নাটক ‘তুঘলক:- ইতিহাসের এক আধুনিক দলিল

প্রোজ্জ্বল বন্দোপাধ্যায়
3.3 রেটিং
7130 পাঠক

নাটক:- তুঘলক।

নাট্যকার:- গিরিশ কারনাড।

নির্দেশনা:- দেবেশ চট্টোপাধ্যায়।

নামভূমিকা:- রজতাভ দত্ত।

প্রযোজনা:- সংসৃতি।

 

          গিরিশ কারনাড স্বয়ং বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন এটা ভেবে  যে, ষাটের দশকে রচিত তাঁর ‘তুঘলক’ কিভাবে অর্ধ শতাব্দী পরেও জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে! কারনাড নিজেই এর একটি সম্ভাব্য কারণ ও খুঁজে  পেয়েছিলেন – তা হল বর্তমান প্রেক্ষাপটে নাটকটির প্রাসঙ্গিকতা। নাটকটি কলকাতার মঞ্চে পুনরায় হাজির করানোর পিছনে দেবেশ চট্টোপাধ্যায় তথা থিয়েটার সংসৃতির ভাবনাও কি একই রকম ছিল? সম্ভবত হ্যাঁ। এবং কিছু ছোটখাট পরিবর্তন সহ প্রায় একবছর পরে ‘তুঘলক’ এর প্রত্যাবর্তন ও সম্ভবত সেই তাগিদেই।

           সংসৃতি প্রযোজিত দেবেশ পরিচালিত এই নাটকটি একটি দীর্ঘ ভাবনার ফসল। যে ভাবনার পরিচয় পাওয়া শুরু হয় পর্দা ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই। মঞ্চে একাকী মহম্মদ বিন তুঘলক, নির্নিমেষ দৃষ্টিতে যিনি তাকিয়ে থাকেন সম্মুখে। না, নিকটবর্তী দৃশ্যাবলীতে যে দৃষ্টির কোন আগ্রহ নেই, বহু দূরে আলো ফেলতে চায় সেই দৃষ্টি। এই বাঙ্ময় অথচ নীরব দৃশ্যের মাধ্যমেই নাটকের ‘tone setting’ এর কাজটি অনায়াস দক্ষতায় সেরে ফেলেন দেবেশ ও রজতাভ। এই সুলতান এক ‘larger than life’ চরিত্র, আবার অদ্ভুত মানবিক। ঐতিহাসিক ভিনসেন্ট স্মিথের সেই অমর মন্তব্য ,’’ সুলতান যুগের চেয়ে অগ্রণী ছিলেন’’ যেন পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে এই অনবদ্য সূচনার মধ্যে দিয়েই – যেখানে কাছে নয়, বহু দূরের যাত্রী সুলতানের ঐ দৃষ্টি, যেন পড়ে ফেলতে চায় সুদূর ভবিষ্যত। নাটক যত এগোয়, সুলতানের উদারপন্থী শাসন কায়েমের আন্তরিক প্রচেষ্টা, তা গ্রহণে জনগণের মানসিক পরিপক্কতার অভাব, ধাক্কা খেয়ে খেয়ে সুলতানের অনমনীয় নিষ্ঠুর ‘পাগলা রাজা’ তে পরিণত হওয়া  সব হাজির হয়েছে সমানতালে। শেষ দৃশ্যে প্রথম দৃশ্যের মতই একাকী নিঃসঙ্গ সুলতান। কিন্তু দু চোখ ভরা স্বপ্নের স্থান নিয়েছে ক্লান্তি – সমাজকে নিজেকে বোঝাতে না পারার ক্লান্তি, চোখের সামনে নিজের আদর্শকে ধর্ষিতা হতে দেখার ক্লান্তি, এক সৎ মানুষের সততার বিনাশের ক্লান্তি।

                        ব্রেখটের দর্শন মেনেই ইতিহাস ও সমকালীন জগতের মেলবন্ধন ঘটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন দেবেশ চট্টোপাধ্যায় এবং বলাই বাহুল্য বহুলাংশে সফল ও হয়েছেন। তা বলে কারনাডের মূল নাটকের সাথে কোন অংশে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি। সময়ে সময়ে  আমরা যেন রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ র সেই একাকী রাজার ছাপ দেখতে পাই তুঘলকের মধ্যে। মানবিক অথচ নিষ্ঠুর, সংবেদনশীল অথচ অত্যাচারী, গণতান্ত্রিক অথচ স্বৈরাচারী এই সুলতানের চরিত্র ঠিকভাবে মঞ্চে পরিবেশন করা এক চ্যালেঞ্জ, যা গ্রহণ করে  লেটার মার্কস সহ উত্তীর্ণ দেবেশ। আলোর ব্যবহার এই নাটকের এক বড় সম্পদ। কেবলমাত্র যে ইসলামী সংস্কৃতির স্বাদ দিতে সবুজ আলোর আধিক্য ছিল তা নয়, বরং আলো আঁধারের মাধ্যমে কাহিনীর মোড় ঘোরানোর দেবেশীয় কায়দা মন ভরিয়ে দেয়। আরবী রীতির সঙ্গীত নাটকের মূল ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলে। সম্রাটের নিঃসঙ্গতা ফুটিয়ে তোলে বিষণ্ণ এই সঙ্গীত। মঞ্চসজ্জা ও অনবদ্য। ইসলামী ধাঁচে জাফরির কাজ যেমন আছে, তেমনি নাটকটি এগোনোর সাথে সাথে সুলতানের ব্যক্তিগত চরিত্র এবং তাঁর সাম্রাজ্যের ক্রমাবনতির চিহ্ন ফুটে ওঠে ক্রমপরিবর্তনশীল মঞ্চসজ্জার সঙ্গে সঙ্গে । কিছু কিছু দৃশ্য  দর্শকের হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে তোলে। সুলতানের হাতে শিহাবউদ্দিনের হত্যা, বিরতির ঠিক পরেই দেবগিরির দুর্গপ্রাকারে তরুণ প্রহরীর সাথে সুলতানের দার্শনিক আলাপচারিতা, সৎমা কর্তৃক নাজিবকে খুনের স্বীকারোক্তি সহ নানা মণিমাণিক্য ছড়ানো সম্পূর্ণ নাটকটি জুড়ে যা দর্শককে স্তব্ধ করে রাখে।

                                     এই নাটকের আসল সম্পদ অভিনয় এবং বলতেই হচ্ছে জীবনের সেরা অভিনয়টা হয়ত এই নাটকেই করে গেলেন রজতাভ দত্ত। নিষ্ঠুর অথচ সৎ, বিষন্ন অথচ ক্রূর, পন্ডিত অথচ ব্যর্থ প্রশাসক- এতরকম আঙ্গিক একটিই চরিত্রের মধ্যে -এরকম সাধারণত চোখে পড়ে না। রজতাভের কৃতিত্ব এখানেই যে, এত কঠিন একটি চরিত্র পেয়ে ও নিজের অভিনয়শৈলী থেকে একচুল ও সরেননি তিনি। প্রথম হিংসার দৃশ্যে অর্থাৎ শিহাবউদ্দিনের হত্যাদৃশ্যে  যেভাবে তাঁর মুখে নিষ্ঠুরতা এবং বিষন্নতা খেলা করে তা অভাবনীয়। সময়ে সময়ে সুলতান তুঘলকের হতাশাজনিত যন্ত্রণাকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন টলিউডের রনিদা। বিরতির পর ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত, শাসনতন্ত্রের রাশ হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া এক ব্যর্থ প্রশাসকের চরিত্রে তাঁর অভিনয় মনে করিয়ে দেয় শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথকে। সৎমা কে হত্যার আদেশ দেওয়ার দৃশ্যে যেভাবে অসহায়ত্ব, পাশবিকতা, যন্ত্রণার মেলবন্ধন ঘটান রজতাভ তাঁর অভিনয়ে, যে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকা ছাড়া দর্শকের আর কিছু করার থাকে না। বাংলা বাণিজ্যিক ছবির একচ্ছত্র ভিলেন রজতাভের ছাপ যে কখনো কখনো সুলতান  মহম্মদ বিন তুঘলকের চরিত্রে পড়েনি তা নয়, তবে তা নেহাতই নগন্য। অন্য অভিনেতাদের মধ্যে সৎ অথচ গোঁড়া ঐতিহাসিক বরণীর চরিত্রে অনবদ্য কাজ করেছেন অমিয় হালদার। কখনও কখনও তুঘলকের সাথে পাল্লা দিয়ে চোখে পড়ে বরণীর চরিত্রটি এবং তার কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন অমিয়। সৎমা চরিত্রে নজর কাড়েন কস্তুরী চট্টোপাধ্যায়। তাঁর মধ্যে স্নেহভাজন মা এবং ক্রূর রাজনীতিবিদ – দুই সত্তার সঙ্গম লক্ষ্য করা যায়। ছোট চরিত্রে ভালো লাগে শিহাবউদ্দিনের চরিত্রে অরিন্দোল বাগচী কেও। গিরিশ কারনাড অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে সাবপ্লটটি সৃষ্টি করেছিলেন এবং এই সাবপ্লটটি পরিপূর্ণতা লাভ করেছে আজিজের চরিত্রে গম্ভীরা ভট্টাচার্যের অনবদ্য অভিনয়ের দ্বারা।

                               হল থেকে বেরিয়ে ও ‘তুঘলক’ এর রেশ বহুক্ষণ থেকে যায় মনের মধ্যে। পরিচালক এবং অভিনেতাদের কঠোর পরিশ্রমের এখানেই সার্থকতা।

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 6 Average: 3.3]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত