পিঙ্ক বল টেস্ট: একটি পর্যালোচনা

প্রোজ্জ্বল বন্দোপাধ্যায়
5 রেটিং
446 পাঠক

গত দুটি সপ্তাহ ধরেই কলকাতার রং ছিল গোলাপী। আজ্ঞে হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। এই কদিনে বাবুঘাটের লঞ্চ থেকে শুরু করে লেকটাউনের ক্লক টাওয়ার, সবাই কেই গোলাপী আবরণে আবৃত করা হয় কিনা! উপলক্ষ্য সম্পর্কে সকলেই অবগত, ২২ শে নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া ইডেন গার্ডেন্সে ভারত এবং বাংলাদেশ দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ ছিল ভারতীয় ক্রিকেট দলের প্রথম পিঙ্ক বল ম্যাচ। উৎসাহের পারদ তাই থার্মোমিটার ফুঁড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড় হয়েছিল। তো, কেমন ছিল সেই সময়টা? ক্রিকেট নামক সনাতনী খেলায় কি কোনও বৈপ্লবিক বদল এলো, নাকি গোলাপী বলেও লাল বলের ক্রিকেটের মিষ্টতা অক্ষুন্ন রইল? চলুন আলোচনা করা যাক। 

         পিঙ্ক বল টেস্টের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল স্বয়ং গোলাপি বল। তো কেমন ছিল সেই গোলাপী বলে ব্যবহার? কতটাই বা বেয়াড়া আচরণ করল সে? সত্যি বলতে কি, ইডেনের ম্যাচের পর সেই ধন্দ বেড়েছে বই কমেনি। রাতের আলোয় ধুন্ধুমার ব্যাটিং উপহার দিয়ে বিরাট কোহলি যেখানে শতরান হাঁকিয়ে বসে আছেন, অজিঙ্ক রাহানে ব্যতীত বাকি ব্যাটসম্যানেরা এই বলকে বাগে আনতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। সবথেকে করুন অবস্থা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। লিটন দাস ও মহম্মদ সইফ তো বলের ঘায়ে মূর্ছা গিয়ে হাসপাতালে গমন করলেনই, যাঁরা অক্ষত রইলেন তাঁদের অবস্থাও তথৈবচ। প্রথম ইনিংসে ১০৬ রানে মুড়িয়ে গিয়ে বাংলাদেশীরা চতুর্থ ও পঞ্চম দিনের টিকিট কাটা দর্শকদের গালিও খেয়েছেন বিস্তর। তাতে অবশ্য তাঁদের করুন অবস্থার কোনও উন্নতি হয়নি। দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লা কিছুটা লড়াই করলেও সেটা চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে জাতীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে। যদিও বিরাট ও রাহানেকে বাদ দিয়ে বাকি ভারতীয় ব্যাটসম্যানদেরও অবস্থা খুব ভাল বলা যাবে না। অর্থাৎ, গোলাপী বল ব্যাটসম্যানদের দুঃস্বপ্ন হিসেবে হাজির হয়। প্রসঙ্গত, অস্ট্রেলিয়া সহ ক্রিকেট বিশ্বে গোলাপী বলের একচ্ছত্র জোগানদার কোকাবুরা কোম্পানি। সেখানে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিসিসিআই দেশীয় এসজি বলের উপরেই আস্থা রেখেছিল। এসজি বল পরীক্ষায় উৎরে গেলেও খুব ভাল যে নম্বর পেয়েছে তা কিন্তু বলা যাবে না। বলের ঔজ্জ্বল্য ধরে রাখতে লাল বলের দ্বিগুণ ল্যাকার ব্যবহৃত হয় গোলাপী বলে, তার জন্য বলের পালিশ অনেক বেশি সময় ধরে থাকে। ফলে হাতে স্বর্গ পেয়ে গিয়েছিলেন নতুন বলের জোরে বোলাররা, ইচ্ছেমত সুইং করিয়েছেন। তবে, ভারতীয় দলের কোচ রবি শাস্ত্রী মনে করেন, এসজী গোলাপী বলে একবার পালিশ চলে গেলে বল কালো হতে শুরু করে, তখন তার দৃশ্যমানতা কমে যায়। বিরল প্রতিভা নিয়ে জন্মানো ভারত অধিনায়ক সেই বলেই দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করে ফেলা সত্ত্বেও খাবি খেতে খেতে ড্রেসিংরুমে ফেরার পথ ধরেছেন একাধিক ব্যাটসম্যান। বাংলাদেশ শিবির মৃদু অনুযোগ ও করেছে যে, বলের জন্যই এত আঘাত। বলটির সিম অনেক চওড়া হওয়ায় পিচে সিম হিট করলে বল হঠাৎ হঠাৎ লাফিয়ে ও উঠেছে। সবমিলিয়ে, গোলাপী বলে পেসারদের পৌষমাস তো ব্যাটসম্যানদের সর্বনাশ। 

      এ তো গেল বলের কথা। সাদা পোশাকে রাতের আলোয় খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? ম্যাচ পরবর্তী সাংবাদিক সম্মেলনে  এই প্রসঙ্গে এক অদ্ভুত কথা বলেছেন বিরাট কোহলি। তাঁর বক্তব্য, টেস্টের প্রথম দুই ঘণ্টা ব্যাট করা কঠিন, এই সাবেকি ধারণা গোলাপী বলের ক্ষেত্রে কার্যকরী নয়। এই টেস্ট শুরু হয় দুপুর একটায়, তখন সুইং আদৌ কার্যকরী নয়। যখন দিনের শেষ হয়ে রাত নামতে শুরু করে, অর্থাৎ গোধূলি লগ্নে এই বল অসংলগ্ন আচরণ শুরু করে। আচমকাই সুইং এর পরিমাণ বেড়ে যায়। পুরোপুরি সন্ধ্যে হয়ে গেলে শিশিরে ভিজে আবার বলের বিপজ্জনক আচরণ কমে যায়। বিরাট এও জানিয়েছেন যে, টেস্টের আগেই তাঁকে এই সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন স্বয়ং সচিন তেন্ডুলকর। সচিনের উপদেশ ছিল যে, লাল বলে যেমন প্রথমদিকে সতর্ক থাকতে হয় ব্যাটসম্যানদের, গোলাপী বলে সেটা হবে গোধূলিলগ্নে। বহু যুদ্ধের পোড় খাওয়া সৈনিক, ক্রিকেটকে গুলে খাওয়া সচিনের অনুমান সঠিক বলে প্রমাণিত করেছেন পেসাররা। সামি ইশান্তরা তো বটেই, বাংলাদেশী বোলাররাও দ্বিতীয় দিনের গোধূলিতে চমৎকার বোলিং করেছিলেন। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এই অভিজ্ঞতা মাথায় রাখবেন বিরাট ও তাঁর দলবল। যদিও বিরাট এবং ভারতীয় ক্রিকেট দলের বাঙালি উইকেটকিপার ঋদ্ধিমান সাহা মনে করেন, রাতের আলোয় গোলাপী বলে ব্যাট করার থেকেও দুরূহ কাজ হল ফিল্ডিং করা। সত্যিই, রাতের ইডেনের সবুজ গালিচায় গোলাপী সুন্দরীকে খুঁজে পেতে কালঘাম ছুটেছে ফিল্ডারদের, পড়েছে ক্যাচ ও। অবশ্য, ছোট থেকে ইডেনে খেলার অভিজ্ঞতা থাকা ঋদ্ধি মনে করেন, নভেম্বরের ইডেনে সন্ধ্যেবেলা একটি হালকা কুয়াশার আস্তরণ ও থাকে, যার জন্য অনেক সময় বলের দৃশ্যমানতা প্রাকৃতিক কারণেই কমে যায়। সবমিলিয়ে টেস্ট মাত্র দুই দিন বাহান্ন মিনিট খেলা হওয়ার পিছনে হেমন্তের কলকাতার আবহাওয়া ও কম দায়ী নয়।

       টেকনিক্যাল কচকচানি বাদে এই টেস্টে আলোচনার এক বড় জায়গা ছিল আয়োজন। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের বিসিসিআই ও সিএবি একেবারে ফুল মার্কস সহ পাশ। শহরজুড়ে গোলাপী আবেগ তৈরি করা থেকে মাঠের সাজসজ্জা, মাঠের অনুষ্ঠান, সর্বত্রই গৃহকর্তা সৌরভের কড়া নজর ছিল, এবং বলতেই হচ্ছে তিনি সফল। বহু দূর থেকে, গঙ্গার অপর পাড় থেকেও ইডেনের আকাশের গোলাপী বেলুনটি পরিষ্কার দেখা গেছে। ইডেনের পুরাতন রঞ্জি স্কোরবোর্ড টিকে সাদা ও গোলাপী রঙে রাঙিয়ে তার রূপ খুলে দিয়েছেন সৌরভের দলবল। আর দর্শকের কথা আর কিই বা বলা যায়? সাংবাদিক সম্মেলনে বিরাট বলেন, ” মাঠে ব্যাট যখন করতে নামছিলাম তখন পুরোপুরিই সন্ধ্যে হয়ে গেছে। রাতের আলো, মাঠ ভর্তি দর্শকের চিৎকার, বুঝতেই পারছিলাম না আইপিএল খেলতে নামছি কিনা! মাঠ ভরা দর্শকের সামনে খেলা যেকোনও ক্রিকেটারের কাছে অনুপ্রেরণার কাজ করে।” টানা পাঁচদিন ধরে বড় পরীক্ষা ছিল ইডেনের বাতিস্তম্ভ গুলিরও। প্রাকটিস নেট মাঠের এককোনে হওয়ায় আলোর সমস্যা একটু ছিল ঠিকই, কিন্তু ম্যাচের বাইশ গজে কোনও সমস্যাই হয়নি।  ইডেনের প্রতি ব্লকে গোলাপী স্বেচ্ছাসেবক উপস্থিত ছিলেন, দর্শক এবং সাংবাদিকদের বিশেষ পুস্তিকা ও বিনামূল্যে উপহার দিয়েছে সিএবি। করেছে চমৎকার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন। এসেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অনেকেই। ২০০০ সালের বাংলাদেশের টেস্ট অভিষেক ম্যাচের ১১ সদস্যকেই ইডেনে হাজির করে সংবর্ধনা দেওয়া হল, যা দেখে অভিভূত সকলেই। খোদ বাংলাদেশী সাংবাদিকরাই বলেছেন যে, বাংলাদেশ ক্রিকেটকে এত সম্মান এর আগে কোথাও দেওয়া হয় নি। ভারতের প্রথম পিঙ্ক বল টেস্ট ম্যাচ সাফল্যের সাথে আয়োজন করে ইতিহাসে নাম তুলে ফেলল কলকাতার গর্ব ইডেন গার্ডেন্স। সেইসঙ্গে আরো একবার গর্বিত হলাম আমরা। 

চিত্র সৌজন্য : গুগল

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 1 Average: 5]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত