মত একজনই সমাধান করতে পারে । গত কয়েকদিন থেকে একজন আমাকে ফোনে হুমকি দিচ্ছে এই বলে যে আমার সেই মহামূল্যবান ব্লু ডায়মন্ডটা না দিলে আমাকে খুন করবে । ”

“ ব্লু ডায়মন্ড ? ” … আমি জিজ্ঞেস করলাম ।

“ হ্যাঁ আমার কাছে বহু পুরাতন বাদশাহি আমলের একটা নীল হীরে আছে । আমার প্রপিতামহ আমায় ওটা দিয়েছিলেন । সেই হীরেটার দাম আজকের বাজারে কয়েক লাখ টাকার মত । অনেকে এসেছেন ওটা কিনবার জন্য । আশি লাখ পর্যন্ত দিতে রাজি … তবুও আমি ওটা বিক্রি করিনি … আর কোনদিনও করবো না । আমার মৃত্যুর আগে ওটা আমি মিউজিয়ামে দিয়ে যাবো ভেবেছি ।  ”

“ হীরেটা কি আপনার চুরি গেছে গুরুচরণ বাবু ? ” … আমি বললাম ।

“ অ্যাঁ … ”

“ বলা হচ্ছে যে হীরে চুরির জন্য আপনি এখানে এসেছেন ? না আপনাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে ? ” … ইন্দ্রদা বলল ।

“ হীরে আমার চুরি যায়নি ঠিকই ইন্দ্রজিৎ বাবু … কিন্তু কেউ যে আমার সঙ্গে মস্করা তামাসা করে হুমকি দিচ্ছে না , সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত । ”

“ আপনাদের বাড়ি কি বীরভূমের দিকে ? ”

“ কথাবার্তার টান শুনে মনে হচ্ছে তো ? ঠিকই ধরেছো । ”

“ আচ্ছা আপনাদের বাড়িতে টেলিফোন নেই ? মোবাইল ? ”

“ হ্যাঁ আছে । আমি ওসব ব্যবহার করিনা । তবে তোমার মনের প্রশ্নটা বুঝতে পেরেছি । আমি তো তোমাকে ফোনে সব বলতে পারতাম , কেন এতদূর ছুটে এলাম , তাই তো ? একটা কথা তোমার জানা দরকার , আমাকে যে ফোনে কেউ হুমকি দিচ্ছে বা আমি তোমার কাছে যে আজ এসেছি আমার বাড়ির লোক কেউ জানে না । ”

“ বুঝলাম । আপনাদের ফ্যামিলিতে আর কে কে আছেন ? ”

“ আমার স্ত্রী এক বছর হল মারা গেছে । আছে আমার দুই ছেলে সূর্যকান্ত আর চন্দ্রকান্ত । ছোট ছেলে চন্দ্রর বিয়ে হয়নি । সূর্যর স্ত্রী নমিতা আর ওদের ন বছরের ছোট ছেলে বুবাই । তাছাড়া বাড়িতে গাড়ির ড্রাইভার আর কাজের লোক । ”

ভদ্রলোক একটু থামলেন । পরনের হাই নেক পাঞ্জাবি থেকে পানের একটা ছোট প্লাস্টিক কৌটো বের করে একটা পান মুখে পুরে আবার বলতে শুরু করলেন …

“ দেখো আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না , তাই আগে থাকতেই তোমার কাছে এসেছি । তোমরা আমাদের বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন স্বচ্ছন্দে থাকতে পারো । সেখানে তেমন কিছু ঘটবে না এমন তো কোনো গ্যারান্টি নেই । তাছাড়া যে আমাকে হুমকি দিচ্ছে তাকে ধরতে পারলে আমি তোমাকে আমার উপযুক্ত পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত করবো না । ”

ইন্দ্রদা সোফা ছেড়ে জানলার দিকে উঠে গেছে … “ পারিশ্রমিকটা বড় কথা নয় । তবে আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে একটা অজানা রহস্য জাল বুনতে শুরু করেছে । গুরুচরণ বাবু আপনার এই তেমন কিছু ঘটবে না কথাটার মধ্যেই অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে । আমি আপনার বাড়ি যেতে রাজি । তবে এখানে আমার অফিসে কিছু কাজ আছে … সেগুলো সেরে তিনদিন পর যাবো । তবে আমার সঙ্গে আমার এই সহকর্মীটিও যাবে , আপনাদের লাল মাটির দেশে বেশ কিছুদিন ঘোরা যাবে । ”

“ অনেক ধন্যবাদ । এই নাও আমার ঠিকানা । ডিটেলে লেখা আছে । স্টেশনে আমার গাড়ি অপেক্ষা করবে । ” … ভদ্রলোকের মুখে পান ছিল বলে অস্পষ্ট লাগলো কথাগুলো ।

ভদ্রলোক চলে যাবার পর আমি বললাম … “ ব্যাস এত সুন্দর ঘুরতে যাবার একটা বড় সুযোগ এত সহজে চলে আসবে ভাবতেই পারিনি ইন্দ্রদা । তবে তুমি যাই বলো এই ধরনের কেসে রহস্যের চেয়ে ঘুরতে যাবার আনন্দটাই বড় । ”

“ কিন্তু কেসটা আমার কাছে মোটেও সহজ মনে হচ্ছে না সৌম্য । ভদ্রলোক হীরেটা নিয়ে যে খুব উদ্বিগ্ন মুখ দেখলেই টের পাওয়া যায় । সবথেকে বড় কথা উনি বাড়ির কাউকে না বলেই এখানে এসেছেন । তার মানে ছেলেদের বা বৌমার প্রতি কি তাঁর একটুও বিশ্বাস নেই ? নাকি অন্য কোনো কারনে এই গোপনতা ? নাকি উনি বাড়ির কাউকে সন্দেহ করছেন । ”

“ ভদ্রলোকের কাছে যে ডায়মন্ডটা সত্যি আছে কিনা সেটাই বিশ্বাস হচ্ছে না । ”

“ আছে আছে আমার মন বলছে আছে । আর সেটা নিয়ে কিছু ঘটতে চলেছে । সেদিন লিসেস্তার হেমিংওয়ে নামে এক ফরেইন লেখকের স্পাইডার নোট বইটা পড়ছিলাম । ” … ইন্দ্রদার দৃষ্টি জানালার বাইরে মাকড়সার জালটার দিকে । তখন দক্ষ কারিগরের মত মাকড়সাটা জাল অনেকটা বুনে ফেলেছে ।

“ জানিস সৌম্য … মাকড়সার জাল ছিঁড়ে যাবার আগে নিজের স্বাভাবিক দৈর্ঘ্যের পাঁচগুণ বড় হতে পারে । এই জালের আর এক নাম অর্ব । প্রথমে ঘাসের শিষ বা উঁচু বেড়ার ডগা থেকে একটা সুতো তৈরি করে এরা মুখের লালা দিয়ে । পরে ঐ সুতো থেকে অত্যন্ত টাইট সুতো লাগানো হয় যাকে জাম্পার বলে । এই সুতোতেই পোকামাকড় এসে আটকে পড়ে । জালটা থেকে সোজা আর একটা সুতো চলে যায় মাঝখানে মাকড়সার কাছে যার কাঁপুনিতে এরা বুঝতে পারে শিকার পড়েছে । আশ্চর্য ! ভাবা যায় না সৌম্য । আমার গোয়েন্দা জীবনের হাজার রহস্যের থেকেও রহস্যময় এই মাকড়সার জাল । গুরুচরণ পাত্রের ব্লু ডায়মন্ড রহস্যটাও এবার ক্রমে ক্রমে জাল বুনছে … এখনও তিনদিন অপেক্ষা করতে হবে । ”

( ২ )

একটা খুন

“ কতক্ষণ অপেক্ষা করছেন ইন্দ্রজিৎ বাবু ? ” … একটা অচেনা আওয়াজ শুনে আমি আর ইন্দ্রদা পিছনে ফিরে তাকালাম । দেখি বয়স ত্রিশ বত্রিশের একটা লোক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমাদের দিকে চেয়ে আছে , বেতের মত ছিপছিপে চেহারা , নাক মুখ কাটা কাটা , তামাটে গায়ের রং , পরনে হাই নেক গেঞ্জি আর ঘেয়ো কুকুরের মত জিন্স ।

“ আপনিই ইন্দ্রজিৎ সান্যাল তো ? আমি জ্যাক , গুরুচরণ বাবুর ড্রাইভার । ”

ইন্দ্রদা হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল । আমরা পাশে একদিকে দাড়িয়ে থাকা একটা রংচটা ট্যাক্সিতে উঠে পড়লাম ।

“ আপনাদের কোনো অসুবিধে হয়নি তো ? ”

“ না । আচ্ছা আপনি কতদিন এ বাড়িতে কাজ করছেন ? ”

“ কদিন কি বলেন ? দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হয়ে গেল । ”

ইন্দ্রদা গাড়ির মধ্যেই প্রশ্ন শুরু করে দিয়েছে দেখে আমি বাইরের দিকে তাকালাম । গাড়ি চলেছে লাল মোড়াম রাস্তার উপর দিয়ে কড়কড় করে । একপাশে ধানক্ষেত আর একপাশে টালির চালের বাড়ি , কিছু দোতলা মাটির বাড়ি । দু চারটে পাকা বাড়ি কদাচিৎ চোখে পড়ে । সুন্দর এক গ্রাম্য পরিবেশ । সন্ধ্যে হতে চলল … পশ্চিমে সান্ধ্য আকাশটাকে কেউ যেন ডিমের কুসুম ফাটিয়ে ঘেঁটে দিয়েছে । এক অপার্থিব নৈসর্গিক আভা পেন্টের কালারের মত সুন্দর প্রতিভাত হচ্ছিল ।

আমাদের ট্যাক্সিটা জ্যামিতির প্যারাবোলার মত কাঁচা রাস্তা দিয়ে বেঁকে একটা কালো লোহার গেটের কাছে এসে থামলো । গুরুচরণবাবু আমাদের জন্য বাইরেই অপেক্ষা করছিলেন । চারপাশটা তখন অন্ধকার । কিন্তু তবু বুঝতে পারছিলাম চারপাশের সুন্দর একটা বাগানসহ গুরুচরণবাবুর দোতলা বাড়িটা বেশ সৌখিন ।

সূর্যকান্তবাবুর ছোট ছেলে বুবাই ছাড়া সকলের সাথেই আলাপ হল । একতলার তিনটে রুম ছাড়া রয়েছে একটা বড় ডাইনিং । একটাতে গুরুচরণবাবু অন্য দুটোতে থাকে সূর্যকান্ত ও চন্দ্রকান্ত । দোতলার দুটো রুমের একটাতে থাকে বাড়ির পার্মানেন্ট ড্রাইভার জ্যাক আর অন্যটা আমাদের জন্য রেডি করা ছিল । কথায় কথায় জানতে পারলাম হুমকির ঘটনাটা আজ সকালে বাড়ির সবাইকে বলেছেন তিনি । কালকে ব্লু ডায়মন্ডটা দেখানোর কথা বলে গুরুচরণ বাবু সবার সাথে আমাদের আলাপচারিতা সারলেন । এরপর চলল টুকটাক কথাবার্তা আর আপ্যায়ন পর্ব ।

গুরুচরণবাবুর ঘর থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের হালকা সুর ভেসে আসছিল । সূর্যকান্ত সৌখিন মানুষ , গ্রামের পোস্ট অফিসে চাকরি করেন , যথেষ্ট গম্ভীর সংযত , একদম বেশি কথা বলেন না । চন্দ্রকান্ত ঠিক তার উল্টো । এখনও পর্যন্ত বেকার , বেশি কথা বলেন , সহজ সরল সাধারন মানুষ । সূর্যকান্তের স্ত্রী নমিতা দেবী যথেষ্ট বুদ্ধিমতি , সংযত , লালিত্যময় , ছেলে বুবাইকে দেখাশোনা ছাড়া সংসারটা তাকেই চালাতে হয় । ড্রাইভার জ্যাক সারাটা দিন বাইরে থাকে শুধুমাত্র খাবার আর শোবার সময়টি ছাড়া । চাকর বলতে আছে একজন , নাম লালন , রাতে এ বাড়িতে থাকে না ।

আমি আর ইন্দ্রদা দোতলার রুমে এলাম । ঘরটা বড় নয় , পাশাপাশি দুটো বেড , দুটো জানলা , চেয়ার টেবিল রয়েছে । আমার একটু গরম বেশি লাগে তাই জানলার ধারের বেডটাই পছন্দ করলাম । কলকাতার তুলনায় এখানকার গরমটা বেশ চিড়বিড়ে । চলল আর এক প্রস্থ টিফিন পর্ব । সেলোফেনে মোড়া দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাজে সাড়ে আটটা । ড্রাইভার জ্যাক তখনও আসে নি । হঠাৎ দেখি লোডশেডিং । জানালার পর্দার আড়ালে দেখা যাচ্ছে আকাশের ভরাট চাঁদ । নিচের মোরাম রাস্তার উপর পাতলা রুপালি পথ বিছিয়ে দিয়েছে জ্বলন্ত জ্যোৎস্না । গাছগুলো থেকে ভেসে আসা মিষ্টি সুবাস ঘরে ঢুকছে । পাশাপাশি কোনো বাড়ি নেই বলে চারপাশটা রহস্যময় । কালো আর সবুজের ছায়াস্পর্শে অজস্র জোনাকি নক্ষত্রের মত মিটমিট করছে । বিশ্বভারতীর ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে প্রায় ত্রিশ কিমি দূরে গুরুচরণবাবুদের এই নিঃশব্দ গ্রাম ।

নমিতাদেবী আমাদের হ্যারিকেন দিয়ে গেলেন আর বললেন … “ আমাদের এই গ্রাম্য এলাকায় একটাই সমস্যা কারেন্ট চলে যাওয়া । আজ এমারজেন্সিটাও চার্জে বসানো হয় নি । একটু মানিয়ে নিন আপনারা । ” … উনি চলে গেলেন । কিছুক্ষণ বাদে আমাদের দরজার আড়ালে কারোর ছায়া দেখতে পেলাম ।

ইন্দ্রদা বলল … “ বুবাই ভেতরে এসো । ”

দেখলাম একটা আট নয় বছরের ফুটফুটে ছেলে আমাদের ঘরে এল ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম … “ তোমার নাম কি ? ” ছোট্ট ছেলেটার কাছে এমন উত্তর পাবো আশা করিনি । কি স্পষ্ট অথচ গম্ভীর ।

“ আমার নাম জানো না বুঝি । এইমাত্র যে ঐ ও আমাকে নাম ধরে ডাকলো । ”

ইন্দ্রদা বুবাই এর কাছে চলে গেছে … “ এসো এখানে বসো । তোমার ভাল নামও বুবাই ? ”

“ আমার একটাই নাম ।  ”

“ আচ্ছা বেশ । একটা ধাঁধা বলছি , উত্তর দাও দেখি । সমুদ্রে জন্ম আমার থাকি লোকের ঘরে । একটু জলের স্পর্শ পেলে যাই আমি মরে । ”

“ লবণ । ”

“ বাহ , তুমি তো বেশ ব্রিলিয়ানট । ”

“ দাদুর কাছে শুনেছিলাম । আমি রাত্রে দাদুর কাছে ঘুমাই , দাদু গল্প না বললে আমার ঘুমই আসে না । ”

“ আচ্ছা দাদু তোমাকে হীরের গল্প বলে না ? নীল হীরে ? ”

“ তুমি কি ডিটেকটিভ ? ”

“ কি করে বুঝলে ? ”

“ তোমায় একটা কথা বলবো কাউকে বলবে না তো ? ”

“ না । কিন্তু কি কথা ? ” … ইন্দ্রদা ফিসফিসিয়ে ওঠে ।

“ কাল সন্ধেবেলা আমি দাদুর ঘরে বসে পড়ছিলাম । একটা কালো গুণ্ডার মত লোক ঘরে ঢুকলো । দাদুর দিকে তাকিয়ে বলল ‘ কই আপনার সেই হীরেটা দেখাবেন বলেছিলেন যে ? ’ দাদু আলমারি থেকে একটা হীরে বের করল । লোকটা নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলো । ”

“ হীরেটা কি নীল ছিল ? ” … আমার প্রশ্ন ।

“ বোধ হয় নীল ছিল । ”

“ বোধ হয় কেন ? তুমি কি দেখোনি ? ”

“ দেখেছি । কিন্তু খুব চকচকে । একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম । তারপর লোকটা দাদুকে হীরেটা দিয়ে বলল ‘ কত টাকায় এটা দেবেন ? ত্রিশ লাখ … চল্লিস …পঞ্চাশ লাখ ? ’ দাদু খুব রেগে গেল । লোকটাকে তাড়িয়ে দিল । লোকটা দাদুকে দেখে নেবে বলল । ”

ইন্দ্রদার কপালে চিন্তার রেখা … “ আচ্ছা বুবাই লোকটাকে আগে কখনও আসতে দেখেছো ? ”

খুদে গোয়েন্দার মত বুবাই বলল … “ আগে দেখিনি । তবে এখন দেখলে ঠিক চিনতে পারবো । ”

নিচে এবার গুরুচরণবাবু খাবারের জন্য ডাক দিলেন । তাই বুবাই এর সঙ্গে গল্পটা আপাতত স্থগিত থাকলো । এ বাড়ির চাকর লালনকে এই প্রথম দেখলাম , নমিতাদেবীর সঙ্গে সবাইকে পরিবেশন করছিল । যথেষ্ট রুচিসম্মতভাবে ডিনার সারলাম , সঙ্গে ইন্দ্রদার ভেরি ভেরি স্পেশাল পোস্তর বড়া । ড্রাইভার জ্যাক আমার পাশেই খাচ্ছিল ।

আপ্যায়ন ও তুচ্ছ সংলাপপর্ব শেষে আবার আমরা আমাদের ঘরে এলাম । সাড়ে দশটা নাগাদ আমাদের পাশের রুমে জ্যাকের নাক ডাকার বিশ্রী শব্দ কানে আসতে লাগলো । আরও আধ ঘণ্টা কাটলো । পাশের বেডে ইন্দ্রদা ঘুমিয়ে গেছে বোধ হয় । আমার বেডটার পায়ের কাছেই জানলা । ম্যাট জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম বলে মশারি টানাই নি । জানলার বাইরে সরু একটা বারান্দা আছে । তাছাড়া মেঘমাখা জ্যোৎস্নায় একতলার নিচের বাগান আর রাস্তার কিছুটা অংশ দেখা যায় । ঘুমিয়ে যাবার আগে পর্যন্ত শুয়ে শুয়ে জানালার বাইরে লক্ষ্য করছিলাম ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘে আকাশ ছেয়ে গেছে । চাঁদের কাছে আসতে না আসতেই তাদের রং হয়ে যাচ্ছে সাদা । কয়েক মুহূর্তের জন্য চাঁদটা হয়ে যায় অদৃশ্য , তারপর ঘুমিয়ে গেছি ।

রাত তখন গভীর । মনে হল কেউ যেন জানলার বাইরে সরু বারান্দা দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছে । মনে হল যেন একটা সরু পেন্সিল টর্চের ফোকাস আমার মুখে পড়ল । চোখ খুলে জানলার বাইরে দেখি কেউ নেই । ঘড়িতে তখন রাত দুটো । বাইরে টিপটিপ অল্প বৃষ্টি আর ঘড়ির টিকটিক ছাড়া কোনো শব্দ নেই । চোখ যখন প্রায় আধবোজা , তখন জানলার বাইরে থেকে একটা নীলচে ঝিলিক আমার চোখে খেলে গেল । এবার স্পষ্ট দেখলাম এক ছায়ামূর্তির হাতে একটা কিছু থেকে নীলাভ জ্যোতি এত অন্ধকারেও চাঁদের হালকা আলোয় ঠিকরে পড়ছে । তবে কি ব্লু ডায়মন্ড ?

ইন্দ্রদাকে ডাকার অবকাশ ছিল না । টর্চটা বের করে খোলা দরজা দিয়ে বাইরে এলাম । কেউ কোথাও নেই । জ্যাকের রুমের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ , নাসা গর্জনের শব্দও তখন আর নেই । অন্ধকারে বুঝতে পারলাম সিঁড়ি দিয়ে কেউ দ্রুত নেমে গেল । কোনো এক অদৃশ্য রহস্যের নেশা আমাকে নাকে বেঁধা বঁড়শির মত টানতে টানতে নিয়ে চলেছে । সিঁড়ি দিয়ে নেমে দরজা খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলাম । এক অদ্ভুত শিহরনে কাউকে ডাকার কথা তখন মাথায় আসেনি ।

বৃষ্টির গতি নেই কিন্তু ঝিরঝির করে চোখেমুখে ছাঁট এসে লাগছে । ঝিল্লিস্বর চারপাশের নিস্তব্ধতাকে দশগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে । বাতাসে হাজার জোনাকি ডিম লাইটের মত কাঁপছে আর অন্ধকারকে আড়ালে বিদ্ধ করছে । জানি না আমি কি তবে ভুল দেখলাম ? হঠাৎ সবটুকু জ্যোৎস্নাকে গিলে ফেলল খাবলা খাবলা অন্ধকার । বিশাল এক কালচে জাল সারা নির্জন গ্রাম্য পরিবেশটা জুড়ে । দেখলাম বাগানের বাইরে মেনগেটটা খোলা । বৃষ্টিতেই মেনগেট থেকে বাইরে বেড়িয়ে এলাম । অদূরেই একটা লাশ পড়ে আছে । বুকে মনে হয় গুলি লেগেছে , চারপাশটা রক্ত । কিছুটা চেনা চেনা লাগছে … হ্যাঁ ওটা তো গুরুচরণবাবুর লাশ । আমি চিৎকার করতে যাবো এমন সময় পেছন থেকে কেউ আমার মুখ চেপে ধরল । অন্ধকারেও মুখটা হালকা বুঝতে পারলাম । একটা রুমাল দিয়ে ক্লোরোফর্ম ঢেলে আমার নাকের কাছে এনে চেপে ধরা হয়েছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না । আমি চিৎকার করে উঠলাম …

“ কে … কে … কে আপনি ? ”

( ৩ )

পায়ের ছাপ

“ আমি তোর ইন্দ্রদা রে … এখন কেমন আছিস সমু ? ”

আমি দেখলাম আমি বিছানাতে শুয়ে আছি , পাশে ইন্দ্রদা আর বাড়ির সবাই । গুরুচরণ বাবুকে দেখতে পেলাম না । আমি উঠে বসলাম , দেখি বুবাই এর মা বাবা চন্দ্রকান্ত বাবু সবাই কাঁদছে ।

ইন্দ্রদা বলে উঠল … “ কাল রাতে তুই ঠিক কি দেখলি বলতো ? আমি তিনটে নাগাদ তোর বেডের দিকে তাকিয়ে দেখি তুই নেই । সূর্যবাবু আর বাকি সবাইকে ডাকতে গিয়ে দেখি গুরুচরণবাবুও নেই । আমরা মেনগেট থেকে বাইরে আসি । প্রচন্ড জোরে বৃষ্টি হচ্ছিল । কিছুদূর গিয়ে দেখি তুই অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছিস । গুরুচরণবাবুকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও এখনো কোথাও পাওয়া যায়নি । রাতে ঠিক কি হয়েছিল বলতো ? ”

আমি এক এক করে সব কথা খুলে বললাম । ঘরে তখন গুরুচরণ বাবুর জন্য কান্নার রোল পড়ে গেছে । ইন্দ্রদা গম্ভীর হয়ে গেছে । ঘড়ি বলছে সকাল আটটা । এরপর পুলিশ এল , কিছু জিজ্ঞাসাবাদ চলল । তবে লাশের হদিশ না পাওয়া গেলে কিছু করা যাবে না স্পষ্ট জানিয়ে দিল ।

ইন্দ্রদা আমাকে বলল … “ চল কোথায় তুই লাশ দেখেছিলি দেখে আসি । ”

আমরা বাইরে এলাম … ইন্দ্রদা আমি সূর্যকান্ত চন্দ্রকান্ত আর বুবাই , জ্যাক আর নমিতা দেবী ঘরে থাকলো , চাকরটাও রান্নাঘরে গেল । বৃষ্টির জলে ধুয়ে গোটা সকালের আকাশটা আজ পালিশ করা আয়নার মত মনে হচ্ছে । আজ আলোতে বাগানটা প্রথম দেখলাম । কারণ লাশ যেখানে পড়েছিল সেটা দেখতে যাবার আগে ইন্দ্রদা বাগানে যদি কিছু পাওয়া যায় তা দেখতে চাইলো ।

বাগানে দাঁড়িয়ে গুরুচরণবাবুর ছোট্ট দোতলা বাড়িটা ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল । গোটা ছাদটা থেকে লতিয়ে ওঠা গোলাপ আর ফোঁটা ফোঁটা রক্তের মত ফুলগুলো দুলছে । বাগানটাও অপূর্ব । ঝিরিঝিরি স্পাইডার চন্দ্রমল্লিকার অর্ধবৃত্তাকার নীল হলদে পাপড়িগুলো হাওয়ায় মাথা নাড়ছে । বাইকালারের ডালিয়াগুলো আনমনা হয়ে চেয়ে আছে অন্যদিকে । ছোট ছোট টোপর এর মত লাল হলুদ সাদা বিচিত্র ফুল মখমলি সবুজ ঘাসে বর্ডার দিয়েছে । তাছাড়াও রয়েছে দু চারটে পেয়ারা আর আম গাছ , একটা রাবার গাছও রয়েছে । কাল রাতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে , আমরা কাদা মাড়িয়ে চললাম । ইন্দ্রদা ডানদিকে সার দিয়ে লাগানো লম্বা লম্বা রজনীগন্ধার স্টিকের কাছে গিয়ে বসে পড়ল । একটা আধ খাওয়া সিগারেট মাটিতে পড়ে , বোধহয় চার্মস ।

ইন্দ্রদা সূর্যকান্তবাবুর উদ্দেশ্যে বলল … “ আপনারা বাড়িতে কেউ স্মোক করেন ? ”

“ আমি ছাড়া কেউ করে বলে তো জানি না । ”

কাল বৈঠকখানায় দেখছিলাম একটা সিগারেট পড়েছিল । চার্মস কিনা লক্ষ্য করিনি ।

চন্দ্রকান্তবাবু বলে উঠলেন … “ জ্যাক কিন্তু মাঝে মাঝে স্মোক করে । ”

ইন্দ্রদা কোনো মন্তব্য করলো না । বাঁদিকে হিলহিলে লম্বা অজানা রঙের ডাঁটার বুকে হরেক রঙের পপি যেখানে দুলছে তার নিচে এক পাটি চটি বা চপ্পল … ফিতাটা কেটে গেছে … ইন্দ্রদার দৃষ্টি সেদিকেই । আমরা ওখানে আর সময় নষ্ট না করে মেনগেট খুলে বাইরে এলাম ।

ইন্দ্রদা প্রশ্ন করল … “ মেনগেট আপনাদের রাতে তালা দেওয়া থাকে ? ”

চন্দ্রকান্তবাবু বললেন … “ হ্যাঁ । বাবারই ডিউটি ওটা । ”

“ স্ট্রেঞ্জ । তাহলে কাল রাতে মেনগেট খুলল কে ? আপনাদের বাড়ির বাইরে পাঁচিলটা একবার দেখবো । ”

আমরা মেনগেট থেকে বেড়িয়ে পাঁচিলের গা বেয়ে চললাম । ইন্দ্রদা পাঁচিলের একটা জায়গা নিখুঁত দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল … একটা কাদামাখা হাতের ছাপ ।

“ যে ঢুকেছে এপথ দিয়েই ঢুকেছে । মানে পাঁচিল টপকে , কিন্তু মেনগেট খুললো কে ? ”

কাল যেখানে লাশটা পড়েছিল সেখানে এলাম । চারপাশে কাদাজল , প্রবল বৃষ্টিতে রক্তের দাগ পড়ে ধুয়ে মুছে গেছে । তবু কাদা আর রক্ত মিশে সেখানে যে রক্ত পড়েছিল সেটা বোঝা যায় । আমি সেই জায়গা থেকে একটা চশমা পেলাম । চন্দ্রকান্ত বাবু বলে উঠলেন যে ওটা তো বাবারই । এরপর আর কোনো সন্দেহ থাকতে পারে না যে আমি সেই রাতে ভুল দেখিনি । তবে যে লোকটা আমাকে অজ্ঞান করে দিল সেই কি গুরুচরণবাবুকে খুন করেছে ? বুবাই এতক্ষন কোনো কথা বলেনি ।

এবার বলে উঠল … “ দাদুর কি হয়েছে ? ”

আমি বললাম … “ তোমার দাদু কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে গেছেন , কিছুদিন পরই কাজ মিটে গেলে চলে আসবেন । ”

ইন্দ্রদা মাটিতে আধবসা অবস্থায় কতকগুলো পায়ের ছাপ লক্ষ্য করছিল । খালি পায়ের ছাপ , চপ্পল বা জুতোর নয় , তবে দুটি ভিন্ন লোকের তা বোঝা যায় । একজোড়া ছাপ বড় আর একজোড়া সামান্য ছোট । আমরা ফিরে এলাম ঘরে । ফেরার সময় দেখলাম গুরুচরণবাবুর চপ্পল জোড়া বাড়িতেই রয়েছে । তাহলে কাল রাতে কি উনি খালি পায়ে গিয়েছিলেন ?

আমি আর ইন্দ্রদা দোতলায় এলাম । ইতিমধ্যেই চাকর লালন আমাদের জন্য ডিম টোস্ট করে নিয়ে এসে টেবিলে রেখেছে । ইন্দ্রদা ওকে কাছে ডাকলো । বয়স্ক মানুষ , মুখ নিচু করে আছে । চাকরটার মুখের সঙ্গে অসম্ভব রকমের মিল গুরুচরণবাবুর । অবশ্য একটু বয়স হয়ে গেলে মুখের ত্বকের কুঞ্চন বেশিরভাগ মানুষেরই এক মনে হওয়াটা কিছুটা অস্বাভাবিক নয় ।

“ তুমি এ বাড়িতে অনেকদিন আছো না ? ”

“ হ্যাঁ বহুবছর । ”

“ কাল রাতে কোথায় ছিলে ? ”

“ আমি তো কাল সবাইকে খাবার দিয়ে রাতেই বাড়ি চলে যাই । আমার বাড়িটা ওই দখিন পাড়ায় । ”

লালনকেও লক্ষ্য করেছি পায়ে চপ্পল পড়ে না ।

“ কাল রাতে তুমি যখন বাড়ি যাচ্ছিলে মেনগেটের বাইরে কাউকে দেখেছিলে কি ? ”

“ হ্যাঁ একজন কিন্তু ঘোরাঘুরি করছিল বাবু , সিগারেট খাচ্ছিল । ”

“ লোকটার মুখ দেখেছিলে কি ? ”

“ না বাবু । বয়স হয়েছে তাই চোখে ভাল দেখি না । ”

আমি জানলার বাইরে সরু বারান্দাটার কাছে চলে গিয়েছিলাম । ওখান থেকে কিছুই পেলাম না ।

“ আচ্ছা লালন , তোমার বাঁ হাতে কি হল ? ”… ইন্দ্রদার দৃষ্টি লালনের বাঁ হাতে কিছুটা জায়গা ছুলে গেছে সেদিকে । এমন সময় নমিতা দেবী নীচে থেকে লালনকে ডাকছে শোনা গেল । লালন চলে গেল ।

আমরা কিছুক্ষণ পরেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলাম । ইন্দ্রদা সিঁড়ির কাছে একটা ছোট্ট ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো কুড়িয়ে পকেটে ভরে নিল । নিচে সবাই রয়েছে , কিন্তু গুরুচরণবাবুর জন্য গোটা বাড়িটা নিস্তব্ধ । সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে এক অচেনা ভদ্রলোককে চন্দ্রকান্তবাবুর সঙ্গে কথা বলতে দেখলাম । সাধারন বামুনের পোশাক , গায়ে পৈতে , সাদা ধুতি আর গায়ে কমলা কাপড় জড়ানো । মনে হয় স্নান করে এসেছেন । বয়স অবশ্যই তিরিশের কম । কাছে আসতেই চমকে উঠলাম । কাল রাতে যে লোকটা আমাকে অজ্ঞান করে দিয়েছিল সেই লোকটাই তো । আমার মুখ ভয়ে শুকিয়ে আমচুর হয়ে গেল ।

অপরিচিত ভদ্রলোকটি আমার উদ্দেশ্যে বলল … “ আমার দিকে ওরকম ভাবে চেয়ে আছো যে , চেনা চেনা লাগছে নাকি ? ”

আমি চুপ । ইন্দ্রদাও আমার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে কেমনভাবে চেয়ে আছে । চন্দ্রকান্তবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন …

“ এনার নাম সীতাপতি । আমাদের গ্রামে যে কালীমন্দির আছে তার প্রত্যহ পূজারি । বাবা মা কেউ নেই । গুরুচরণবাবুকে অত্যন্ত ভালবাসতেন , তাই দুঃসংবাদটা শুনে সকালেই ছুটে এসেছেন । আর সীতাপতি এনারা দুজন থাকেন কোলকাতায় । ইন্দ্রজিৎ সান্যাল নামকরা ডিটেকটিভ এবং ওনার অ্যাসিস্ট্যান্ট সৌমাভ । আপনারা কথা বলুন । আমি একটু বাজারের দিকে ঘুরে আসি । ”

সীতাপতি আপত্তি করলেন … “ না না , আমাকেও উঠতে হবে । সকালে মন্দিরে পুজো সেরে সোজা এদিকে এসেছি । আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবো । বারুইপুর থেকে পিসিমার আসার কথা আছে । ”

আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে উনি চলে গেলেন । লক্ষ্য করলাম , উনিও খালি পায়ে এসেছেন । কিন্তু এই নিরীহ শান্ত মুখটাই যে কাল রাতে আমার দৃষ্টিতে হিংস্র হয়ে পড়েছিল , সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত । এতদিন ইন্দ্রদার সঙ্গে রয়েছি , কোনো মানুষকে দেখে একেবারে ভুলে যাবো তা হয় না । তবে ইন্দ্রদাকে এখন কথাটা বলার সুযোগ পেলাম না ।

দুপুরে খাওয়ার পর আমি আর ইন্দ্রদা দোতলার রুমে চলে এলাম । বুবাই এর সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে । ও আমার বেডেই বসেছিল । আমি ইন্দ্রদাকে সীতাপতি সম্পর্কে আমার সন্দেহের কথাটা বলেই ফেললাম । কথাটা শোনার পর ইন্দ্রদা বেশ গম্ভীর হয়ে গেল । বুবাই আমার বলপেনটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল । ইন্দ্রদা যে এখনও অতল রহস্যে তলিয়ে আছে তা ভালই বুঝতে পারলাম ।

ইন্দ্রদা বলল … “ কাল রাতের ঐ লোকটা যদি সীতাপতিই হয় তবে বাগানে চটিটা কার ছিল ? আর সিগারেটটাই বা কে খেয়েছিল ? ”

( ৪ )

অন্য লাশ

“ কেউ নয় ইন্দ্রজিৎবাবু । আমি ছাড়া কেউ এ বাড়িতে স্মোক করে না । জ্যাকও ঘরে সিগারেট খায় না । বাইরে হয়তো খেতে পারে । আর তাছাড়া বাগানে দাঁড়িয়ে আমি কোনোদিন ধূমপান করেছি বলে তো আমার মনে পড়ে না । ” … সূর্যকান্তবাবু জানালেন ।

বিকেলে বাগানে হাঁটতে হাঁটতে এসব কথা হচ্ছিল । সূর্যকান্তবাবু বুবাইকে বললেন …

“ বুবাই , ওনাদেরকে গ্রামটা দেখিয়ে আনো , যাও । ”

এত কম বয়েসে এত সুন্দর একটা গাইডের দায়িত্ব পেয়ে বুবাই বিজ্ঞের হাসি হাসল । নিষ্পাপ ছেলেটার মুখটা দেখে বারবার মায়া হচ্ছিল । আর হয়তো কিছুদিন পরেই সে জানতে পারবে দাদু পৃথিবীতে নেই ।

বিকেল তখন পাঁচটা । ইন্দ্রদা আর আমি বুবাই এর সঙ্গে লাল মাটির গ্রাম দেখে চলেছি । খানিকটা আগে যে রোদটা কাঁচা সোনার মত ছিল তাতে মুহূর্তের মধ্যে পশ্চিম আকাশের ঢাল বেয়ে রবিমামার পিছলে যাওয়াতে রক্তের দাগ লেগে গেল । সাড়ে পাঁচটা কখন বেজে গেছে খেয়াল হয়নি ।

বুবাই বলল … “ চলো এবার তোমাদের কালীমন্দিরটা দেখিয়ে আনি । ”

আমরা পেছন পেছন চললাম । ও আমাদের একটা একতলা মন্দিরের কাছে এসে দাঁড় করালো । মন্দিরে ঢুকতেই কি যেন একটা শিহরন খেলে গেল মনে । বাইরের তুলনায় মেঝেটা পরিস্কার , মেঝেটা সিমেন্টের । একপাশে কালো পাথরের কালীমূর্তি অন্ধকারে ভয় দেখাচ্ছে । যেখানে বিগ্রহ রয়েছে তার পাশে একটা সরু গলি । মন্দিরের মধ্যে একটা সুন্দর ফুলের গন্ধ পাচ্ছিলাম । মনে মনে ভাবলাম এই নির্জন অন্ধকার মন্দিরে কাউকে খুন করে ফেলে রেখে চলে গেলে কেউ টেরও পাবে না । মন্দিরের ভেতরে এককোণে দেখলাম একটা মাদুর , বালিশ আর মশারি । বুবাই এর ভয়ডর নেই । সেই সরু গলিটা দিয়ে যেতে যেতে বলল …

“ দেখবে এসো , এদিকে একটা শিবের পাথর আসে । শিবরাত্রির দিনে মায়েরা জল ঢালে । ”

আমরাও সেই সংকীর্ণ গলিটার মধ্যে দিয়ে ঢুকে পড়লাম । হঠাৎ বুবাই ছুটে এল । আমার গায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল । ও কিছু একটা দেখে খুব ভয় পেয়েছে । ইন্দ্রদা এগিয়ে গেল , পেছনে আমি আর বুবাই । গিয়ে যা দেখলাম তা দেখে আমার চক্ষুস্থির … একটা লাশ ।

বুবাই বলে উঠল … “ দাদুর কাছে এসেছিল সেই লোকটা । ”

আমি চমকে উঠলাম । ইন্দ্রদাকে দেখলাম কিছু ক্লু খুঁজছে । ইন্দ্রদা লাশটার কাছে হাঁটু মুড়ে বসে বলল …

“ কোনো ভারী বস্তু দিয়ে মাথায় আঘাত করে খুন করা হয়েছে । মাথার বাঁদিকে ক্ষতটা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে । ”

আমি বললাম … “ খুনি যদি এই ব্যাক্তিকে ভারী জিনিস দিয়ে আঘাত করে তবে সেটা গেল কোথায় ? ”

“ খুনি কি এতই বোকা যে সেটা ফেলে দিয়ে যাবে । লাশটার দিকে তাকিয়ে দেখ রাইগর মরটিস শুরু হয়েছে । তার মানে অনেক আগেই লোকটা খুন হয়েছে । ”

লাশটার চারপাশে স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল । লাশটার কাছে সটান শুয়ে এবার ইন্দ্রদা যা করলো তা কিছুই আমার মাথায় ঢুকল না । ও প্রথমে মন্দিরের মেঝেতে ধুলোয় বসে পড়ল , তারপর যেসব জায়গায় লাশটার রক্ত পড়েছিল সেসব জায়গাগুলোর কাছে নাক নিয়ে গিয়ে শুঁকতে লাগলো । তারপর পকেট থেকে রুমাল বের করে লাশের বাঁ পায়ের বুড়ো আঙ্গুলটা ধরে অনেকক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল । লাশের পকেট থেকে একটা চার্মস সিগারেটের প্যাকেট ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেল না । এরপর লাশটার খয়েরি রঙের জামাটা রুমাল হাতে জড়িয়ে ইন্দ্রদা অনেকক্ষণ ধরে টিপে টিপে কি যে দেখল ও নিজেই জানে । আমি পেছনে ফিরে দেখি বুবাই নেই , কোথায় গেল ?

“ বুবাই , বুবাই কোথায় তুমি ? ”

এবার দূর থেকে বুবাই এর গলা শোনা গেল । দেখি ওর সঙ্গে প্রায় ছুটতে ছুটতে আসছে সূর্যকান্তবাবু , চন্দ্রকান্তবাবু আর জ্যাক ।

“ এ কি ! এ তো সুমন বাবু । ” … সূর্যকান্তবাবু অবাক হয়ে গেছেন ।

আমি বললাম … “ আপনি এনাকে চেনেন নাকি ? ”

“ অফ কোর্স চিনি । সুমনবাবু তো প্রায়ই বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন । ”

ইন্দ্রদাকে দেখলাম মন্দিরের দেওয়ালে একটা ছোট্ট খুপরি দিয়ে কি যেন লক্ষ্য করছে । খুপরিটার বাইরে একটা চোখ … ইন্দ্রদা তৎক্ষণাৎ মন্দিরের বাইরে বেড়িয়ে এল , আমরা পেছনে পেছনে । দেখলাম সীতাপতিবাবু কিছু না জানার ভান করে চলে যাচ্ছে । ইন্দ্রদার ইশারায় অবশ্য কেউ তাতে বাধা দিল না । চন্দ্রকান্তবাবু পুলিশে খবর দিয়ে দিলেন । চারপাশে তখন অনেক লোক জমে গেছে । দূরে দিগন্তরেখার কাছে সূর্যদেব সম্পূর্ণ রুপে অস্তমিত হবার পরেও তার কিরণ তীক্ষ্ণ ইস্পাত ফলার মত তখন চারদিক থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে । পুলিশ আসার আগেই বাড়ি ফিরলাম ।

রাত তখন সাড়ে সাতটা । ইন্দ্রদা সূর্যকান্তবাবুকে ডেকে বললেন …

“ একবার সীতাপতিবাবুর বাড়ি যাওয়া যায় না ? ”

“ অবশ্যই , কিন্তু এখনই যাবেন ? ”

“ হ্যাঁ ইমিডিয়েটলি । ওনার সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার । ”

কাল আকাশে মেঘ ছিল । কিন্তু আজ জ্যোৎস্না ভেঙ্গে পড়ছে সর্বত্র । অজস্র নক্ষত্রমালা জেগে আছে আকাশে । পাশের বিলের ঢেউয়ের মাথায় মাথায় দশবারোটা চন্দ্রকলা নাচছে । আকাশের চাঁদটা তা দেখে যেন থতমত শিশু । সূর্যকান্তবাবুর সঙ্গে আমরা এগিয়ে চলেছি । এসে থামলাম একটা টালির চালের বাড়ির সামনে । দরজার কড়া নাড়তে বেশ কিছুক্ষন পর দরজা খুলে দিলেন সীতাপতিবাবু । ঘরটার ভেতরে দুটো রুম । আমরা বেতের মোড়াতে তিনজন বসলাম । সীতাপতিবাবু দাঁড়িয়ে রইলেন । ইন্দ্রদা কোনোরকম ভনিতা না করে সোজা প্রশ্নে চলে গেল ।

“ মন্দিরে আজ যে সুমনবাবু খুন হয়েছেন তাঁকে আপনি চিনতেন ? ”

“ না । একদম না । ”

“ আচ্ছা বেশ । মন্দিরে দেখলাম বালিশ আর মশারি রয়েছে , ওখানে কেউ কি ঘুমায় ? ”

“ ঠিকই ধরেছেন । আমি মাঝে মাঝে শুই । মন্দিরের মেঝেটা বেশ ঠাণ্ডা । আর যা গরম পড়েছে … ”

“ কাল রাতেও শুয়েছিলেন , তাই না ? ”

“ হ্যাঁ । কিন্তু তাতে কি হল ? ”

এমন সময় পাশের ঘর থেকে এক বুড়ি মহিলার গলা শোনা গেল …

“ রাতবিরেতে কে এসেছে রে সীতে ?… ”

“ সূর্যবাবুরা এসেছেন পিসিমা । ”

পাশের ঘরের পর্দার আড়াল দিয়ে দেখলাম এক বুড়ি মহিলা খাটিয়ার ওপর শুয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করলো ।

“ সুমনবাবু খুন হয়েছেন কখন জানতে পারলেন ? ”

“ দেখুন , উনি খুন হয়েছেন কি মারা গেছেন তাতে আমার কি … এরকম অচেনা বহুলোক পৃথিবীতে মারা যাচ্ছে … ”

“ সুমনবাবু আপনাদের গ্রামেই খুন হয়েছেন … লাশ পাওয়া গেছে মন্দিরে যেখানে আপনি রাতে ঘুমান … এ ব্যাপারে আপনার কোনো ইন্টারেস্ট না থাকলেও পুলিশ আপনাকে নিয়ে ইন্টারেস্টেড । যাই হোক আমি আপনাকে জেরা করতে আসিনি । তবে আমার কাছে সত্যিটা বলতে পারতেন । দু দুটো খুন হয়ে গেছে আপনাদের গ্রামে … একজনের লাশ এখনও বেপাত্তা । পুলিশের জেরার সামনে একটু ভেবেচিন্তে গুছিয়ে কথা বলবেন । ”

“ ধন্যবাদ ইন্দ্রজিৎবাবু আপনার মূল্যবান উপদেশের জন্য । আর আমাকেই যদি খুনি ভাবেন তাহলে তার উপযুক্ত মোটিভ খুঁজতে হবে আপনাদের । আমার বাড়ি সার্চ করতে পারেন । ”

“ নো থ্যাঙ্কস । এত রাতে আপনার পিসিমাকে বিরক্ত করার মত অতটাও খারাপ লোক আমি নই । আজ আমরা উঠি । ”

সীতাপতিবাবু পেন্সিল টর্চের আলো দেখিয়ে আমাদের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন । ইন্দ্রদা ভুরু কুঁচকে কি ভাবছে বোঝার উপায় নেই । আসার সময় ইন্দ্রদার শেষ কথাগুলো শুনে আমি হাঁ হয়ে গেলাম । অবশ্য এর আগেও ইন্দ্রদাকে সাসপেন্সের চরম মুহূর্তগুলোতে এ ধরনের অপ্রাসঙ্গিক কথা বলতে শুনেছি ।

“ আচ্ছা আপনার ডাক নামটি বড় মিষ্টি … সীতে … সীতাপতি থেকে সীতে । ওটা কি আপনার পিসিমার দেওয়া ? ”

সীতাপতিবাবু হাঁ করে অবাক বিস্ময়ে হ্যাঁ বললেন । সূর্যকান্তবাবু এমনিতেই কম কথা বলেন , এতক্ষন একটিও কথা বলেন নি । বাইরে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন …

“ কিছু অনুসন্ধান করতে পারলেন ? ”

“ পারলাম সূর্যবাবু আর সেই সঙ্গে কিছু দেখলামও । এখন শুধু অপেক্ষার পালা । চুরি হওয়া হীরেটার হদিশ পেতে হবে । ”

গুরুচরণবাবুর বাড়ির মেনগেটের কাছে যখন এলাম তখন ঘড়ি বলছে রাত নটা । লোডশেডিং হয়ে গেছে । অদূরেই নজরে পড়ল একটা ছায়ামূর্তি । পুকুরের পাড়ে বসে আছে । মুখের সিগারেটটা লাল অঙ্গারের মত জ্বলছে ।

ইন্দ্রদা বলল … “ তুই সূর্যকান্তবাবুর সাথে বাড়ি চল । আমি একটু পরে আসছি । ”

ইন্দ্রদা ছায়ামূর্তির দিকে এগিয়ে গেল । আমরা আবছা অন্ধকারে মেনগেটে ঢুকলাম ।

“ এখানে বসে কি করছেন ? ”

“ ও আপনি ইন্দ্রজিৎ বাবু । বসুন না । দেখুন না লোডশেডিং এর যা বাহার । গরমে বদ্ধ ঘরে থেকে আর কি করবো বলুন তো ? ”

“ জ্যাক আপনাকে একটা প্রশ্ন করবো ? কাল বিকেলে আমরা যখন কোলকাতা থেকে এলাম তখন সবাই ছিল , শুধু চন্দ্রকান্তবাবু ছিলেন না । ঐ সময় উনি কোথায় যেতে পারেন বলে আপনার ধারনা ? ”

“ হয়তো বুবাইকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে গিয়েছিলেন । ”

“ গাড়ি চালিয়ে যে টাকা আপনি মাইনে পান তাতে আপনার সংসার চলে ? ”

“ দেখুন পাঁচ হাজার টাকা পেলে পাঁচ হাজারের মত সংসার চলবে আবার পঞ্চাশ হাজার পেলে পঞ্চাশ হাজারের মত । এ বাজারে বেশি কে না চায় বলুন ? একেবারে পঞ্চাশ হাজার পেতে গেলে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয় সেটা আপনিও ভাল করে জানেন । সিগারেট নেবেন ইন্দ্রজিৎ বাবু ? ”

“ নো থ্যাঙ্কস । আমি চার্মস খাই না । আচ্ছা জ্যাক আপনি সুমন বাবুকে চিনতেন ? ”

( ৫ )

জীবন্ত মৃত

“ না । ” … চন্দ্রকান্তবাবু বললেন ।

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট করতে করতে চন্দ্রকান্তবাবু বললেন যে কাল রাতে ভয়ংকর কিছু ঘটে নি । সকালে সবাই তখন একতলার ডাইনিং এ বসে আছি ।

ইন্দ্রদা বলল … “ চন্দ্রকান্তবাবু আপনি বলছেন বুবাইকে বেড়াতে নিয়ে যাবার সময় সাইকেলে নিয়ে গিয়েছিলেন আর রাস্তায় কোথাও নামেন নি ? ”

“ বললাম তো , না । আপনি কি বলতে চাইছেন বলুন তো ? ”

বুবাই হঠাৎ বলে উঠলো … “ কাকু , তুমি একবার পান দোকানে নেমেছিলে না ? ”

“ থ্যাঙ্ক ইউ বুবাই । ” … ইন্দ্রদা বলল ।

“ হ্যাঁ একবার নেমেছিলাম বটে । বাবার জন্য পান কিনতে নেমেছিলাম , বাবা প্রচুর পান খান তো ? ”

“ পান দোকানটা কোথায় ? ”

“ বাসস্ট্যান্ডের কাছে … হরির পান স্টল । আপনি কি চাইছেন বলুন তো ? আপনি কি আমাদেরকেও বিশ্বাস করছেন না নাকি ? ”

“ কিছু মনে করবেন না , এটা অপ্রিয় হলেও সত্যি কথা যে স্বয়ং গুরুচরণবাবুও আপনাদের বিশ্বাস করতেন না । ”

সকাল দশটা নাগাদ ইন্দ্রদা গুরুচরণবাবুর ঘরটা একটু দেখতে ঢুকল , সঙ্গে আমি বুবাই চন্দ্রকান্ত বাবু , পরে অবশ্য নমিতাদেবীও এসেছিলেন । মাঝারি সাইজের রুম , এককোণে একটা লোহার টেবিলের উপর দু চারটে ফাইল , উপরে মিহি ধুলো জমেছে । টেবিলের সামনে একটা মরচে ধরা টিনের চেয়ার । ঠিক উলটোদিকে আর একটা ওভাল শেপের টেবিলের উপর একগাদা ম্যাগাজিন ছড়ানো । তাছাড়া রয়েছে পরিস্কার বেডকভার পাতা ছোট খাট , দুটো আলনা আর একটা টেবিলে বইয়ের স্তূপ । একটা ছোট ঘুড়ি আলনার মাথায় , হয়তো বুবাই এর । একটা লোহার সিন্দুক রয়েছে আর দেওয়ালের গায়ে একটা কাঁচের আলমারির ভেতর নানারকম মাটির জিনিস সাজানো । বুবাই বলল ঐ সব সুন্দর মাটির তৈরি ফলগুলো সব নাকি গুরুচরণবাবুর নিজের হাতের তৈরি । একসময় কুমোরটুলির এক মৃৎশিল্পীর সঙ্গে ওনার খুব বন্ধুত্ব ছিল ।

ইন্দ্রদা বলল … “ এই সিন্দুকের মধ্যেই ছিল ব্লু ডায়মন্ড , তাই না চন্দ্রকান্ত বাবু ? ”

“ হয়তো , তবে এ ব্যাপারে দাদা ভাল বলতে পারবে । ”

বুবাই বলে উঠল … “ হ্যাঁ দাদু সেদিন এখান থেকেই হীরে বের করে দেখাচ্ছিল লোকটাকে । ”

“ সুমন বাবুকে ? ” … আমি জিজ্ঞেস করলাম ।

“ হ্যাঁ । ”

বুবাই বলে উঠল … “ দাদু কবে আসবে বলোতো ? আমাকে বলেছিল একটা মাটির পেয়ারা বানিয়ে রং করে দেবে । আমাদের বাগানের বুলবুলিটা না গাছের পেয়ারাগুলো খেয়ে সব নষ্ট করে দেয় । আমি বুলবুলিটাকে মাটির পেয়ারা দিয়ে ঠকাবো । দাদু খুব খারাপ , আমাকে না জানিয়েই চলে গেল । ও ডিটেকটিভ কাকু তুমি কি পেয়ারা বানাতে পারো ? ”

নিষ্পাপ শিশুর সরল কথাবার্তা শুনে আমার চোখটাও নিজের অজান্তে ছলছলিয়ে ওঠে । নমিতা দেবী আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে কান্না ঢাকতে পাশের ঘরে চলে যায় । আজ যদি গুরুচরণবাবুর মত কাউকে খুঁজে পেতাম তাহলে এই ফুটফুটে শিশুটার মনোবাসনা কিছুটা হলেও পূরণ করার চেষ্টা করতাম । ছোট্ট শিশুটার প্রশ্নের উত্তরে ইন্দ্রদার চুপ করে থাকা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না ।

প্রায় এক আধ মিনিট নিস্তব্ধতার পর ইন্দ্রদা চন্দ্রকান্ত বাবুকে প্রশ্ন করল …

“ আপনাদের চাষবাস আছে নাকি ? ”

“ হ্যাঁ । অল্প হলেও জমি আছে , ধান চাষ হয় । কিন্তু হঠাৎ এ প্রশ্ন ? ”

“ বারান্দার কাছে দেখলাম একটা মই আর লাঙ্গল । ”

“ হুম , ঠিকই দেখেছেন । তবে আজকাল লাঙ্গল খুব একটা লাগে না , ট্রাক্টরে চাষ হয় তো । ”

বিকেলে ইন্দ্রদা একাই বাসস্ট্যান্ডে গেল । হরির পান স্টল ছাড়া অন্য কোথাও যে যাবে না সেটুকু বুঝতে বাকি ছিল না । কিই বা চলছে ইন্দ্রদার মনে তা ওই জানে । আমার কাছে তো সব ঘোলাটে । আমার শুধু বারবার মনে হচ্ছিল ব্লু ডায়মন্ড আদৌ আছে কিনা । সেদিন রাতের নীলচে ঝিলিক তো অন্য কিছুরও হতে পারে । আজকাল অনেক লেজার লাইট বাজারে বেরিয়েছে তা দিয়েও তো লোককে দূর থেকে বোকা বানানো যায় , আবার পরমুহূর্তেই মনে হল বুবাই কিন্তু ব্লু ডায়মন্ড দাদুকে দেখাতে দেখেছিল । বুবাই এর সঙ্গে গল্প করতে ভালই লাগছিল । বিকেল থেকেই মেঘ মেঘ করছিল । সন্ধ্যের আগেই বৃষ্টি নামল । ইন্দ্রদা যখন ফিরল , পুরোপুরি ভিজে গেছে । বৃষ্টি থামলো সাড়ে আটটায় । একটানা লোডশেডিং বিরক্ত লাগিয়ে দিচ্ছিল । আজ খাওয়া দাওয়াটা একটু তাড়াতাড়িই হল । আবহাওয়াটা বেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে । সবাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে । সাড়ে নটা নাগাদ নমিতাদেবী আমাদের ঘরে বুবাই এর খোঁজে এল । ও তখন আমাদের সঙ্গে গল্প করছে । উনি বললেন …

“ বুবা আমরা শুতে যাচ্ছি , কিছুক্ষণ বাদে চলে এসো । ওনারাও ঘুমোবেন তো । ”

দশটা নাগাদ বুবাই চলে যেতেই আমরা শুয়ে পড়লাম ।

রাতে এতটাই গভীর ঘুম হয়েছিল যে বৃষ্টি হয়েছিল কিনা টের পায়নি । সকালে চা খাবার পর আমি আর ইন্দ্রদা বারান্দা দিয়ে বাইরে আসছিলাম । ইন্দ্রদা হঠাৎ থমকে দাঁড়াল দেওয়ালে একটা বড় পেরেকে লাগানো মইয়ের দিকে তাকিয়ে । ইন্দ্রদা কি এত দেখছে তন্ময় হয়ে ? কাল তো এখানেই ছিল মইটা । ইন্দ্রদাকে এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করলাম না । ভাবলাম ইন্টারেস্টিং কিছু হলে পরে সবই জানতে পারবো ।

সকাল থেকে বুবাই এর পাত্তা পাওয়া যায়নি । দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রাম নিচ্ছি এমন সময় দরজা দিয়ে বুবাই ঢুকল ।

আমাকে বুবাই বলল … “ তুমি নিশ্চয় গোয়েন্দা নও ? ”

“ না । ঐ যে ইন্দ্রদা , ঐ হল গোয়েন্দা । ”

“ আমি জানতাম । ”

“ কি করে জানলে ? ”

“ গোয়েন্দারা তো মিথ্যে বলে না । তুমি আমাকে সেদিন বললে কেন যে দাদু বেড়াতে গেছে ? ”

“ তোমার দাদু তবে কোথায় গেছে ? ”

“ বলা বারণ । ”

“ কে নিষেধ করল ? ”

“ কেন ? কাল রাতে যখন তোমার ঘর থেকে বেরিয়ে শুতে যাচ্ছিলাম তখন দাদু তো আমাকে ডাকল আর বলল … ‘ আমি তো লুকিয়ে আছি দাদুভাই । ’ তারপর … ”

“ তারপর কি বুবাই মশাই ? ” … ইন্দ্রদার কৌতূহল দ্বিগুণ বেড়ে গেছে ।

“ দাদু আমাকে বলতে বারণ করেছে । ”

“ গোয়েন্দাকে সব কথা বলতে হয় বুবাই , তাতে তোমার দাদু রাগ করবে না । ”

“ না তবু বলবো না , আমি কাউকেই বলিনি । ”

“ বেশ । এটা তো বলো তোমার দাদু কি পড়ে এসেছিলেন ? ”

“ সাদা কাপড় জড়ানো ছিল গোটা গায়ে , ঠাকুরমার ঝুলির শাঁকচুন্নির মত । শুধু মুখটুকু দেখা যাচ্ছিল । দাদু লুকিয়ে লুকিয়ে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল , বলল কারন আছে দাদুভাই । ”

ইন্দ্রদা আর কোনো প্রশ্ন করেনি । এইটুকু একটা ছোট ছেলে যে এতসুন্দর গুছিয়ে কথা বলতে পারে তা ভাবাই যায় না । বুবাই তাহলে কাকে দেখেছিল রাতে ? আচ্ছা লালন নয় তো ? লালনের মুখের সঙ্গে গুরুচরণবাবুর অদ্ভুত মিল । কিন্তু লালন তো রাতে এখানে থাকে না । এরপর বুবাই আরও পনেরো মিনিট গল্প করার পর উঠল ।

আমি ইন্দ্রদাকে বললাম … “ আচ্ছা লালন নয় তো ? ”

“ আমিও সেটা ভেবেছি রে সমু । কিন্তু লালনকে যদি বাইরে থেকে আসতে হয় , তাহলে হয় মেনগেট দিয়ে নাহলে পাঁচিল টপকে ঢুকতে হবে । মেনগেট তো বন্ধ । এখন পাঁচিল টপকে ঐ বুড়ো মানুষটা আসবে এমনটা ভাবা মুস্কিল । ”

“ তবে ? ”

“ তবে আমি ভাবছি বুবাই আরও কিছু জানে । এই রহস্যের পেছনে রয়েছে একটা ভয়ংকর বুদ্ধি । আর তাকে ঘিরে রহস্য , এক ভয়ানক রহস্য । ”

( ৬ )

নিশীথের আগন্তুক

“ রহস্য রহস্য রহস্য , আপনি কি এর মধ্যেও রহস্য খুঁজে পেলেন নাকি ইন্দ্রজিৎবাবু ? ” … সূর্যকান্তবাবুর স্ত্রী নমিতাদেবীকে এতটা উত্তেজিত হতে এই প্রথম দেখলাম । অবশ্য এই কদিনে যা ঝড়ঝাপটা গেছে তাতে ওনার মানসিক অবস্থা মোটেও ভাল নয় । পাশে সূর্যকান্ত বাবু চুপ ছিলেন ।

“ হ্যাঁ রহস্য আছে । বুবাই কাল রাতে আমার ঘর থেকে দশটা নাগাদ বেড়িয়েছিল । আপনি বলছেন আপনার ঘরে এসেছে সাড়ে দশটায় । দোতলা থেকে একতলা আসতে কি আধ ঘণ্টা লাগে নমিতাদেবী ? তবে কাইন্ডলি বুবাইকে এ ব্যাপারে কিছু বলবেন না বা বকাঝকা করবেন না । ”

রাতে আজকে শুতে সাড়ে দশটা হয়ে গিয়েছিল । শুয়ে শুয়ে ভাবছি একের পর এক ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো । রহস্য আর চিন্তাগুলো ধার ব্লেড হয়ে কাটাকুটি খেলছে মনে । কিন্তু সারাদিনের ক্লান্তি চোখে ঘুম নিয়ে এল ।

শুক্লপক্ষের রাত , পশ্চিম আকাশে চন্দ্রকলা । জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে গুরুচরণবাবুর বাগানটা । চার পাঁচটা দেবদারু গাছের মাথার উপর রাত্রির পরিবেশটা এক অপার্থিব জলছবির মত দেখাচ্ছে । কিন্তু এই আলোময় জ্যোৎস্নাতে কে যেন গুরুচরণবাবুর বাগানে হেঁটে চলেছে নিঃশব্দে । নিশীথের এই রহস্যময় আগন্তুক ধীরে ধীরে এগিয়ে এল সূর্যকান্তবাবুর দরজার দিকে । কপাটে ছোট্ট দুটো টোকা মারল । আমার ঘুম ভেঙ্গে গেছে । ঘড়িতে দেখি বাজে বারোটা । সূর্যকান্তবাবুর ঘর থেকে হালকা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে । ইন্দ্রদা মনে হয় ঘুমিয়েই চলেছে ।

আমি ছোট্ট করে ডাক দিলাম … “ ও ইন্দ্রদা … ”

ইন্দ্রদা চোখ না খুলেই বলল … “ জেগে আছি সৌম্য । ”

দরজাটা খুলে বাইরে এলাম । বারান্দার রেলিং এ মুখ বাড়িয়ে দেখলাম সূর্যকান্তবাবুদের ঘর থেকে আলোর ছটা আসছে । তার মানে এত রাতেও কেউ ঘুমোয় নি । স্পষ্ট একটা আলোচনার আওয়াজ আসছে । সূর্যকান্তবাবু , চন্দ্রকান্তবাবু , নমিতাদেবীর গলা শোনা যাচ্ছে । আমি বিছানায় এলাম । জ্যাক নাক ডাকছে পাশের ঘরে ।

সকালে একসঙ্গে সবাই ছিলাম ব্রেকফাস্ট টেবিলে । এমন সময় লালন এল । ওর কাছ থেকে পাওয়া গেল একটা নতুন খবর । কাল রাত নটা নাগাদ লালন যখন বাড়ি যাচ্ছিল তখন বাগানে সাদা কাপড়ে মুখ ঢাকা কাউকে দেখেছিল ।

ইন্দ্রদা কথাটা শোনার পর প্রশ্ন করল … “ কাল রাতে মেনগেটটা কখন বন্ধ করেছিলেন ? ”

চন্দ্রকান্তবাবু উত্তর দিলেন … “ কাল দশটা নাগাদ মেনগেট তালা দিয়ে আসি আমি । ”

সূর্যকান্তবাবু বললেন … “ ইন্দ্রজিৎ বাবু একটা কথা বলবো কিছু মনে করবেন না , আপনাদের এখানে তো নিশ্চয় বেশ কষ্ট হচ্ছে । আপনারা ব্যস্ত মানুষ , চাইলে কোলকাতা ফিরে যেতে পারেন । এখানে পুলিশ তো তাদের কাজ করছে । এখন হীরে খুঁজে পান কি না পান তাতে তো বাবা এ পৃথিবীতে আর ফিরে আসবে না । ”

“ অবশ্যই সূর্যবাবু , আমার একটা কাজ এখনও বাকি আছে । সেটা করতে পারলে অবশ্যই ফিরবো , তার আগে কখনই নয় , আপনি বললেও নয় । ”

জোঁকের মুখে নুন দেবার মত ঝিমিয়ে পড়ে সূর্যকান্তবাবু । নমিতাদেবীও কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন ।

সকাল দশটা নাগাদ আমি আর ইন্দ্রদা একটা পুকুর পাড়ে বিশাল বটগাছের নিচে বসেছিলাম , সঙ্গে ছিল বুবাই । ইন্দ্রদা পকেট থেকে একটা ডেয়ারি মিল্ক বের করে বুবাই এর হাতে দিয়ে বলল …

“ তুমি ডেয়ারি মিল্ক ভালোবাসো খুব । তাই না বুবাই ? ”

“ হ্যাঁ খুব । দাদু প্রায়দিন আমাকে এনে দেয় । ”

“ তোমার দাদু সেদিন রাতে সত্যিই এসেছিল ? তুমি ঠিক দেখেছিলে ? ”

“ হ্যাঁ তো বলেছি । ”

“ তাহলে বলবে না তোমার দাদু তোমাকে কি বলেছিল ? আমি তো গোয়েন্দা । গোয়েন্দাকে সবকিছু না বললে চোর ধরা পড়বে কি করে বুবাই ? তোমার দাদুর হীরে যে চুরি করেছে তাকে তুমি শাস্তি দিতে চাও না ? ”

“ আচ্ছা তোমরা কিন্তু কাউকে বোলো না । সেদিন রাতে দাদু আমাকে বলল যে …

‘ বাইরের মেনগেটটা তালা মারা । আমি যাবো কি করে ? ’

‘ তুমি কোথায় যাবে ? ’

‘ বললাম না দাদুভাই , আমি লুকিয়ে আছি । ’

‘ এখন তাহলে কেন এলে ? ’

‘ শুধু তোমার জন্য বুবাই । ’

দাদু পকেট থেকে একটা পেয়ারা বের করে বলল …

‘ বুবাই তোমায় বলেছিলাম না আমাদের বাগানের পেয়ারাগুলো সব নষ্ট করে দিচ্ছে বুলবুলিটা । ওকে এই মাটির পেয়ারাটা দিয়ে ঠকাতে হবে । এটা দিতেই তো এলাম । তোমাকে ছাড়া আর কিছু ভাল লাগছে না দাদুভাই । ’

‘ বাঃ খুব মজা হবে । ’

‘ তাহলে দাদুভাই আমার একটা কাজ করে দিতে হবে । মেনগেটের চাবিটা এনে তালা খুলে আমাকে বাইরে যেতে দিয়ে চাবিটা আবার লাগিয়ে যেখানে ছিল সেখানে রেখে দিতে হবে । পারবে ? ’

‘ পারবো । ’

বুবাই একটু দম নিয়ে আবার বলতে শুরু করল … “ তারপর দাদু বারান্দা থেকে একটা মই আনল । সেটাকে বাইরে আনল । আমিও দাদুর সঙ্গে গেলাম । আমি দাদুকে বুলবুলির বাসাটা দেখিয়ে দিলাম । বাড়ির পেছনে ঘুলঘুলিতে বাসাটা আছে । দাদু মইয়ে উঠতে পারবে না বলে আমি উঠে রং করা মাটির পেয়ারাটা ঘুলঘুলিতে রেখে দিলাম । দাদু মইটা যেখানে ছিল সেখানে রেখে দিয়ে আসার পর আমি মেনগেটের চাবিটা এনে দাদুকে যেতে দিলাম । তারপর চাবি রেখে মায়ের কাছে শুতে গেলাম । ”

আমি বললাম … “ বুবাই , রাতে সাদা কাপড়ে মুখ ঢাকা তোমার দাদুকে দেখে ভয় করলো না ? ”

“ দাদুকে আবার ভয় কিসের ? তবে দাদু খুব গম্ভীর হয়ে কথা বলছিল । হয়তো ঠাণ্ডা লেগে গলা ধরে গেছিল । ”

ইন্দ্রদা বলল … “ তাহলে ঐ দুষ্টু বুলবুলিটাকে ঠকাতে পারলে বুবাই ? ” তারপর ইন্দ্রদা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো ।

“ বিকেলে দেখবো , কিন্তু মই নাহলে তো হবে না । মই আনবে কে ? বাবা যদি দেখে ফেলে । ”

“ আচ্ছা বুবাই লালন কে তোমার কেমন লাগে ? ”

“ খুব ভালো । আমি তো ওকে ছোট দাদু বলি । আমাকে খুব ভালবাসে । ওর আমার মত একটা নাতি ছিল , ওকে ছেড়ে চলে গেছে ওর ছেলে নাতি সবাই । ”

নমিতাদেবী বুবাইকে স্নান করার জন্য ডেকে নিয়ে গেলেন ।

“ কিছু বুঝলি ? ” … ইন্দ্রদা বলল ।

“ তার মানে কি গুরুচরণবাবু মারা যান নি ? ”

“ তাহলে সেদিন রাতে কার লাশ দেখেছিলি ? ”

“ হুম , তাইতো । আর চশমাটাই বা ওখানে পড়েছিল কেন ? ”

“ খুনি যে কে বুঝতে পারছি । কিন্তু … ”

“ কিন্তু কি ইন্দ্রদা ? ”

“ চোর কে তাও আন্দাজ করতে পারছি , কিন্তু হীরেটা এখন কোথায় ? ”

কাল রাতে কেন জানি না ভাল ঘুম হয়নি । আজ দুপুরে তাই ঘুম ধরে গিয়েছিল । ঘুম ভাঙল সাড়ে তিনটেয় । গ্রীষ্মের রোদ খোলা জানালা দিয়ে মেঘের উপর এসে পড়েছে । ইন্দ্রদা আবার কোথায় চলে গেল এইসময় ? আমি বারান্দায় এসে রেলিং এ মুখ বাড়িয়ে দেখলাম । নিচে বোধহয় সবাই ঘুমিয়ে আছে । তপ্ত বাতাসে মাটির গন্ধ আসছে । দুপুরে রোদে পোড়া পাতার সুবাস । নিচের বাগানটা থেকে ভেসে আসছে গঙ্গাফড়িঙের ঝিমঝিম রব । বাগান থেকে বুবাই এর গলা শোনা যাচ্ছে । ও হেসে চেঁচিয়ে উঠল …

“ এ মা , এত বড় ডিটেকটিভ , ক্যাচ ধরতে পারে না ”

আমি নিচে এলাম , দেখি বাড়ির পেছন দিকের দেওয়ালটায় যেখানে বুলবুলির বাসা আছে সেখানে মই লাগানো , মইয়ের উপর বুবাই দাঁড়িয়ে । ইন্দ্রদা নিচে । শক্ত মাটির উপর পড়ে কতসুন্দর বানানো পেয়ারাটা ভেঙ্গে গেছে । ইন্দ্রদা হাসছে আর বলছে …

“ তোমার মত কি ক্যাচ ধরতে পারি । অত জোরে ফেললে পেয়ারাটা ধরবো কি করে ? চলো মইটা তাড়াতাড়ি রেখে আসি , তোমার বাবারা উঠে পড়তে পারেন । ”

ইন্দ্রদাকে কোনো বাচ্চা ছেলের সঙ্গে হাসি তামাসা করতে এই প্রথম দেখলাম ।

বিকেলে ইন্দ্রদা সূর্যকান্তবাবুকে বললেন … “ আর আপনাদের বিরক্ত করবো না । আজ বিকেলেই চলে যাবো আমরা । আমার অসমাপ্ত কাজটা হয়ে গেছে । ”

“ অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে ইন্দ্রজিৎবাবু । কিন্তু বাবা আর হীরেটার ব্যাপারটা রহস্যই থেকে গেল । ”

“ তা যা বলেছেন । তবে আপনি ভাল করেই জানেন গুরুচরণবাবু আর সুমনবাবু কি করে মারা গেছেন । আর এই পারিবারিক ব্যাপারে আমি আর নাক গলাতে চাই না । ”

ইন্দ্রদার গলার স্বর অত্যন্ত ধারালো ছুরির ফলার মত ওনার কানে ঢুকে গেল । মুহূর্তের মধ্যে উনি চুপসে গেলেন ।

ইন্দ্রদা আবার বলল … “ তবে আমার প্রয়োজন আপনাদের এখনও ফুরোয়নি । ”

( ৭ )

শেষ টেলিফোন

“ প্রয়োজন ফুরোয়নি মানে ? ” … আমি জিজ্ঞেস করলাম ।

“ পুরো কেসটা শুনলে সব জলের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে সৌম্য । ” … ইন্দ্রদা বলল ।

আমরা তখন বোলপুর স্টেশন থেকে গণদেবতা এক্সপ্রেস ধরে কোলকাতা ফিরছি । সাতটার কাছাকাছি বেজে গেছে । মেঘের জন্য ট্রেনের জানলা দিয়ে চাঁদ আকাশে দেখা যাচ্ছে না । বাতাসে দাপট নেই , নক্ষত্ররাও নজরে আসছে না । ট্রেনের গতিময়তায় বাতাস সরাসরি আমাদের মুখের ওপর ঝাপটা মেরে চলেছে ।

ইন্দ্রদা শুরু করল … “ সেই রাতে আসলে কি ঘটেছিল তবে শোন , আমরা সেইদিনই গুরুচরণবাবুর বাড়ি পৌঁছেছি । ঐ সুমন লোকটাই গুরুচরণবাবুকে হুমকি দিত , বুবাই ঠিকই বলেছিল । সেইদিন রাতে সুমনই পাঁচিল টপকে গুরুচরনবাবুর ঘরে ঢুকেছিল হীরে চুরির জন্য । ব্লু ডায়মন্ডটা নিয়ে পালাতে গেলে গুরুচরনবাবু জেগে যান । গুরুচরনবাবু মেনগেট খুলে বাইরে আসেন আর দেখেন সুমন পালাচ্ছে । কিন্তু সুমন বাগানে পাঁচিল টপকে আসার সময় বা যাবার সময় তাড়াতাড়িতে ছুটতে গিয়ে খুব জোরে পায়ে হোঁচট খেয়েছিল , তাই বেশিদূর ছুটতে পারে নি । গুরুচরনবাবু ব্লু ডায়মন্ডটা ফেরত চান , তখনই শুরু হয় কথা কাটাকাটি । আর গুরুচরনবাবু নিজেকে সামলাতে না পেরে হাতের মস্ত বড় লাঠির বাঁটটা দিয়ে সুমনের মাথায় সজোরে আঘাত করেন । সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় সুমন । গুরুচরনবাবু সুমনের কাছ থেকে ডায়মন্ডটা নিয়ে নেয় । সেই মুহূর্তে কি করবেন তিনি ভেবে পাচ্ছিলেন না । তারপর লাশটাকে মন্দিরে লুকিয়ে রাখা হয় । ”

“ কিন্তু গুরুচরণবাবুই যে খুনটা করেছে সেটা এতটা জোর দিয়ে কি করে বলছো ? ”

ইন্দ্রদা দুটো ঝালমুড়ির প্যাকেট কিনে আবার বলতে শুরু করল … “ মন্দিরে যখন সুমনবাবুর লাশ দেখলাম তখন চারপাশে রক্ত পড়েছিল । তখন ভাবলাম মাথা থেকে যদি শুধু রক্ত পড়ে তাহলে অতটা জায়গা জুড়ে ছড়াবে কেন ? তখন আমি রক্তের কাছে নাক নিয়ে গিয়ে দেখলাম একটু পানের গন্ধ , আসলে রক্তের সঙ্গেও ছিল কিছু পানের ফেলা পিক । গুরুচরনবাবু প্রচুর পান খান ওনার ছেলের মুখেই শুনেছিস আর দেখেওছিস । তাছাড়া মৃত সুমনবাবুর জামাটা ছিল হালকা ভিজে । মন্দিরেই যদি খুন হবে তাহলে জামা ভিজে থাকবে কেন ? তখনই বুঝলাম বাইরে খুনটা হয়েছে টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে তারপর লাশটাকে মন্দিরে রেখে দেওয়া হয়েছে । ”

“ আর সুমনবাবুই যে ডায়মন্ড চুরি করতে গিয়েছিল সেটা বুঝলে কি করে ? ”

“ খুব সিম্পিল । এক নম্বর পাঁচিলে কাদামাখা হাতের ছাপ । দুই নম্বর ছেঁড়া এক পাটি চপ্পল । তিন নম্বর চার্মস সিগারেট । ”

“ তার মানে সুমনবাবু পাঁচিল পেরিয়ে ঢুকেছিল , বাগানে সিগারেট খেয়েছিল তারপর চুরি করতে উপরে গিয়েছিল । আর সেইজন্যই লাশের পকেট থেকে চার্মস সিগারেটের প্যাকেট পাওয়া গিয়েছিল । লাশের বুড়ো আঙ্গুলে ছিল রক্তের দাগ । কারন ছুটে পালানোর সময় বাগানের মাটিতে হোঁচট খেয়েছিল সুমনবাবু । আর তাই পালাতে গিয়ে এক পাটি চপ্পল বাগানেই থেকে যায় । লাশের পায়েও লক্ষ্য করেছিলাম এক পাটি চপ্পল রয়েছে । ”

“ ভেরি গুড সৌম্য ।  ”

“ কিন্তু ইন্দ্রদা ,গুরুচরনবাবুর একার পক্ষে , এই বয়েসে ঐ লাশটা তুলে নিয়ে গিয়ে মন্দিরে রেখে আসা কি সম্ভব ? ”

“ ওয়েট ওয়েট এখনও বাকি আছে । ঘটনাচক্রে সেই রাতে সীতাপতি সুমনকে খুন হতে দেখে । সীতাপতি গুরুচরনবাবুকে শ্রদ্ধা করতো । তাই গুরুচরনবাবুকে কিভাবে বাঁচানো যেতে পারে সেই প্ল্যান করতে শুরু করে । আমরা তখন গুরুচরনবাবুর ব্লু ডায়মন্ড রহস্যের সমাধান করতে চলে এসেছি । গুরুচরনবাবু যে খুন করেছেন এমনটা আমাদের মাথায় যাতে না আসতে পারে সেইজন্য সীতাপতি আর গুরুচরনবাবু শুরু করেন এক অদ্ভুত ফন্দি । রাত তখন খুব গভীর । সবাই ঘুমোচ্ছে । এমনকি আমরাও । ওরা দুজনে মিলে লাশটাকে মন্দিরে লুকিয়ে রাখে । সীতাপতি বলেছিল মনে আছে যে ও সকালে মন্দিরে পুজো দিয়েছে । মন্দিরে গেলে কি তার লাশটা নজরে পড়ত না ? আসলে মন্দিরে ও গিয়েছিল ঠিকই কিন্তু জানতো লাশটা ওখানেই আছে । তারপর গুরুচরনবাবু বুকে নকল রক্ত মেখে কাদামাখা রাস্তায় শুয়ে পড়েন যাতে সবাই ভাবে গুরুচরণবাবু খুন হয়েছেন । আর সীতাপতি হীরেটা নিয়ে সোজা দোতলায় চলে আসে । তোর মুখে পেন্সিল টর্চের আলো মেরে তোকে জাগায় , ব্লু ডায়মন্ডটা ইচ্ছে করেই তোকে দেখায় । তুই ভাবিস কেউ হীরেটা চুরি করে নিয়ে পালাচ্ছে । তুই বাইরে আসিস , দেখিস মেনগেট খোলা , আর মেনগেটের বাইরে কাদামাখা রাস্তায় গুরুচরনবাবুর লাশ । ওটা লাশ ছিল না রে সৌম্য , ছিল গুরুচরনবাবুর নিখুঁত অভিনয় । তারপর পেছন থেকে এসে অজ্ঞান করাটা সীতাপতির কাছে খুব সহজ ব্যাপার । তাছাড়া সীতাপতি যখন ওর বাড়ি থেকে টর্চ দেখিয়ে আমাদের এগিয়ে দিতে আসছিল তখন লক্ষ্য করেছিলাম টর্চের কাঁচটা ভাঙ্গা । আবার গুরুচরনবাবুর বাড়ির দোতলা সিঁড়িতে আমি একটা ভাঙ্গা কাঁচের টুকরো পেয়েছিলাম । সীতাপতিই যে তোকে সেই রাতে পেন্সিল টর্চের আলো মেরে জাগিয়ে তুলতে দোতলায় গিয়েছিল সেটা বুঝতে আর কোনো অসুবিধে হয়নি । দ্রুত নামবার সময় টর্চটা দেওয়ালে ধাক্কা খায় আর কাঁচটা সামান্য ভেঙ্গে সিঁড়িতে পড়ে থাকে । তোকে জাগানোর পেছনে একটা কারন ছিল নিশ্চয় বুঝতে পারছিস । গুরুচরনবাবু যে মারা গেছেন এই গুজবটা আমাদের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া ছিল ওদের উদ্দেশ্য । ”

“ কি সাংঘাতিক বুদ্ধি । এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বুদ্ধি খাটানো , লাশ মন্দিরে সরানো ,  গুরুচরনবাবুর নিখুঁত অভিনয় করা , আমাকে অজ্ঞান করার ম্যাটেরিয়াল জোগাড় করা … পুরো মাস্টার প্ল্যান তো একদম । ”

“ ঠিক তাই । গুরুচরনবাবু ভেবেছিলেন ওনার খুনের ঘটনা দেখে কদিন পরেই আমরা কেটে পড়বো । আর তারপর উনি আবার ঘরে ফিরে এসে সব ঘটনা ছেলেদের আর বৌমাকে জানাবেন । ”

“ তাহলে গুরুচরনবাবুর লাশটার কাছে যে চশমাটা পড়েছিল সেটা ? আর খালি পায়ের ছাপগুলো ? ”

“ চশমাটা ডিটেকটিভকে ভাঁওতা দেবার কায়দা মাত্র । খালি পায়ের ছাপগুলো সীতাপতি আর গুরুচরনবাবুর । গুরুচরনবাবু সুমনকে ধরতে গিয়ে তাড়াতাড়ির বশে জুতো পড়তে ভুলে গিয়েছিলেন । আর বামুন সীতাপতি তো চটিই পায়ে দেয় না । ”

“ কিন্তু গুরুচরনবাবু মারা যাবার অভিনয় করলো মানলাম । কিন্তু এই কদিন পুলিশের চোখ এড়িয়ে তিনি কোথায় ছিলেন ? সীতাপতিবাবুর বাড়িতে থাকলে নিশ্চয় সেদিন দেখতে পেতাম যেদিন আমরা ওনার ঘরে গিয়েছিলাম । ”

ইন্দ্রদার উত্তরটা তখন আর শোনা হয়নি । কারন ঝিলিক দির ফোন বেজে উঠেছিল । আমরা বাড়ি পৌঁছলাম এগারোটায় । হাত পা মুখ ধুয়ে টিফিন করার পর ইন্দ্রদা একটা সিগারেট ধরিয়ে আবার বলতে শুরু করলো …

“ গুরুচরনবাবু সীতাপতির বাড়িতেই ছিলেন এতদিন । সীতাপতির পিসিমাই আসলে ছদ্মবেশী গুরুচরন পাত্র ।  ”

“ মানে ? ”

“ অবাক হবার কিছুই নেই সৌম্য । উনি যখন পিসিমা সেজে খাটিয়া থেকে একটা কথা বলেছিলেন … ‘ সীতে কে এসেছে রে ? ’ তখন আমার খটকা লাগে । এই কথাটার মধ্যে ‘ স ’ এর উচ্চারণ সিসের আওয়াজের মত শোনাচ্ছিল । গুরুচরনবাবুর কথা বলার সময় লক্ষ্য করেছিস নিশ্চয় ‘ স ’ উচ্চারণটা সিসের আওয়াজের মত তীক্ষ্ণ । তাছাড়া বিকেলে সেদিন হরির পান স্টলে গিয়ে জানতে পারি সীতাপতি পান কিনতে এসেছিল । ভাবলাম ও নিজে তো পান খায় না । ও নিশ্চয় গুরুচরনবাবুর জন্য পান নিতে এসেছে । ”

“ এবার বুঝতে পারছি ইন্দ্রদা বুবাই ঠিকই বলছিল । সেই রাতে গুরুচরনবাবুই বুবাই এর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল । চন্দ্রকান্তবাবু মেনগেট বন্ধ করার আগেই উনি ঢুকে পড়েছিলেন আর বাগানে লুকিয়ে ছিলেন । আর পরে তো বুবাই চাবি খুলে দিয়েছিল বলে উনি যেতে পেরেছিলেন । লালন তাহলে ঠিকই দেখেছিল যে বাগানে সাদা কাপড় জড়ানো কেউ দাঁড়িয়ে আছে । শুধু শুধু ওকে সন্দেহ করছিলাম । কিন্তু ইন্দ্রদা , তুমি সূর্যকান্তবাবুকে যে বললে তোমার একটা অসমাপ্ত কাজ বাকি আছে , সেই কাজটা কি ? ”

ইন্দ্রদা দেখলাম মুচকি হাসছে । পকেটে হাত ঢুকিয়ে ও বের করল সেই চকচকে ব্লু ডায়মন্ডটা । হালকা আলোতেও নীল আভা ঠিকরে পড়ছে পাথরটা থেকে ।

“ ও মাই গড ! ব্লু ডায়মন্ড ! এটা তোমার কাছে ? ”

“ ইয়েস বস । অবশ্য এটার জন্য বেশিরভাগ ক্রেডিটটাই প্রাপ্য বুবাই এর । আমার সন্দেহ হয়েছিল গুরুচরনবাবু সেই রাতে বুবাইকে কি শুধু পেয়ারা দিতে এসেছিল নাকি অন্য উদ্দেশ্য ছিল । একটা মাটির পেয়ারা দেবার জন্য উনি এত কষ্ট করতে যাবেন কেন ? আসলে উনি ডায়মন্ডটা লুকোতে এসেছিলেন । ওটা নিজের কাছেও রাখাটা নিরাপদ মনে করেন নি গুরুচরনবাবু কারন সীতাপতির একটু হলেও ওটার ওপর লোভ হতে পারে । গুরুচরনবাবুর রুমটা দেখে বেরিয়ে আসার সময় আমি দেওয়ালের পেরেকে একটা মই লক্ষ্য করি । পরদিন সকালে একই জায়গায় মইটা ছিল কিন্তু তার তলায় কাদা লেগেছিল । তার মানে রাতে কেউ মইটা বের করেছিল । যাইহোক পরে অবশ্য বুবাই বলে যে সেই রাতে মই বের করে মাটির পেয়ারাটা বুলবুলির বাসায় রেখেছে বুবাই আর দাদু মিলে । আবছা একটা সন্দেহ তখন আমার মনে জেগেছিল । তাই সেদিন বিকেলে আমি মইটা বের করে বুবাইকে সঙ্গে নিয়ে সেই ঘুলঘুলির কাছে যাই । বুবাইকে মাটির পেয়ারাটা উপর থেকে ছুড়তে বলি । ইচ্ছে করেই ক্যাচ ধরিনি । মাটির পেয়ারাটা বাগানের শক্ত মাটিতে পড়ে ভেঙ্গে যায় । তার মধ্যে থেকে বেরিয়ে পড়ে হীরেটা । বুবাই দেখতে পাবার আগেই সেটা পকেটে ঢুকিয়ে নিই । ”

“ তার মানে নাতির সেন্টিমেণ্টের কথা ভেবে নয় , গুরুচরনবাবু মাটির পেয়ারা তৈরি করে তার মধ্যে হীরেটা লুকিয়ে বুলবুলির বাসায় রাখতে এসেছিলেন । কি অসম্ভব বুদ্ধি । ”

“ এর থেকে নিরাপদ জায়গা সেই মুহূর্তে গুরুচরনবাবুর কাছে ছিল না । ”

“ তাহলে তুমি কি ডায়মন্ডটা ওনাকে ফেরত দেবে না ? ”

“ অবশ্যই দেবো যদি গুরুচরনবাবু আমাকে ব্লু ডায়মন্ড রহস্যের সমাধানের জন্য উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেন । আর হীরে ফিরে পেতে উনি সেটা অবশ্যই করবেন । যখন উনি আজ পেয়ারার মধ্যে গিয়ে হীরে দেখতে পাবেন না তখন সব বুঝতে পেরে অবশ্যই আমাকে ফোন করবেন । ”

“ কিন্তু গুরুচরণবাবুর প্রত্যাবর্তনে ওনার পরিবারের সবাই ভয় পেয়ে যাবেন না ? ”

“ একদম না সৌম্য । কারন যে রাতে তুই সূর্যকান্তবাবুর ঘর থেকে আলোচনার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলি সেই রাতেই গুরুচরনবাবু ওনার পরিবারের কাছে এসে সব কথা খুলে বলেছেন বলে আমার বিশ্বাস । তাই সূর্যকান্তবাবু পরের দিন সকালে আমাদের চলে আসার ব্যাপারে এতটা তাড়াহুড়ো করছিলেন । ”

“ কিন্তু ইন্দ্রদা এমনও তো হতে পারে , ধরো গুরুচরনবাবু তোমাকে ফোন না করে পুলিশকে ফোন করে বলল তোমার কাছেই আছে হীরেটা , তখন ? ”

“ সেরকম বোকামি উনি করবেন না কারন তাতে খুনের দায়ে ওনাকেই ফাঁসতে হবে । আমি এত কিছু জানি যখন ওনার খুনের ব্যাপারটাও আমার মাথায় আছে সেটা উনি ভালই বুঝতে পারবেন । ইচ্ছে করলেই ওনাকে কয়েক বছর হাজতবাস করানো যেত । কিন্তু ভেবে দেখলাম খুনটা করতে উনি বাধ্য ছিলেন , নইলে ওনার হীরেটা সুমন বিক্রিই করে দিত । তাছাড়া পুলিশ প্রশাসন দেখুক যদি পারে খুনিকে ধরতে , কিছুদিনের মধ্যে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ও বেরিয়ে যাবে । দেখ না অপেক্ষা কর আজ কিংবা কালকেই মৃত গুরুচরন পাত্র হঠাৎ জীবিত হয়ে ডায়মন্ডটার খোঁজে ইন্দ্রজিৎ সান্যালকে ফোন করছে । ”

সত্যি হলও তাই । কাল সকাল গড়াল না । পাঁচ মিনিটের মধ্যেই টেলিফোনটা ক্রিং ক্রিং করে বেজে উঠলো । ইন্দ্রদার মুঠোর মধ্যে তখন ব্লু ডায়মন্ডটা চকচক করছে । রিসিভারটা তুলে ঠোটের কোণে একটা মোলায়েম তৃপ্তির হাসি হেসে ইন্দ্রদা গম্ভীর গলায় বলে উঠলো …

“ হ্যালো … ইন্দ্রজিৎ সান্যাল স্পিকিং । ”

শান্তনু দাস

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 1 Average: 5]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন: