পাঠকদের পছন্দ

শুভ বিবাহ ও একটি চুরি

সুবীর মজুমদার
0 রেটিং
113 পাঠক

নির্মলেন্দু গাঙ্গুলি ব্রাহ্মণ হলে হবে কী, ধর্মাচরণে খুব একটা আস্থা তার নেই। পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত নির্মলেন্দু বাবু অনেক কষ্ট করে ধীরে-ধীরে আজ একজন সফল ব্যবসায়ীরূপে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। আলু-পেঁয়াজ সাপ্লাইয়ের বিজনেস তার। কল্যাণী মেইন বাজারের উপর দু’খানা বড় গুদাম তার নিজের।
বড় মেয়ে পাপিয়ার আগেই বিয়ে হয়ে গেছিল। ছোট মেয়ে শিউলির প্রায় চার মাস আগে বিয়ে দিয়েছেন, ব্যারাকপুর নিবাসী শ্রী রামানন্দ ঘোষালের একমাত্র পুত্র রমেন্দ্রনাথ ঘোষালের সঙ্গে। পেষায় সে টিটাগড় থানার পুলিশ সাব-ইন্সপেক্টর বা ছোট দারোগা। তার যা রেকর্ড, তাতে সে খুব তাড়াতাড়ি ইন্সপেক্টর হয়ে যাবে।
নির্মলেন্দু বাবু অনেক বছর আগে তার বাড়িতে একজন গরীব ব্রাহ্মণকে আশ্রয় দিয়েছিলেন। কৃষ্ণপদ উপাধ্যায় নামের গরীব মানুষটি স্ত্রী, পুত্র নিয়ে তার বাড়িতে আশ্রয় নিলে নির্মলেন্দু বাবু তাদের নিচের তলার দু’খানি ঘর ব্যবহারের অনুমতি দিলেন। কিছু দিন পর আত্মীয়দের পরামর্শে তিনি সোনার তৈরী একটি সুদৃশ্য গনেশ মূর্তি বাড়িতে নিয়ে এলেন এবং নিচের তলার ঠাকুর ঘরে মূর্তিটির প্রতিষ্ঠান করে তার নিত্য আরাধনার দায়িত্ব কৃষ্ণপদ উপাধ্যায়ের উপর সঁপে দিলেন।

Brass Golden (Gold Plated) Golden Ganesha Statue, Rs 800 /kilogram | ID:  15946324048

সেই থেকে এই মূর্তির আরাধনার দায়িত্ব পুরোপুরিভাবে কৃষ্ণপদবাবু-ই সামলান। তিনিই দু’বেলা পুজো-আর্চা করেন, ফল প্রসাদ ও ভোগের ব্যবস্থা নিজেই করেন। নির্মলেন্দু বাবু মাস গেলে একটা মাসোহারা তার হাতে তুলে দেন। তাতে কোন মতে তার চলে যায়। নির্মলেন্দু বাবুর স্ত্রী দুপুরবেলায় পুজোর সময়ে ঠাকুরঘরে আসেন। ভক্তিভরে কুলদেবতার পুজোয় অংশ নেন। নির্মলেন্দু বাবু কিন্তু খুব একটা আসেন না। পুজো-আর্চায় তার ভক্তির পরিমাণ খুবই সীমিত।
ছোট মেয়ে শিউলির বিয়ের সময়ে একটা অঘটন ঘটে গেল। কৃষ্ণপদবাবু হঠাৎ ভীষণ রকম অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানের পরেই অসুস্থতা বোধ করেন। তার সর্বাঙ্গে জ্বালা অনুভূত হতে থাকে; সেইসঙ্গে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে, শ্বাস নিতেও কষ্টবোধ হয়। সঙ্গে-সঙ্গে এম্বুলেন্স ডেকে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। তখন থেকে তার সেখানেই চিকিৎসা চলছে।
কৃষ্ণপদ বাবু অসুস্থ হয়ে পড়ার পর প্রায় চার মাস হয়ে গেল। কুলদেবতার পুজোও বন্ধ রয়েছে তখন থেকেই, ঠাকুর ঘরও তালাবন্ধ। আজ হঠাৎ কী মনে হতে নির্মলেন্দু বাবু ধীরে-ধীরে নিচে নামলেন। পকেটে রাখা চাবি দিয়ে ঠাকুর ঘরের তালা খুলে দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতে দেখলেন, যে আসনের উপর গনেশের মূর্তিটা বসানো ছিল, সেটা এখন শূন্য! মূর্তি চুরি হয়ে গেছে!
কল্যাণী মেন থানা থেকে পুলিশ এল। সাব-ইন্সপেক্টর মি. নয়ন পাল খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে সবকিছু পরীক্ষা করলেন, বাড়ির সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। বাড়ির উপরতলায় থাকেন নির্মলেন্দু বাবু নিজে ও তার স্ত্রী শর্মিলা দেবী, নিচের তলায় থাকে কৃষ্ণপদ বাবুর ছেলে বাবাই ও তার মা উদিতা দেবী। নির্মলেন্দু বাবু জানালেন, “বিয়ের পরপরই বেশীর ভাগ আত্মীয় ও বন্ধু চলে গেলেও তিন জন দিন কতক থেকে তারপর যায়। এরা হ’ল যথাক্রমে শিশির ভট্টাচার্য, তার পত্নী ইরা ভট্টাচার্য ও সুকুমার পাল।”

West Bengal Police Housing & Infrastructure Development Corporation


শিশির ভট্টাচার্য সম্পর্কে তার মেজ শ্যালক, সেই সূত্রে ইরা দেবী তার শ্যালক পত্নী। সুকুমার পাল তার বন্ধু বিমান পালের পুত্র। নির্মলেন্দু বাবু জানালেন, তিনি কাউকেই সন্দেহ করেন না। বাস্তবে এমন একটা কান্ড যে কেউ করতে পারে, সেটা তিনি স্বপ্নেও কোনদিন কল্পনা করেন নি। সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পাল প্রশ্ন করলেন, “স্বপ্নে কোনদিন কল্পনা না করলে প্রায় চার মাস বাদে ঠাকুর ঘরের তালা খুলেছিলেন কেন!?”নির্মলেন্দু বাবু অস্বস্তি ভরা গলায় বললেন, “আজ হঠাৎ মনে হ’ল, এতো দামী সোনার মূর্তিটা ঐ ঘরের ভিতরে রয়েছে। মাঝেমধ্যে তার দেখাশোনা করা উচিত। আর কিছু না হোক, ধুলোবালি তো জমতে পারে!”
“হুঁ”, নয়ন পাল বললেন, “ঘরের দরজায় তো তালা দেওয়া ছিল, তাই না?!”নির্মলেন্দু বাবু, “সেটাই তো প্রশ্ন, এ তালার চাবি চোর পেল কোথা থেকে!?”নয়ন পাল, “আপনি বলছেন, কৃষ্ণপদ বাবু অসুস্থ হওয়ার পর এ ঘরের চাবি আপনার কাছেই থাকতো, তাই তো?”নির্মলেন্দু বাবু, “একদম তা-ই। সেই জন্যেই তো বিস্ময়, বাড়ির লোক হেল্প না করলে চোর কীভাবে চাবির নকল করে!?”নয়ন, “তা মূর্তির কী রকম দাম ছিল?”নির্মলেন্দু বাবু, “আসলে মূর্তিটা পুরোপুরি সোনার ছিল না। বাইরে থেকে দেখলে পুরো সোনার মনে হলেও ভিতরটা পিতলের ছিল। তাও আমি প্রায় আট লাখ টাকা খরচা করে ওটা অর্ডার দিয়ে বানিয়েছিলাম।”নয়ন, “হুম, আই সি।”
কৃষ্ণপদ উপাধ্যায়ের ছেলে বাবাই ও তার মা উদিতা দেবীকে ডেকে পাঠানো হ’ল। উদিতা দেবীর অবস্থা দেখলে করুনা হয়। একদিকে স্বামী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি, অন্যদিকে বাড়ির ভিতর থেকে সোনার গনেশ মূর্তি চুরি। পরপর দু’টি ঘটনায় মহিলা একেবারে দিশাহারা হয়ে গেছেন। ছেলে বাবাইয়ের অবস্থাও খারাপ হয়ে গেছে। আগে সবার সাথে সদা হাসি-ঠাট্টায় মেতে থাকতো যে ছেলে, পিতার অসুস্থতায় তার মুখও পাংসুটে বিবর্ণ আকার ধারণ করেছে, শরীর ভেঙ্গে গেছে। তাছাড়া, আগে নির্মলেন্দু বাবু তাদের একটা মাসোহারা দিতেন। এখন পুজো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেটাও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গরীব ব্রাহ্মণ পরিবারের খাবারে টান পড়েছে।
বাবাই এখন একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে কোনমতে খাওয়া-পরা চালাচ্ছে, আবার বাপের চিকিৎসার খরচও জোগাচ্ছে। বাবাই উত্তেজিতভাবে জানালো, “দারোগা বাবু, আমার বাবার এ অবস্থার জন্য যে বা যারা দায়ী তাদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত আমার স্বস্তি নেই। আমার মনে হয়, যাদের জন্যে আমার বাবার এ হাল হয়েছে, তারাই ঐ মূর্তি চুরি করেছে।”সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পাল, “হুঁ, আমারও তা-ই মনে হয়।” নির্মলেন্দু বাবুর উদ্দেশ্যে বললেন, “আপনার শ্যালক, তার স্ত্রী ও বন্ধুর ছেলে যেন কল্যাণী মেন থানায় এসে নিজেদের স্টেটমেন্ট দিয়ে যায়, বলে দেবেন।”নির্মলেন্দু বাবু “হ্যাঁ” বলে সায় দিলেন। পুলিশের লোক শর্মিলা দেবীর স্টেটমেন্ট নিল। তিনিও কাউকে সন্দেহ করেন না। এরপর পুলিশ তাদের জিপে চেপে প্রস্থান করল।
দিন কতক পরে নির্মলেন্দু বাবুর শ্যালক শিশির ভট্টাচার্য ও তার মিসেস ইরা ভট্টাচার্য কল্যাণী মেন থানায় এসে সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পালের সঙ্গে দেখা করলেন।সাব-ইন্সপেক্টর, “আপনারা বিয়ের কতদিন পর ও বাড়ি থেকে গেছিলেন, অথবা সহজ করে বললে, বিয়ের অনুষ্ঠানের পর আপনারা ও বাড়িতে কতদিন ছিলেন?”শিশিরবাবু, “আমরা তিন দিন ছিলাম।”সাব-ইন্সপেক্টর, “কেন ছিলেন, মানে কোন বিশেষ কারণ ছিল কি?”শিশিরবাবু, “না, বিশেষ কোন কারণ ছিল না। আসলে, জামাইবাবু ফোনে প্রায়ই আসতে বলেন। কিন্তু বিজনেস করি বলে আসা সম্ভব হয় না। তাই ভাবলাম, এবার দিন কতক থেকেই যাব। তা-ই…”
সাব-ইন্সপেক্টর, “কীসের বিজনেস আপনার?”শিশিরবাবু, “সোনা-রূপার জুয়েলারি দোকান আছে আমার, রানাঘাট কুপার্স ক্যাম্পে।”সাব-ইন্সপেক্টর, “হুম, বাড়িও কি ওখানেই?”শিশিরবাবু, “হ্যাঁ।”সাব-ইন্সপেক্টর, “আপনারা মূর্তি চুরির ব্যাপারে কাউকে সন্দেহ করেন?”এবারে ইরা দেবী মুখ খুললেন, “আমরা ওখানে থাকাকালীন একটা ছেলে আমাদের অপোসিট ঘরে থাকতো। ওর হাবভাব ভালো ছিল না। কেমন সতর্ক-সতর্ক ভাব। ও আমাদের কথা লুকিয়ে-লুকিয়ে শুনতো। একবার পর্দা সরিয়ে বাইরে যেতেই দেখলাম, ও চট করে ঘরে ঢুকে গেল। এর উপর আমার সন্দেহ হয়।”সাব-ইন্সপেক্টর, “হুম, সুকুমার পাল। ওকে, আপনারা নিজেদের স্টেটমেন্ট দিয়ে চলে যেতে পারেন।”শিশিরবাবু ও ইরা দেবী নিজেদের স্টেটমেন্ট দিয়ে চলে গেলেন।
কৃষ্ণপদ উপাধ্যায়কে কল্যাণী ই.এস.আই. হাস্পাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তিনি একটু সুস্থ হতে নয়ন পাল তার স্টেটমেন্ট নিতে এলেন।নয়নবাবু, “শিউলি গাঙ্গুলির বিয়ের পুরোহিত কি আপনিই ছিলেন?”কৃষ্ণপদ বাবু, “হ্যাঁ।”নয়নবাবু, “আপনি কি বিয়ের মধ্যেই অসুস্থতা বোধ করেন, না তার পরে?”কৃষ্ণপদ বাবু, “বিয়ের মধ্যে সে রকম কিছু বুঝতে পারি নি। শেষের দিকে গায়ে, চোখেমুখে জ্বালা-জ্বালা বোধ করছিলাম। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর-পরই কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসতে লাগল। তারপরই আমার অবস্থা ছেলেকে জানালাম। ও এম্বুল্যান্স ডেকে এনে এখানে ভর্তি করিয়ে দিল।”
নয়নবাবু, “আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?”কৃষ্ণপদ বাবু, “আমি আন্দাজে কাউকেই সন্দেহ করি না। তাছাড়া, অসুস্থ হওয়ার পর চার মাস কেটে গেছে। কেউই কিন্তু কোনও সন্দেহ করি নি। হঠাৎ মূর্তি চুরি যাওয়ায় সবার সন্দেহ হচ্ছে, আমাকে সরিয়ে দিয়ে জিনিসটা চুরি করার জন্যেই এই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল!”নয়নবাবু, “হুম। মনে হয়, কেউ আপনার শরীরে বিষাক্ত কিছু স্প্রে করেছিল বা কিছু খাইয়ে দিয়েছিল। একটু মনে করার চেষ্টা করুন তো।”কৃষ্ণপদ বাবু, “আমার সে রকম কিছু মনে পড়ে না। তাছাড়া, বিয়ের সময় আগুনের সামনে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটাতে হয় আমাদের। তাতে চোখেমুখে, শরীরে সামান্য জ্বালা-যন্ত্রণা অনুভব করা বিচিত্র নয়। তা-ই সেই সময়ে কাউকেই সন্দেহ হয় নি।”নয়নবাবু, “মূর্তি চুরির ব্যাপারে কাউকে সন্দেহ হয়?”কৃষ্ণপদ বাবু (একটু চিন্তা করে), “না।”নয়নবাবু তাকে বিদায় দিয়ে থানায় ফিরে এলেন।
অনেক দিন কেটে যাওয়ার পরেও সুকুমার পাল স্টেটমেন্ট দিতে এল না। তখন তাকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে কল্যাণী মেন থানায় আনানো হ’ল। থানায় এসে সুকুমার অত্যন্ত রূঢ় ভঙ্গিমায় সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পালের উদ্দেশ্যে বলে উঠল, “কি ভেবেছেন আপনারা!? আমাকে ভয় দেখিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করছেন! আপনাদের কি মনে হয়, আমি মূর্তি চুরি করেছি!”নয়নবাবু, “আমরা তো একবারও সে কথা বলি নি! আপনার স্টেটমেন্ট নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, তাই ডেকে পাঠিয়েছি।”সুকুমার, “আমি জানি, ইরা ভট্টাচার্য কী স্টেটমেন্ট দিয়েছে! মহিলা আমাকে সন্দেহ করে!”
নয়নবাবু, “সন্দেহ করাটা কি খুব অন্যায়, সুকুমার!? বিশেষ করে যেখানে তুমি বিয়ের পর ও বাড়িতে পাঁচ দিন ছিলে! কেন জানতে পারি কি!?”সুকুমার, “আমাদের বাড়ি কৃষ্ণনগরে, কলকাতা থেকে অনেক দূরে। ঐ সময়ে আমার পরপর দু’টো চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার ছিল, রেলে আর সেন্ট্রাল এস.এস.সি.তে। দু’টো পরীক্ষাই ছিল কলকাতায়। তাই ও বাড়িতে পাঁচ দিন থেকে গেছিলাম। এই দেখুন আমার এডমিট কার্ডের জেরক্স। প্রয়োজন হলে সেন্টারে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন, আমার কথা সত্যি কি-না।”
সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পাল, “হুঁ, সে খোঁজ নিয়ে দেখবো; কিন্তু ইরা ভট্টাচার্য তোমার বিরুদ্ধে বয়ানে বলেছেন, তুমি লুকিয়ে-লুকিয়ে তাদের পার্সোনাল কথাবার্তা শুনতে, এটা কি ঠিক?!”সুকুমার, “ঠিক না ভুল জানি না; তবে ওদের হাবভাব কেমন যেন সন্দেহজনক ছিল! খুব খাটো গলায় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতো। বিয়ের দিন দুপুরে ঠাকুরপুজোর সময়ে ওরা উপস্থিত ছিল। সেখানে দু’জন ফিসফিস করে কী যেন কথাবার্তা বলছিল! আমি কাছে যেতেই ওদের কথা থেমে গেল! লক্ষ্য করে দেখলাম, পুজোয় ওদের ইন্টারেস্ট নেই! বরং দৃষ্টি সব সময় মূর্তির উপর! সে দৃষ্টিতে ভক্তি ছিল না, ছিল লোভ! তাই বিয়ের পরেও যখন ওরা থেকে গেল, আমি ওদের উপর নজর রাখছিলাম। নজর রাখতে গিয়েই একবার ওদের কাছে ধরা পড়ে যাই।”
নয়ন পাল, “ওদের বলতে কি শিশির ভট্টাচার্য আর ইরা ভট্টাচার্য?”সুকুমার (মাথা কাত করে সম্মতি জানিয়ে), “আমার তো ওদের উপরই সন্দেহ হয়! মনে হয়, ওরাই প্ল্যান করে মূর্তি সরিয়েছে।”নয়ন পাল, “হুঁ, তা বিচিত্র নয়। কারণ, ওদের নিজেদেরও জুয়েলারির কারবার!”সুকুমার, “তাহলেই বুঝুন!”নয়ন পাল, “ঠিক আছে, তুমি তোমার বয়ান দিয়ে এখন যেতে পারো। তোমার পরীক্ষার এডমিট কার্ডের জেরক্স দু’টো থানাতেই থাক। আমি চেক্ করে দেখতে চাই, সত্যি তোমার পরীক্ষা ছিল কি-না!”সুকুমার নয়ন পালের কথামতো নিজের বয়ান দিয়ে চলে গেল।
থানায় এই কেসের ব্যাপারে ইনস্পেক্টর থমাস ক্লার্কের সঙ্গে সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পালের কথাবার্তা চলছিল। নয়ন পাল ইন্সপেক্টরকে তার তদন্তের ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন।-“স্যার, এই কেসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যাদের নাম জড়িয়ে আছে, তারা হ’ল- মি. নির্মলেন্দু গাঙ্গুলি ও তার স্ত্রী শর্মিলা গাঙ্গুলি, কৃষ্ণপদ উপাধ্যায়, তার স্ত্রী উদিতা উপাধ্যায় ও পুত্র বাবাই উপাধ্যায়, শিশির ভট্টাচার্য ও তার স্ত্রী ইরা ভট্টাচার্য এবং সুকুমার পাল। বাকীদের, যেমন নির্মলেন্দু বাবু ও শর্মিলা দেবীর দুই কন্যা পাপিয়া ও শিউলি গাঙ্গুলিকে এই কেসের থেকে বাইরে রাখছি, কারণ এরা মূর্তি চুরির সময়ে ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে ছিল। বাইরের লোকেও এ কাজ করতে পারে, তবে এখনো পর্যন্ত সেরকম কোন সূত্র পাওয়া যায় নি।
এখন নির্মলেন্দু বাবু ও শর্মিলা দেবীর চরিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। এনারা মানুষ হিসেবে ভালোই; তবে আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ইদানিং বাজারে তাদের বেশ কিছু ধার হয়েছে। তাদের ব্যাংক একাউন্ট থেকেও ইদানিং কালে বেশ বড় অংকের টাকা তোলা হয়েছে। অবশ্য মেয়ের বিয়ের জন্য ব্যাংক থেকে টাকা তোলা বা ধার করা কোনটাই অস্বাভাবিক নয়। তবে নিজেদের পাওনাদারদের মুখ বন্ধ রাখতে নিজেদেরই একটি দামী জিনিস সরিয়ে রেখে চুরি গেছে বলে থানায় কমপ্লেন করা খুব আশ্চর্যজনক বোধহয় নয়।
এবার আসি কৃষ্ণপদ বাবু ও তার পরিবারের ব্যাপারে। একটি গরীব পরিবারের সদস্যদের পক্ষে এমন একটা সোনার তৈরী গনেশ মূর্তি চুরি করা মোটেই অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে ঠাকুরঘরের চাবি যখন তাদের কাছেই থাকতো। চুরির কাজটা বাবাই বা তার মা দু’জনের পক্ষেই করা সম্ভব। কিন্তু কৃষ্ণপদ বাবু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় সে সম্ভাবনাটা বাতিল বলেই ধরতে হচ্ছে। হাসপাতালের ডাক্তাররাও বলেছেন, কৃষ্ণপদ বাবুকে বিষাক্ত কিছু খাওয়ানো হয়েছিল, অথবা স্প্রে করা হয়েছিল। ঠিকমতো চিকিৎসা না হলে তার মৃত্যুও হতে পারতো। নিজের পরিবারের একজনকে এভাবে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়ে মূর্তি চুরির সম্ভাবনাটা তাই বাতিল করতেই হচ্ছে।
এখন শিশির ও ইরা ভট্টাচার্য সন্দেহের তালিকায় টপে আছেন। ওনাদের নিজেদের জুয়েলারির কারবার আছে। আবার, সুকুমার পালের অভিযোগ অনুযায়ী এনাদের হাবভাবও সন্দেহজনক ছিল। প্ল্যান করে একটি দামী জিনিস চুরি করা এনাদের পক্ষে বিচিত্র নয়। তবে ঠাকুরঘরের চাবি যোগাড় করা তাদের পক্ষে একটু মুশকিলের ব্যাপার বটে।
এখন সুকুমার পালের চরিত্র বিশ্লেষণে আসি। একটু বেয়াড়া ধরণের, সন্দেহজনক, অদ্ভুত প্রকৃতির, পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ছেলে। সে নিজে শিশির ও ইরা ভট্টাচার্যকে সন্দেহ করে। যদিও তার সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে; তবুও সে নিজে সন্দেহের ঊর্ধ্বে নয়। সে যে সত্যি কথা বলছে, তারও কোন প্রমাণ নেই।
আমি চেক্ করে দেখেছি, নির্মলেন্দু বাবুর মেয়ের বিয়ের পর পাঁচ দিনের মধ্যে তার পরপর দু’টি পরীক্ষা ছিল এবং সে সেগুলি এটেন্ড করেছিল। তবুও একটা খটকা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে যে, সে এডমিট কার্ডের জেরক্স কেন করাতে গেল! চাকরি পরীক্ষার এডমিট কার্ড কেউ সাধারণতঃ জেরক্স করায় না। মনে হচ্ছে, ওর পরীক্ষা ছিল সেটা প্রমাণ করার জন্যেই ও এগুলি জেরক্স করিয়েছিল!”
যাই হোক, ইন্সপেক্টর থমাস ক্ল্যার্কের নির্দেশে সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পাল নির্মলেন্দু বাবুর বাড়ি তন্নতন্ন করে সার্চ করলেন। নির্মলেন্দু বাবুর তরফে কোন বাধা এল না বটে, তবে উদিতা দেবী তাদের ঘরে সার্চ করার সময়ে কিঞ্চিৎ অসন্তোষ প্রকাশ করলেন এই বলে যে, “আপনারা আসল অপরাধীকে খুঁজে না পেয়ে কি শেষ পর্যন্ত আমাদের দোষী সাব্যস্ত করতে চান! আমরা জাতে ব্রাহ্মণ, উচ্চ বংশ। কালের ফেরে গরীব হতে পারি, তবে চোর নই।” যদিও পুলিশ গোপালের মূর্তি বা সন্দেহজনক কোন জিনিস উদ্ধারে ব্যর্থ হ’ল।
ওদিকে শিশির ও ইরা ভট্টাচার্য এবং সুকুমার পালের বাড়িতে স্থানীয় থানার পুলিশ সার্চ করেও কোন সন্দেহজনক জিনিস খুঁজে পেল না। প্রত্যেকের ব্যাংক একাউন্ট চেক্ করেও রিসেন্ট বড় অংকের অর্থ ট্রানজাকশনের নজির পাওয়া গেল না। ফলে কৃষ্ণপদ উপাধ্যায়ের হঠাৎ অসুস্থ হওয়া ও গোপালের দামী মূর্তি চুরির রহস্য বহুদিন যাবৎ আনসল্ভড রয়ে গেল।
অন্যদিকে শিউলি গাঙ্গুলি তার নতুন ঠিকানায় নিজেকে ভালোই মানিয়ে নিয়েছে। ব্যারাকপুর চন্দনপুকুরের রামানন্দ ঘোষালের বাড়িতে বৌমা হয়ে এসে সে ঘর-সংসার ভালোই সামলাচ্ছে। বৃদ্ধ রামানন্দ বাবুও তার বৌমাকে আপন করে নিয়েছেন। তিনি নিজে বিপত্নীক। প্রায় কুড়ি বছর আগে যখন রমেন ছোট ছিল, তখন তার স্ত্রী কাকলি দেবী হার্ট ফেল করে হঠাৎ মারা যান।
সেই সময় থেকে ঘর-সংসার সামলানো থেকে শুরু করে ছেলের পড়াশোনা, যাবতীয় দায়িত্ব তার কাঁধে ছিল। তার সেই দায়িত্ব খানিকটা কমেছিল ছেলে বড় হয়ে অর্থ উপার্জন শুরু করার পর; আর পুরোপুরি শেষ হ’ল বৌমা হিসেবে শিউলি আসার পর। শিউলিও তার শশুরমশাইকে যথাসম্ভব ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। বিয়ের পর প্রায় এক বছর কেটে গেছে, এখন তাদের রসায়ন দারুণ। একবারের জন্যেও কেউ কারও মনে দুঃখ দেয় নি।
বৃদ্ধ নিজের দায়িত্ব সব ছেলে-বৌমার উপর চাপিয়ে দিয়ে নিজে মুক্ত বিহঙ্গের মতো বিচরণ করেন। এখন নিজেকে অনেক হালকা বোধ হয় তার। তার জীবনে এখন অখন্ড অবসর; কোন বাধাই আর সেখানে নেই। তিনি সকাল ছ’টায় উঠে ফ্রেস হয়ে মর্নিং ওয়াকে বের হন। আনন্দপুরীর মাঠে গিয়ে অনেক সময় ধরে বসে থাকেন। অপরূপ প্রকৃতির স্নিগ্ধতা উপভোগ করেন। তারপর স্টেশনে গিয়ে ঘন্টাখানেক বসেন। অফুরন্ত মানুষের আনাগোনা দেখেন। সাড়ে দশটা নাগাদ বৃদ্ধ ঘরে ফিরে আসেন।
বিকেল চারটে বাজলে রামানন্দ বাবু আবার বাইরে বের হন। তারপর ঘরে ফিরে সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার পর প্রতিবেশী মনোহর পন্ডিতকে ফোন করে বাড়িতে ডেকে নেন। দু’জনে চা পান করতে-করতে আড্ডা দেন। এর মধ্যে ছেলে রমেন ডিউটি থেকে ফিরে এলে সেও আড্ডায় যোগ দেয়। মাঝেমধ্যে শিউলিও তাদের আড্ডায় যোগদান করে, নিজের মতামত জানায়। 
দিন কতক হ’ল, তেইশ-চব্বিশ বছরের একটি ছেলের সঙ্গে বৃদ্ধ রামানন্দ বাবুর পরিচয় হয়েছে। ছেলেটির নাম সুলোচন গায়েন; সুদূর শিকারপুর গ্রাম থেকে এসেছে। সে তাদের পাশের বাড়িতে এসে উঠেছে, ভাড়া থাকে। এখানে আসার কারণ জিজ্ঞেস করাতে সে বলেছে, “চাকরির চেষ্টা করছি, কাকাবাবু। গ্রামে থেকে চাকরি পাওয়া খুব মুশকিলের। বেশির ভাগ চাকরির পরীক্ষা তো কলকাতায় হয়। অতো দূর থেকে এসে পরীক্ষা দেওয়া অত্যন্ত কষ্টের। তাই ধীরেধীরে এখানেই শিফ্ট হব ঠিক করেছি। ভাবছি, চাকরি পেলে বৃদ্ধ মা-বাবাকেও শহরে নিয়ে আসবো।”
ছেলেটি বেশ চালাক-চতুর, তবে হাসিখুশি এবং মিশুকেও বটে। রামানন্দবাবু থেকে শুরু করে শিউলি পর্যন্ত প্রত্যেকেই তাকে পছন্দ করে। সে তাদের চায়ের আড্ডায় নিয়মিত যোগ দেয়; এটা-সেটা মন্তব্য করে। দেশ-বিদেশের রাজনীতি, বিজ্ঞান, ইতিহাস নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। কেনই বা করবে না, সুলোচন এসব জিনিস নিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করে যে। এমনকি দেশ-বিদেশের ক্রাইমের খবরও সে খবরের কাগজ থেকে সংগ্রহ করে খাতায় টুকে রাখে এবং মাঝেমধ্যে সেসব সবাইকে শোনায়। সবাই তার কথা মন দিয়ে শোনেও বটে।
সুলোচন নিজে একজন গোয়েন্দা গল্পের ভক্ত। দেশ-বিদেশের নানান লেখকের গোয়েন্দা গল্প সে হয় বই কিনে, না হয় লাইব্রেরী থেকে জোগাড় করে পড়ে। আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস, আগাথা ক্রিস্টির মিস জেন মার্পল ও মি. হারকিউল পইরট, এডগার এলান পোর অগাস্ট ডুপিন, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সী এবং সত্যজিৎ রায়ের প্রদোষ চন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা তার পড়া শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা চরিত্র। তার মতে এদের মধ্যে শার্লক হোমস,  ব্যোমকেশ বক্সী আর ফেলুদা গোয়েন্দা হিসেবে সেরা। কিরিটি রায়, জয়ন্ত-মানিক, মিতিন মাসি, শবর দাসগুপ্ত ইত্যাদি গোয়েন্দা চরিত্রগুলি তার কাছে খুব একটা ভালো লাগে না।
টিটাগড় থানার সাব-ইন্সপেক্টর পদে থাকা রমেন ঘোষাল সুলোচন গায়েনের জ্ঞান ও বুদ্ধি দেখে অবাক না হয়ে পারে না। তাই সে মাঝেমধ্যে তার থানার বিভিন্ন কেস নিয়ে সুলোচনের সঙ্গে আলোচনা করে। নিজের বিয়ের সময়ে ঠাকুর মশাইয়ের হঠাৎ অসুস্থতা এবং তারপর শশুরবাড়ি থেকে গনেশের সোনার মূর্তি চুরি হওয়ার ঘটনা সে-ই কথায়-কথায় সুলোচনকে জানালো। সুলোচন খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পুরো ঘটনাটা সম্বন্ধে জানার পর বিয়েতে উপস্থিত প্রতিটি লোকের চরিত্র বিশ্লেষণ করল। তার মতে, “গোয়েন্দাগিরির প্রথম পাঠই হ’ল, ঘটনা ও সেখানে উপস্থিত প্রতিটি লোকের চরিত্র সম্বন্ধে পুরোপুরি অবগত হওয়া।”
কল্যাণী মেন থানার সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পালের মতো তার মনেও নানা রকম প্রশ্নের উদয় হ’ল এবং সেও মেনে নিল যে, বাড়ির কেউ না কেউ দু’টি ঘটনার সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু কে সেই ব্যক্তি হতে পারে! তার মন থেকেও খটকা দূর হচ্ছিল না। তাদের আলোচনার মাঝেই শিউলি ঘোষাল (গাঙ্গুলি) স্বামীর উদ্দেশ্যে মন্তব্য করল, “আমাদের বিয়ের ডিভিডিটা চালাও না, সবাই মিলে দেখি।”রমেন একটু বিরক্ত বোধ করলো, সে বলল, “দেখছো না, তোমার বাপের বাড়ির ঘটনা নিয়েই আলোচনা করছি। তার মধ্যে তুমি বিয়ের ডিভিডি চালাতে বলছো!”
রামানন্দ বাবু মন্তব্য করলেন, “হ্যাঁ, চালা না ভিডিওটা। ওটা দেখেও তো অপরাধী সম্বন্ধে কিছু জানা যেতে পারে! কী বল, সুলোচন?”সুলোচন, “একদম ঠিক, কাকাবাবু! ওটাও কিন্তু অপরাধ ও অপরাধী ধরতে সাহায্য করতে পারে।”মনোহর বাবু, “হ্যাঁ, আর যদি কিছু না-ও বোঝা যায়, তবু আমরা তো দেখতে পাবো ভিডিওটা! সেটাই বা কম কিসে! আমরা তো বিয়েতে উপস্থিত ছিলাম না!”শিউলি সবার সাপোর্ট পেয়ে উৎসাহের সঙ্গে বলল, “হ্যাঁ, চালাও, চালাও।” অগত্যা নিজের ইচ্ছা না থাকলেও বাকী সবার ইচ্ছায় রমেন ঘোষাল ডিভিডি খুঁজে বের করে প্লেয়ারের সাহায্যে চালু করল।
ভিডিওর শুরুতে ‘শিউলি ওয়েডস রমেন’ লেখাটা বড় অক্ষরে পুরো স্ক্রিন জুড়ে ফুটে উঠল। তারপর শুরু হ’ল বাংলা গান ‘লাজে রাঙ্গা হ’ল কনে বউ গো’, আর সেই সঙ্গে কনের বেসে শিউলি গাঙ্গুলির নানা এঙ্গেল থেকে তোলা স্টিল ফোটো বিভিন্ন এফেক্টের সাথে স্ক্রিনে ফুটে উঠতে লাগল। এসবের পর বিয়ের পুরোহিত কৃষ্ণপদ বাবুকে দেখা গেল, বিয়ের নানা ফল-ফলাদি, বেলপাতা ইত্যাদি সাজিয়ে বসে মন্ত্রপাঠের আয়োজন করছেন। 
এর কিছু পর একজন মাঝবয়সী লোক এসে মন্ত্রপাঠে যোগ দিলেন। শিউলি জানালো, ইনি তার জ্যেঠতুতো দাদা দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি, অধিবাসে বসেছেন। কিছুক্ষণ পরে শিউলি কনের বেসে এসে তার দাদার সামনের আসনে বসল। দ্বারকানাথ বাবু তার হাতে একটি গাছকৌটো ধরিয়ে দিলেন। তারপর মন্ত্রপাঠ চলল কিছুক্ষণ। সবকিছুর মাঝে-মাঝে কিশোর কুমার, কুমার শানু, আরতি মুখোপাধ্যায়, অলকা ইয়াগনিক প্রমুখ মহান সঙ্গীতশিল্পীর গানের কিছু-কিছুটা যুক্ত করে দিয়ে এডিটর ভিডিওটাকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করেছেন।
এরপর নির্মলেন্দু বাবু ও শর্মিলা দেবী একে-একে এসে আসন গ্রহণ করে মেয়েকে আশীর্বাদ করলেন। এর পরের দৃশ্যে দেখা গেল, ব্যান্ডবাদকরা তাদের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে তৈরী হয়ে আছে। সুসজ্জিত পোশাকে তাদের দারুণ মানিয়েছেও। মহিলারা এখন তৈরী হচ্ছে পুকুর থেকে জল আনতে যাবে বলে। এরপর দেখা গেল, মহিলা ও বাচ্চারা আনন্দ করতে-করতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে; কেউ-কেউ নাচতে-নাচতে চলেছে। তাদের পিছনে বাজনা বাজাতে-বাজাতে চলেছে ব্যান্ডবাদকের দল। 
মহিলাদের মধ্যে আছেন শর্মিলা দেবী নিজে, তার বড় মেয়ে পাপিয়া, ইরা ভট্টাচার্য, পাড়ার কিছু মহিলা প্রমুখ। বাচ্চাদের মধ্যে পাপিয়ার বড় ছেলে, ইরা দেবীর দুই মেয়ে, কৃষ্ণপদ উপাধ্যায়ের এক সম্বন্ধীর ছেলে ইত্যাদিরা রয়েছে। প্রত্যেকের মুখই খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। শিউলি-ই একে-একে এদের সবার পরিচয় জানালো। এরপরের দৃশ্যে দেখা গেল, ব্যারাকপুর-নিবাসী রামানন্দ ঘোষালের বাড়ি থেকে কনের জন্যে হলুদ ও অন্যান্য তত্ত্ব-সামগ্রী নিয়ে বরের মামা ও তার ছেলে এসেছে। এই হলুদ দিয়েই শিউলিকে স্নান করানো হবে। 
কনেকে হলুদ মাখানো ও স্নানের কিছু টুকরো মুহূর্ত দেখানোর পর এডিটর ডায়রেক্ট চলে গেলেন প্যান্ডেল সাজানোর দৃশ্যে। নির্মলেন্দু বাবুর উঠোনেই প্যান্ডেল সাজানোর ব্যবস্থা হয়েছে। সবকিছু তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে আছে বাবাই উপাধ্যায়, বিয়ের পুরোহিত কৃষ্ণপদ বাবুর ছেলে। এক প্রান্তে অলরেডি তাঁবু খাঁটিয়ে দুপুরের জন্যে রান্না-বান্না চলছে। শিউলি জানালো, বাবাই ফুল দিয়ে ভালো সাজাতে পারে। তাই ফুল জোগাড় করা ও সেই ফুল দিয়ে প্যান্ডেলকে সুন্দর করে সাজানোর দায়িত্ব তাকেই দেওয়া হয়েছিল।
তার পরের দৃশ্যে সরাসরি বিয়ের অনুষ্ঠান দেখানো শুরু হল। সুদৃশ্য প্যান্ডেলের এক প্রান্তে স্টেজ তৈরী করে তার উপর কনের জন্যে আকর্ষণীয় একটি চেয়ার স্থাপন করা হয়েছে। গায়ক অভিজিৎ ভট্টাচার্যের একটি জনপ্রিয় গানের সঙ্গে কনের আত্মীয়া ও বান্ধবীরা ধীরে-ধীরে কনের বেশে সজ্জিত শিউলিকে সেই চেয়ারের উপরে বসিয়ে দিল। 

Gift List for Your Wedding Party and Family: Wedding Thank You Gifts

নানা এঙ্গেল থেকে কনের সিঙ্গেল পোজ নেওয়ার পর তার সঙ্গে তার বাবা-মা, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-পড়শীর ফোটো তোলার পর্ব চলল বেশ কিছুক্ষণ। নিমন্ত্রিত ব্যক্তিরা একে-একে এলেন ও শিউলির হাতে গিফ্ট প্রদান করে তাদের জন্যে নির্দিষ্ট বসার স্থানে গিয়ে বসলেন। শিউলি হাসিমুখে গিফ্টগুলি নিচ্ছে ও সেগুলি তার পাশে বসে থাকা পিসতুতো বোনের হাতে একে-একে তুলে দিচ্ছে।
এরপর দেখা গেল, নির্মলেন্দু বাবুর বাড়ির গেটে বরের গাড়ি পৌঁছে গেছে এবং গাড়ি থেকে  বরবেশী রমেন ও তার পক্ষের চারজন ব্যক্তি ধীরে-ধীরে বেরিয়ে আসছে। তাদের দেখে কনের পক্ষের লোকজন বাড়ির গেটে এসে উপস্থিত হয়েছে ও সাদর অভ্যর্থনা করে তাদের ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে। বরবেশী রমেনকে তার হবু শাশুড়ি শর্মিলা দেবী বরণ করে ভিতরে নিয়ে গেলেন।
তার পরের দৃশ্যে বরের পক্ষের লোকজনকে হাতে তত্ত্বাদি নিয়ে একে-একে ঢুকতে দেখা গেল। শিউলি মন্তব্য করল, “ওদের বাস এসে গেছে।” সবাই চলে আসার পর রমেনের দুই মামা, কাকা, পিসি, রামানন্দবাবু প্রমুখ একে-একে কনেবেশী শিউলিকে আশীর্বাদ করে গেলেন। এরপর ম্যারেজ রেজিস্ট্রারকে দেখা গেল। তিনি নিজের কর্তব্য পালন করলেন। নির্মলেন্দু বাবু ও শর্মিলা দেবীর কনিষ্ঠা কন্যা শিউলি গাঙ্গুলির সঙ্গে রামানন্দ বাবুর একমাত্র পুত্র রমেন ঘোষালের রেজিস্ট্রি ম্যারেজ সম্পন্ন হ’ল। 
তিনি চলে যাওয়ার পর বরবেশী রমেনের অনেকগুলি পোজ নেওয়া হ’ল। সেইসাথে এডিটরের যোগ করা জনপ্রিয় হিন্দি গানের সুর শোনা যেতে লাগল। তারপর ক্যামেরার এঙ্গেল ঘুরে গেল বিয়ের পুরোহিত কৃষ্ণপদ বাবু ও অধিবাসে বসা দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির দিকে। এল.ই.ডি. স্ক্রিনে কিছুক্ষণ বিয়ের যজ্ঞাদি ও নিয়ম-নীতি পালন দেখানো হ’ল। এরপর শিউলির জামাইবাবু প্রভাষ চক্রবর্তী বরবেশী রমেনকে নিয়ে এসে দ্বারকানাথ বাবুর পাশের আসনে বসালেন। দ্বারকানাথ বাবু তার হাতে বিয়ের টোপর, বস্ত্র ও অন্যান্য জিনিস প্রদান করলেন।
এরপরে বিয়ের সাজে প্রস্তুত রমেন ও শিউলিকে নিয়ে আসা হ’ল প্যান্ডেলের ঠিক মাঝখানে। সেখানে দারুণ আনন্দঘন মুহূর্তের স্মৃতি ক্যামেরা-বন্দি করে তাদের শুভদৃষ্টি ও মালাবদল সম্পন্ন হ’ল। পরের দৃশ্যে নবদম্পতিকে পুরোহিত মশাইয়ের সামনে পাশাপাশি দু’টি আসনে বসানো হ’ল। বিয়ের নিয়ম-নীতি পালনের মাধ্যমে রমেন তার সদ্য বিবাহিত পত্নীর সিঁধি রাঙ্গা করে দিল। তারপর সাতপাকে ঘুরে বর ও কনে তাদের আগামী জীবনে একসাথে থাকার অঙ্গিকারবদ্ধ হ’ল।
শুভ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ক্যামেরাম্যান সরাসরি চলে গেলেন ভোজনকক্ষের দৃশ্যে। সেখানে তখন লুচি, ফ্রায়েড রাইস, খাসির মাংস, পাবদা মাছের ঝাল, রসগোল্লা, চমচম প্রভৃতি মুখরোচক খাবারের থালায় ডুবে আছে কম করে জনা পঞ্চাশেক মানুষ। কেউ-কেউ কেবল খেতে বসেছে, তো কারো-কারো পাতে আইসক্রিম এসে গেছে। ক্যামেরায় মানুষের ভক্ষণকালীন নানা ভঙ্গিমা ধরা পড়ছে, যা দেখতে-দেখতে হাসি চেপে রাখা অসম্ভব হয়ে ওঠে।
এর পরের দৃশ্য একটু বিষাদ মিশ্রিত। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী শিউলির বাড়িতে একরাত যাপন করে বর (‘স্বামী’ শব্দে আমার ব্যক্তিগত আপত্তি আছে) অর্থাৎ রমেন সস্ত্রীক তার নিজের বাড়িতে ফিরে যাবে। গুরুজনেরা একে-একে নবদম্পতিকে আশির্বাদ করলেন। তাদের মধ্যে আছেন শিউলির নিজের পিতা-মাতা নির্মলেন্দু বাবু ও শর্মিলা দেবী, মেজ মামা শিশির ভট্টাচার্য ও মেজ মামি ইরা ভট্টাচার্য এবং পাড়া-পড়শীরা।
আশির্বাদ পর্বের পর পরিবেশ হঠাৎই অত্যন্ত ভারী হয়ে উঠল। শিউলি তার এতোদিনের পরিচিত নিজের ঘর ত্যাগ করে চলে যাওয়ার আগে কান্নাকাটি জুড়ে দিল। দেওয়াই স্বাভাবিক। এতোদিনের পরিচিত নিজের ঘর আর তার নিজের রইলো না! এ ঘর এখন থেকে পরিচিতি পাবে তার ‘বাপের ঘর’ বলে! আর সম্পূর্ণ অপরিচিত একটি ঘর, তার শশুরমশাইয়ের ঘর এখন থেকে তার নিজের ঘর-রূপে পরিচিত হবে। তাকে ছেড়ে যেতে হবে তার নিজের পাড়া, পরিবেশকেও!
মা-বাবাকে চোখের জলে বিদায় দিয়ে নিজের বর রমেন ঘোষালের সঙ্গে শিউলি ঘোষাল (গাঙ্গুলি) তাদের জন্য নির্দিষ্ট গাড়িতে চেপে তার নতুন ঠিকানা ব্যারাকপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। বিয়ের পর সে শুধু নিজের পরিচিত লোকজন ও পরিবেশই ত্যাগ করলো না, বিয়ের সাথেসাথে ত্যাগ করলো তার নিজের পদবিও। তাদের যাত্রায় সাথী হ’ল শিউলির নিজের দিদি পাপিয়া ও জামাইবাবু প্রভাষ চক্রবর্তী। একটি বিষাদঘন বাংলা গানের সুরের সাথে-সাথে শিউলি ও রমেনের বিয়ের প্রথম ডি.ভি.ডি.টি খতম হ’ল।
মনোহর বাবু বলে উঠলেন, “শেষ হয়ে গেল নাকি! এ বাড়ির দৃশ্য কই?! বৌভাতের দৃশ্য দেখবো না?!”রমেন হেসে বলল, “প্রথম ডি.ভি.ডি.টা শেষ হয়ে গেল। সেকেন্ডটা ইনসার্ট করতে হবে।”রামানন্দ বাবু, “বাবা সুলোচন, এতক্ষণ তো বিয়ের সবটাই দেখলে। কৃষ্ণপদ বাবুর অসুস্থতা বা মূর্তি চুরির ব্যাপারে কোন ক্লু পেলে কি?!”রমেন, “কী যে বল না বাবা! শুধু বিয়ের অনুষ্ঠান দেখে কখনও রহস্যের সমাধান করা যায় না-কি?!”
সুলোচন, “কাকাবাবু, ক্লু পেয়েছি বৈকি। তবে আমার কিছু প্রশ্ন আছে। সেসবের ঠিকমতো জবাব পেয়ে গেলে কে অপরাধী সেটা বলতে সক্ষম হব।”রমেন (আঁতকে উঠে), “কী, ক্লু পেয়ে গেছো!?”সুলোচন, “হ্যাঁ, পেয়েছি বৈকি।”মনোহর বাবু, “কৈ, আমরাও তো দেখলাম! কিছু বুঝতে পারলাম না-তো!”রমেন (শিউলিকে দেখিয়ে), “আমরা তো কত বার দেখেছি, বাবাও দেখেছেন। কই, আমরা তো কিছু বুঝতে পারি নি!”
সুলোচন (একটু হেসে), “আপনারা দেখেছেন বিয়ের আনন্দ উপভোগ, স্মৃতি রোমন্থনের উদ্দেশ্য নিয়ে। কিন্তু আমি দেখেছি, রহস্য উদ্ঘাটনের উদ্দেশ্য নিয়ে। দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে পার্থক্য আছে যে! তাই আপনাদের চোখে যে সব জিনিস ধরা পড়ে নি, আমার চোখে সেগুলিই ধরা পড়েছে বলেই আমি ক্লু খুঁজে পেয়েছি।”

Shubham Decorater | Wedding Decorators in Kolkata | ShaadiSaga

একটু থেমে শিউলির উদ্দেশ্যে বলল, “বিয়ের অনুষ্ঠানের একদম শুরুতে প্যান্ডেলের ছাদের ঠিক মাঝখানে নানা রঙের ফুল দিয়ে সাজানো একটি সুদৃশ্য নকশা লক্ষ্য করলাম। কিন্তু পরের দিকে, সম্ভবতঃ বরযাত্রীরা আসার পরে সেসব ফুল আর দেখা গেল না! আর উঠোনেও বেশ কিছু ফুল ছড়ানো-ছিটানো দেখতে পেলাম। এর কারণটা কী ছিল, আপনার জানা আছে কি?”
একটু ভেবে শিউলি জবাব দিল, “আসলে ওটা বানানোর প্ল্যান ছিল বাবাইদার। ও-ই ফুল সাজানোর লোকেদের সাহায্যে সুন্দর করে ঐ জিনিসটা বানিয়েছিল। তারপর প্যান্ডেলের ছাদে এমনভাবে সেট করিয়েছিল যে, যখন বরযাত্রীরা প্যান্ডেলের ভিতর ঢুকবে, তখন ওর সাথে যুক্ত একটা দড়ি ধরে টান দিলেই ফুলগুলো এক-একটা করে ঝরে তাদের মাথায়, গায়ে পড়বে। সবই ঠিক ছিল। যে দড়ি ধরে টান দেবে তাও ঠিক ছিল। কিন্তু সমস্যা হ’ল, বরযাত্রীরা আসার পর বারবার দড়ি ধরে টান দেওয়ার পরও ফুলগুলো ঝরলো না! এসব অবশ্য আমি পরে অন্যদের মুখে শুনেছি।
তো ফুল না ঝরায় বাবাই সুকুমারকে ডেকে জিনিসটা পরীক্ষা করতে বলল। তখন সুকুমার ওর কথা শুনে আমাদের ভাঁড়ার ঘর থেকে ভাঁজ করা মইটা বের করে নিয়ে এল ও ওতে চড়ে প্যান্ডেলের ছাদে পৌঁছালো। তখন সেখানেও এক গোলযোগ বাধল! ও ফুলের নকশাতে হাত দিতেই একসঙ্গে সব ক’টা ফুল ঝরে নিচে পড়ল।”সুকুমার (একটু ভেবে), “হুম। সবার পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছে, সময়টা শীতকাল ছিল।  সেই সঙ্গে কি বৃষ্টিও হয়েছিল? কারণ খাওয়ার প্যান্ডেলের মাটিতে আমি ভেজা-ভেজা ভাব দেখেছি।”
রমেন, “একদম ঠিক! সেদিন সকাল থেকেই থেকে-থেকে বৃষ্টিপাত হচ্ছিল!”শিউলি (একটু ভেবে নিয়ে), “হ্যাঁ, যখন সুকুমার প্যান্ডেলের ছাদে উঠল, তখনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছিল!”সুকুমার, “সেই সময় আসেপাশে কারা-কারা ছিল, মনে আছে?”শিউলি, “সুকুমারকে মই নিয়ে আসতে দেখে সবাই প্যান্ডেল ছেড়ে ঘরে ঢুকে পড়েছিল। প্যান্ডেলের একপাশে ছিলেন শুধু কৃষ্ণপদ বাবু। উনি যজ্ঞের আয়োজন করছিলেন।”
সুলোচন একটু হেসে বলল, “তাহলে তো হয়েই গেল! অপরাধ ও অপরাধী দুই-ই আমি জেনে গেছি। একটু কনফার্ম হওয়ার জন্য আমাকে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা-টা ঘেঁটে দেখতে হবে শুধু।”মনোহর বাবু, “বাব্বাঃ, সব জেনে ফেললে! এ ছেলে তো দারুণ হে! সাক্ষাৎ শার্লক হোমস, ব্যোমকেশ, নয়তো ফেলুদা!”শিউলি (সুলোচনকে উঠতে দেখে), “ভাই, আজ রাতে এখানেই খেয়ে যেও। তোমাকে হাত পুড়িয়ে রান্না করতে হবে না।”
রামানন্দ বাবু (উৎসুকভাবে), “অপরাধী কে, আজই জানতে পারবো তো!?”সুলোচন, “অবশ্যই।”রামানন্দ বাবু, “তাহলে মনোহর বাবু, আপনিও এখানেই খেয়ে যাবেন। বৌমা, রান্না চাপাও।”(মনোহর পন্ডিত রামানন্দ বাবুর তুলনায় বয়সে অনেকটাই ছোট হলেও রামানন্দ বাবু তাকে সম্মানার্থে ‘মনোহর বাবু’ বলে সম্বোধন করেন।)মনোহর বাবু, “না, সেটি হবার যো নেই! গিন্নী রাগ করবে!”সুলোচনের দিকে চেয়ে, “আমি বরং পরে রামদাকে (অর্থাৎ, রামানন্দ বাবু) ফোন করে সবটা জেনে নেব। এখন তবে আমিও উঠি।”মনোহর বাবু ও সুলোচন একসঙ্গে বেরিয়ে গেল।
ঘন্টা খানেক বাদে রাত সাড়ে নয়টা নাগাদ সুলোচন ফিরে এল। সে ফিরে আসতে রমেন ব্যস্তসমস্তভাবে বলল, “বল, বল, অপরাধীর নাম বল।”শিউলি (তাকে বাধা দিয়ে), “আগে তোমরা সবাই খেতে বস তো! খেয়ে-দেয়ে তারপর বলবে ক্ষণ।”রমেন, “ঠিক আছে, খেয়ে নিয়ে শুনবো তাহলে। আমার যে আর ধৈর্য ধরছে না!”রামানন্দ বাবু (বিরক্তির সঙ্গে), “অ্যাই রমেন, তোর ছেলেমানুষী রাখ তো! এতো অধৈর্য হ’লে চলে! এই ছেলেমানুষী বুদ্ধি নিয়ে তুই পুলিশের দারোগা হ’লে তোকে কেউ মানবে না। ধৈর্য ধরতে শেখ।”
খাওয়া-দাওয়ার শেষে সবাই আরাম করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলো। এবার সুলোচন বলতে শুরু করল, “ঘটনাটা অত্যন্ত চাতুরীর সঙ্গে ঘটানো হয়েছিল, যাতে কারও সন্দেহ না হয়। আর যারা ঘটিয়েছিল, তাদের একজন এমন ব্যক্তি যার নাম বলার সাথেসাথে আপনারা চমকে যাবেন।”সে একটু থামলো; সবার মনের ভাব বোঝার চেষ্টা করল। ঘরের মধ্যে সাময়িক নিস্তব্ধতা বিরাজমান হ’ল। এক সময়ে রমেন আর চুপ থাকতে না পেরে বলে উঠল, “আরে, হেঁয়ালি না করে বল না! কে সেই ব্যক্তি?!”সুলোচন, “কৃষ্ণপদ বাবুর নিজের ছেলে বাবাই উপাধ্যায়। আর তার সঙ্গে ছিল সুকুমার পাল। সবার চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটিয়েছিল, অথচ এমন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার সাথে যে, কেউ বুঝতেই পারলো না!”
রমেন (আঁতকে উঠে), “ও, তার মানে কি ঐ ফুলের মধ্যেই বিষ ছিল!?… কিন্তু তা কি করে সম্ভব?!… তাহলে তো সুকুমার পালই প্রথমে ঐ বিষে আক্রান্ত হতো!”রামানন্দ বাবু, “হ্যাঁ, সেই কারণে তোমার যুক্তি ঠিক মানতে পারলাম না, সুলোচন! তাছাড়া কৃষ্ণপদ বাবু তো একটু দূরে ছিলেন। ফুল তো তার গায়েও পড়ে নি, তাহলে!?”শিউলি, “ভাই, তুমি বল। আমাদের কিছু মাথায় ঢুকছে না!”সুলোচন, “আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে, সুকুমার চোখে চশমা পরে।”
রমেন, “হ্যাঁ, ওর তো চোখে সমস্যা আছে।”সুলোচন, “আর সেটাই ছিল চালাকি! শীতকাল বলে গায়ে ছিল সোয়েটার, আর চোখ খারাপ বলে চোখে চশমা। তো বিষের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার মতো প্রটেকশন তার ছিল।”রামানন্দ বাবু, “তুমি কি বলতে চাইছো, জিনিসটা গ্যাসীয় ছিল!?”সুলোচন (হাসিহাসি মুখ করে), “কাকাবাবু, একদম ঠিক বলেছেন। অনেক রকম বিষাক্ত গ্যাসীয় কেমিক্যাল আছে, যাদের নিজেদের বর্ণ ও গন্ধ নেই। কিন্তু বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে মানুষের চোখ, ত্বক, ফুসফুস ইত্যাদির মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। এর হাত থেকে আত্মরক্ষার একমাত্র উপায় হ’ল, নিজেকে যথাসম্ভব ঢেকে রাখা।”
শিউলি, “সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু তাহলে তো কৃষ্ণপদ বাবু তখনই অসুস্থ হয়ে পড়তেন, তাই নয় কি?!”সুলোচন, “সেখানেও চালাকি আছে। কিছু বিষাক্ত গ্যাস এমন আছে যে, তাদের বিষক্রিয়া শুরু হতে অনেকটা সময় লাগে। সেই সময়ের মধ্যে নিজেকে গ্যাসমুক্ত করতে পারলে বিশেষ ক্ষতি হয় না। আমার মনে হয়, সুকুমার পাল নিজের নাকের ফুটো তুলো বা ঐ জাতীয় কিছু দিয়ে বন্ধ করে নিয়েছিল, যাতে গ্যাস শরীরের ভিতরে না ঢুকতে পারে।”রামানন্দ বাবু, “ব্যাপারটা প্রথম থেকে বল দেখি, বেশ লোমহর্ষক বলে মনে হচ্ছে!”
সুলোচন, “হ্যাঁ, তা-ই বলছি। বাবাই আর সুকুমার একসঙ্গে প্ল্যান বানালো, সোনার গনেশ মূর্তি চুরি করবে। ঠাকুরঘরের চাবি বাবাইদের ঘরেই থাকতো। সে কোনো এক সময়ে সেটার ডুপ্লিকেট বানিয়ে নিয়ে এল। এখন মূর্তি চুরি করবো বললেই তো হ’ল না, বিশেষ করে বাবাইয়ের নিজের বাবা অর্থাৎ কৃষ্ণপদ বাবু-ই যেখানে মূর্তির দায়িত্বে আছেন। তাই তাকে সরানোর প্রয়োজন হ’ল। 

Compressed Gas Cylinders | Lab Manager

তারা কৌশলের আশ্রয় নিল। প্যান্ডেল সাজানোর ভার বাবাইয়ের উপর ছিল। সে বা তারা দু’জনে, হয়তো আরও কেউ দলে ছিল, সবাই মিলে বর্ণ-গন্ধহীন একটা গ্যাসীয় কেমিক্যালের জোগাড় করলো। প্যান্ডেলের ঠিক মাঝখানে ফুলের সজ্জার ভিতরে কায়দা করে কোন কন্টেনার, হয়তো প্ল্যাস্টিকের মোড়কে সেই কেমিক্যাল রাখলো। ওর সাথে একটা দড়িকে এমনভাবে যুক্ত করলো যে, সেটা টানলেও ফুলের সজ্জার কিছু হবে না।
তাই বরযাত্রীরা এলে প্ল্যানমতো দড়িতে টান দিলেও কাজ হ’ল না। তখন বাবাই সুকুমারকে মই নিয়ে এসে চেক্ করতে বলল। সুকুমারের চোখে চশমা, গায়ে শোয়েটার, নাকে তুলো বা অন্যকিছু। সে ফুল প্রটেকশনের সাথে মই নিয়ে হাজির হ’ল। তাকে মই আনতে দেখে সবাই ঘরে ঢুকে গেল। এবার সে মইতে চড়ে পূর্ব পরিকল্পনা মতো ফুলের সজ্জার কাছাকাছি পৌঁছে এমন কিছু একটা করল, যে সমস্ত ফুল ঝরে নিচে পড়ে গেল। সেই সঙ্গে প্ল্যাস্টিকের মোড়কে রাখা গ্যাসীয় কেমিক্যাল তার আবরণ মুক্ত হয়ে সারা প্যান্ডেলে ছড়িয়ে পড়ল। 
প্যান্ডেলের ভিতরে তখন সুকুমার আর কৃষ্ণপদ বাবু ছাড়া আর কেউ নেই। একপাশে বিয়ের যজ্ঞের আয়োজনে ব্যস্ত কৃষ্ণপদ বাবু প্রায় সম্পূর্ণ অনাবৃত। সুতরাং গ্যাসীয় বিষ তার সারা শরীর, নাক, মুখ, চোখ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করল। তবে বিষের ক্রিয়া শুরু হতে দেরী হয় বলে তিনি কিছু বুঝতে পারলেন না। তাছাড়া কিছু হলেও তিনি ভাবলেন, হয়তো যজ্ঞের আগুন, ধুপের ধোঁয়ার জন্য এমনটা হচ্ছে।
ওদিকে কাজ শেষ করে সুকুমার টয়লেটে চলে গেল ও নিজেকে ভালোভাবে পরিস্কার করে নিল। ফলে গ্যাসীয় বিষ তার কোন ক্ষতি করতে পারলো না। বিয়ের ডিভিডিটা লক্ষ্য করলে দেখবেন, এই ঘটনার পরে বেশ কিছুক্ষণ তাকে আর দেখা যায় নি। গ্যাসটা প্যান্ডেলের বাইরেও ছড়ালো না, কারণ বাইরে তখন বৃষ্টি হচ্ছিলো। বিয়ের শেষ দিকে কৃষ্ণপদ বাবু অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন তাকে বাবাই-ই হাসপাতালে ভর্তি করে এল। 
এদিকে ঠাকুরমশাই না থাকাতে নির্মলেন্দু বাবু ঠাকুর পুজো বন্ধ রাখলেন। দরজায় তালা দিয়ে রেখে দিলেন দিনের পর দিন। এখন মূল চাবি তার কাছে থাকলেও ডুপ্লিকেট রইলো বাবাইয়ের কাছে। মূর্তি চুরি করায় আর বাধা রইল না। কোনো এক সময়ে সবার অলক্ষ্যে মূর্তি চুরি সম্পন্ন হ’ল।”সনাতন তার বক্তব্য শেষ করলো।
রমেন, “তাহলে তো কল্যাণী থানায় সবকিছু জানানো উচিত! আমি শশুর মশাইকে ফোন করে এখুনি সবকিছু জানাচ্ছি।”রাত তখন দশটা বেজে কুড়ি মিনিট। রমেনের ফোন পেয়ে নির্মলেন্দু বাবু প্রাথমিক কুশল বিনিময় করলেন, অবাকও হলেন খানিকটা, “তা বাবা, এতো রাতে ফোন করলে!? কোন খারাপ ঘটনা ঘটে নি তো!?”এবার রমেন তাকে আসল খবরটা দিল। 
তিনি মন দিয়ে সবকিছু শুনে শক্ড হলেন। ধাতস্থ হতে সময় নিলেন, তারপর মন্তব্য করলেন, “কিন্তু এতে তো এটা প্রমাণিত হ’ল না যে, মূর্তি চুরিও ওরাই করেছে।”এবার সুলোচন ইশারায় রমেনকে ফোনটা তার হাতে দিতে বলল এবং নিজের পরিচয় দিয়ে জানালো, “আমার বিশ্বাস, এই ঘটনার সাথে আরও এক বা একাধিক ব্যক্তি যুক্ত আছে। পুলিশের উচিত, এই দু’জনকে জেরা করে ঐ এক বা একাধিক ব্যক্তির ঠিকানায় পৌঁছানো। মূর্তিটা হয়তো ওদের কাছেই আছে। ওটা খুঁজে পেয়ে গেলে বাকী সবকিছুই প্রমাণ করা সম্ভব হবে।”
সুলোচনের কথামতো নির্মলেন্দু বাবু কল্যাণী থানায় ফোন করলেন। থানায় তখন ইন্সপেক্টর থমাস ক্ল্যার্ক ছিলেন। সবটা শুনে তিনি সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পালের ফোনে কল দিলেন। নয়ন পাল সবটা শুনে রোমাঞ্চিত হলেন। একজন কনস্টেবলকে সাথে করে বাইকে নির্মলেন্দু বাবুর বাড়িতে পৌঁছে তিনি প্রথমেই বাবাইয়ের খোঁজ করলেন। এতো রাতে ছেলের খোঁজ করাতে উদ্বিগ্ন উদিতা দেবী জানালেন, “ও আজ সকাল থেকেই বাড়ির বাইরে! ফোন করলেও লাগছে না! কী যে হ’ল ছেলেটার!”
পরদিন সকালে কল্যাণী হাসপাতাল থেকে উদিতা দেবীর ফোনে কল এল। ছেলে হাসপাতালে ভর্তি শুনে তিনি তৎক্ষণাৎ হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। নির্মলেন্দু বাবু খবর জানতে পেরে সাব-ইন্সপেক্টর নয়ন পালের ফোনে কল দিলেন। হাসপাতালে পৌঁছে কর্তৃপক্ষের কাছে নয়নবাবু জানতে পারলেন, গতকাল সকালে বাবাই উপাধ্যায়ের সঙ্গে অনীল মজুমদার নামে তারই বয়সী একটি ছেলের ভীষণ মারামারি বাঁধে, ফলে দু’জনেই মারাত্মক জখম হয়। শিল্পাঞ্চল বাজারের কাছে দু’জনকে অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন গাড়িতে করে নিয়ে এসে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিয়ে যায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের দু’জনকে মারামারির কারণ জিজ্ঞেস করলে কেউই মুখ খোলে নি।
কল্যাণী থানার পুলিশ খোঁজ নিয়ে জানলো, বাবাই আর অনীল দু’জনেই কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন করছে, বাবাই ভূগোল নিয়ে আর অনীল কেমিস্ট্রি নিয়ে। কিন্তু অনেক জেরা করেও তাদের মারামারির কারণ জানা গেল না। ওদিকে মূর্তি চুরির ব্যাপারে জেরা করে ফল হ’ল না। বাবাই বা সুকুমার কেউই স্বীকার করল না যে, তাদের কেউ মূর্তি চুরির সঙ্গে জড়িত আছে। সুতরাং পুলিশ পড়ে গেল মহাধন্দে।
এই ঘটনা সুলোচনের কানে পৌঁছালে সে চিন্তাভাবনা করে নিজের যুক্তি খাঁড়া করল, “ঘটনা কী ঘটেছিল, তার একটা ধারণা আমি দিতে পারি। নিজের বাবাকে অসুস্থ করার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ বাবাই অনীলের কাছ থেকে পেয়েছিল। অনীলই সম্ভবত তাকে ঐ বিষাক্ত গ্যাস সাপ্লাই করেছিল। কারণ সে নিজে কেমিস্ট্রি নিয়ে গ্রাজুয়েশন করছে। কাজ হয়ে যাবার পর মূর্তি বা সেটা বেচার টাকা সম্ভবতঃ অনীলের কাছেই ছিল। তাই বাবাই বা সুকুমার কারও বাড়িতে সন্দেহজনক কিছু আবিষ্কার করা গেল না; ব্যাংক একাউন্ট চেক করেও কিছু পাওয়া গেল না। মূর্তি বেচার পর টাকার ভাগ নিয়ে বাবাই ও অনীলের মধ্যে বাঁধল তুমুল ঝগড়া, ঝগড়া থেকে মারামারি। এখন পুলিশের উচিত অনীলের বাড়ি, ব্যাংক একাউন্ট ইত্যাদি তল্লাশী করা। তল্লাশী করলেই সত্য সামনে আসবে বলে আমার বিশ্বাস।”
সুলোচনের পরামর্শ-মতো অনীলের বাড়ি তল্লাশী করে কিছু পাওয়া না গেলেও ব্যাংক একাউন্ট চেক করে পুলিশ অসংগতি লক্ষ্য করল। সাম্প্রতিক সময়ে তার একাউন্টে বারো লক্ষ টাকা জমা পড়েছে। তাকে সঙ্গে-সঙ্গে থানায় নিয়ে এসে কঠোরভাবে জেরা করা হ’ল। তীব্র জেরায় সে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করল যে,”হ্যাঁ, গ্যাসীয় বিষের আইডিয়াটা আমিই বাবাইকে দিয়েছিলাম। দিন-রাত খেটে জিনিসটা বানিয়েছিলামও আমি। প্রথম ও দ্বিতীয় উভয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েই নানারকম বিষাক্ত কেমিক্যাল পদার্থের উদ্ভাবন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, বায়ো-ওয়ার বা জৈবযুদ্ধে এক পক্ষ অপর পক্ষকে পরাস্ত করবে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেগুলি ব্যবহৃত হয় নি। এমনই দু’টি মারাত্মক কেমিক্যাল বিষ ছিল- সালফার মাস্টার্ড ও লিউইসাইট, দু’টোই তরল। 
(বিঃদ্রঃ সালফার মাস্টার্ড বিশুদ্ধ অবস্থায় বর্ণহীন, অশুদ্ধ অবস্থায় হলুদাভ থেকে কালচে-বাদামী রঙের হয়। গন্ধে অনেকটা সরষের তেল, রসুন ইত্যাদি মেশানোর পর যেমন গন্ধ হয়, ঠিক তেমন। তাই সালফারের এই যৌগটির নামে ‘মাস্টার্ড’ শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়েছে। বিষটির কার্যকারিতা একটু অদ্ভুত ধরনের; প্রথমে কিছু বোঝাই যায় না। কিন্তু জিনিসটার সংস্পর্শে আসার বারো থেকে ছত্রিশ ঘন্টা পরে গায়ের চামড়ায় চুলকানি ও ফোস্কা পড়ার মতো লক্ষ্মণ দেখা যায়; চোখের সমস্যা ও শ্বাসকষ্টও শুরু হয়। বেশী পরিমাণে সংস্পর্শে এলে ক্যান্সার হওয়াও আশ্চর্য নয়।
সালফার মাস্টার্ডের তীব্র রূপটি হ’ল লিউইসাইট। এটি হ’ল গাঢ় সবুজাভ বাদামী রঙের তরল বিষ। এর গন্ধ অনেকটা ক্রেনবিল বা সারসচঞ্চু ফুলের মতো কড়া সুমিস্ট। এর সংস্পর্শে এলে সালফার মাস্টার্ড তরলের মতোই গায়ের চামড়ায় চুলকানি, ফোস্কা ইত্যাদি দেখতে পাওয়া যায়; চোখ, ফুসফুস ও শ্বাসনালীর ক্ষতি হয়। সেইসাথে আর্সেনিক দুষণের লক্ষ্মণগুলি যেমন পেটে প্রচণ্ড যন্ত্রণা, বমি, রক্ত-পায়খানাসহ ডাইরিয়া ইত্যাদি দেখা যায়। এর কার্যকারিতা সংস্পর্শে আসার পর খুব দ্রুত শুরু হয়।)
আমি দু’টো কেমিক্যাল পদার্থকে মিক্স করে পাতন প্রক্রিয়ায় এমন একটা গ্যাসীয় বিষ তৈরী করলাম, যেটা বর্ণহীন, গন্ধ ঈষৎ মিস্ট-ফুলের মতো, কার্যকারিতা সংস্পর্শে আসার কম করে চার-পাঁচ ঘন্টা পরে শুরু হয়। ক্ষতি সামান্য হলেও হাসপাতালে পৌঁছে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। মূর্তি চুরির দায়িত্ব ছিল বাবাইয়ের উপর। ঠিক ছিল, মূর্তি বেচার পর প্রাপ্ত মূল্যের অর্ধেক-অর্ধেক ভাগ হবে। 
ভাবা হয়েছিল মূর্তির মূল্য হয়তো কোটি টাকা হবে। কিন্তু চুরির পর বেচতে গিয়ে মাত্র বারো লক্ষ টাকা পাওয়া গেল। ধরা পড়ার ভয়ে সমস্ত অর্থ আমার ব্যাংক একাউন্টে জমা করা হয়েছিল। এখন বাবাইয়ের দাবি, ঐ টাকা তিন ভাগ করা হবে। সুকুমার নামে কে একটা ছেলে তার এক ভাগ পাবে। কিন্তু আমি তাতে রাজি হই নি। আমার ভাগের ছয় লাখ টাকা থেকে এক টাকাও আমি ছাড়তে রাজি নই। তা-ই থেকে ঝামেলা ও মারামারি, শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছানো।”
এদিকে বাবাই ও সুকুমার তাদের জেরায় ভেঙে পড়ে স্বীকার করল যে, কৃষ্ণপদ বাবুর উপর বিষপ্রয়োগ ও সোনার গনেশ মূর্তি চুরিতে তারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। বাবাই অনীলের উপর সমস্ত রাগ উগরে দিয়ে বলল, “ও বলেছিল, বাবা সামান্য অসুস্থ হবেন। কিন্তু এখন যা অবস্থা, তাতে তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন কি-না সন্দেহ! চোখও পুরোপুরি ঠিক হবে কি-না কে জানে!? ওনার পিছনেই তো অনেক খরচা হয়ে যাবে আমার! ও আমার সাথে বেইমানী করেছে। তাই আমি ওকে শাসাতে এসেছিলাম। কিন্তু ঝগড়া শুরু হ’ল ও শেষ পর্যন্ত হাতাহাতি হয়ে গেল!”
সুকুমার তার বয়ানে বলল, “বিয়েতে এসেই বাবাইকে সন্দেহজনক বলে মনে হয়েছিল আমার। প্যান্ডেলের জন্যে ফুলের সাজ তৈরী করছিল ও। তখনই ওর অভিসন্ধি টের পাই। আমার মুখ বন্ধ রাখতে আমাকে ও দলে নিয়ে নিল। ঠিক হ’ল, মূর্তি বিক্রি করে যা পাওয়া যাবে, তার তিন ভাগের এক ভাগ আমি পাবো। পরিবর্তে গ্যাস ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্বটা আমাকে নিতে হবে। আমার চোখে চশমা থাকায় প্রাথমিকভাবে চোখ গ্যাসের হাত থেকে রক্ষা পাবে, আবার কেউ সন্দেহও করবে না। পরিকল্পনা-মাফিক কাজ হয়ে যাবার পর পাঁচ দিন থেকেও গেলাম। এমনিতেই কলকাতায় আমার দু’টো পরীক্ষা দেওয়ার ছিল। সেই অজুহাত দেখালাম। কেউ কিছু বুঝতে পারল না। শিউলিদির মামা-মামী বিয়ের পরে তিন দিন থেকে তারপর গেল। পরের দিনই আমরা মূর্তিটা সরালাম। ওরা দু’জন অবশ্য আমাকে সন্দেহ করেছিল; কিন্তু আমি পুলিশকে ওদের বিরুদ্ধে বলে সন্দেহটা ঘুরিয়ে দিলাম।”
তাদের সাক্ষ্যের উপর ভিত্তি করে পুলিশ একজন স্বর্ণ-ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সোনার মূর্তিটি উদ্ধার করল। মূর্তি ফিরে পেয়ে নির্মলেন্দু বাবু ও শর্মিলা দেবী অত্যন্ত খুশী হলেন। বাবাই, অনিল ও সুকুমারের জেল হ’ল। ছেলের কুকীর্তিতে কৃষ্ণপদ বাবু ও উদিতা দেবী অত্যন্ত মর্মাহত হলেন। পাড়ায় মুখ দেখানো তাদের পক্ষে লজ্জাজনক হয়ে উঠল। তাই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে কৃষ্ণপদ বাবু একদিন নির্মলেন্দু বাবুর সাথে দেখা করলেন; ছেলের কুকীর্তির জন্যে মাফ চেয়ে নিলেন। তারপর আসল কথাটা পাড়লেন, “দাদা, আমরা আর কল্যাণীতে থাকতে পারবো না। আমরা আমাদের গ্রামের বাড়িতেই ফিরে যাবো। বাধা দেবেন না।”এরপর একদিন তারা নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে কল্যাণী টাউন ত্যাগ করলেন।
এদিকে সুলোচনের ঘটনা জানাজানি হওয়াতে চারিদিকে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। রামানন্দ বাবু, রমেন, শিউলি, মনোহর বাবু, নির্মলেন্দু বাবু, শর্মিলা দেবী, থমাস ক্ল্যার্ক, নয়ন পাল প্রমুখ সকলেই তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠল। সামান্য একটা বিয়ের ডিভিডি দেখে রহস্যের সমাধান করতে পারা কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়!
রামানন্দ বাবুর বাড়িতে একদিন চায়ের আড্ডাটা বসেছে। তিনি নিজে, শিউলি, রমেন, সুলোচন, মনোহর বাবু সকলে উপস্থিত আছে।রামানন্দ বাবু বললেন, “কনগ্রাজুলেশন, ইয়াং ম্যান। আমি জানতুম, পারলে তোমার মতো বুদ্ধিমান ছেলেই পারবে। আমারটার মতো গোবরে মাথাওয়ালা নয়।”শিউলি তার স্বামীর পক্ষ নিয়ে বলল, “আমার স্বামীর সম্বন্ধে এমনটা বললেন না, বাবা! গোবরে মাথা হ’লে ও থানার সাব-ইন্সপেক্টর হতে পারতো না! দেখবেন, ঠিক ও একদিন ইন্সপেক্টর হয়ে যাবে।”নিজের সুখ্যাতি(?) শুনে রমেন গোমড়া মুখ করে বসেছিল। স্ত্রীর মন্তব্যে তার মুখে এখন খুশিখুশি ভাব ফুটে উঠল।মনোহর বাবু মন্তব্য করলেন, “আমি বলি কি, সুলোচন বরঞ্চ রমেনের পরামর্শদাতা হয়ে যাক। তাতে রমেনেরও লাভ হবে। আবার সুলোচনও বুদ্ধিচর্চার সুযোগ পাবে। কী বলেন, রামদা!”সবাই তার কথা মেনে নিল।সুলোচন (হাসিহাসি মুখ করে), “আমার আপত্তি নেই।”
সেই থেকে রমেন ঘোষাল সুলোচন গায়েনকে নিজের পরামর্শদাতা হিসেবে ভাবতে শুরু করল। কোন জটিল কেস এলেই সে সুলোচনের পরামর্শ নিতে লাগল। তাতে ফলও হ’ল; টিটাগড় থানার সাব-ইন্সপেক্টর থেকে খুব তাড়াতাড়ি ইন্সপেক্টর হয়ে গেল সে।

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 0 Average: 0]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত