পাঠকদের পছন্দ

চৈতন্যের দিশারী কল্পতরু

বন্দনা দাস
0 রেটিং
181 পাঠক

বছর দুয়েক আগের কথা।কল্পতরু বা কল্পতরু উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত জানবার আগ্রহে চলে গেলাম কাশীপুর উদ্যান বাটি। প্রধান ফটক পেরিয়ে পৌছালাম মন্দির প্রাঙ্গনে ।সাক্ষাৎ হয় বাগিশা নন্দ মহারাজের।প্রণাম সেরে নিজের মনের ইচ্ছে প্রকাশ করতেই মহারাজ সম্মতি জানালেন।

প্রথমেই তিনি আমায় প্রশ্ন  রাখলেন ” কল্পতরু কি সে সম্পর্কে আমার ধারণা কি”

ওনার কথায়, আমি মহারাজ কে জানালাম,”মহারাজ আমি এসেছি সেই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে”

মহারাজ খুব ধির লয়ে আমায় বলতে লাগলেন”কল্পতরু হচ্ছে এক আশ্চর্য বৃক্ষ যাকে ছুঁয়ে তুমি যাই কামনা কর তা পুরণ হয়।অর্থাৎ মন বানঞ্ছা পুরণ কারী দেবতরু।

পুরানে বর্নিত আছে সমুদ্র মন্থন কালে দেবতা ও অসুরেরা অমৃতসর সন্ধানে মন্দর পর্বত কে মন্থনদন্ড হিসেবে ব্যবহার করে তুলে এনেছিলেন নানান  আশ্চর্য জিনিস !সেই মন্থনে উদ্ভাসিত হয়েছিল, লক্ষ্মীদেবী,ঐরাবত হস্তী,উচ্চৈশ্রব অশ্ব,অপ্সরাকুল,কামধেণু,চন্দ্র এবং বিষ বা হলাহল ও অমৃত।সেই মন্থনেই উঠেছিল এক আশ্চর্য বৃক্ষ যার নাম পারিজাত।

কল্পতরু বা কল্পবৃক্ষ,কল্পদ্রুম বা কল্পপাদপ হলো হিন্দু পুরান ,জৈন ধর্ম এবং বৌদ্ধধর্মের একটি বাঞ্ছা পুরণ কারি গাছ।আদি সংস্কৃত সাহিত্যে এর উল্লেখ আছে।

এছাড়া ও আছে নানান গল্পগাঁথা। বিভিন্ন প্রদেশে বহুবছরের পুরানো এমন কল্পতরু বৃক্ষের কথা বলা আছে।

অষ্টম শতকে পবন মন্দির, জাভার ইন্দোনেশিয়ায় দেয়াল  চিত্রে কল্পতরু নামক স্বর্গীয় জীবন বৃক্ষ জীব, কিন্নর ও কিন্নরী,উড়ন্ত অপ্সরা  এবং দেবতার দ্বারা সুরক্ষিত ।

যে সময় কালের কথা বলা হচ্ছে তখন ঠাকুর থাকতেন দক্ষিনেশ্বরে। সেই সময় ঠাকুর ভীষণভাবে অসুস্থ।ততকালীন বড় বড় ডাক্তার রা ওনাকে পরিক্ষা  করে দেখলেন, তাঁরা বললেন,ঠাকুরের হাওয়া বদলের দরকার আছে.

সেইমত ঠাকুর কে আনা হলো প্রথমে শ্যামপুকুরে একটি বাড়িতে।কিন্তু ঠাকুরের সে যায়গা বিশেষ  পছন্দ হয়না।কারন সেখানে যায়গা বড়ই কম।তারপরই ঠাকুর কে নিয়ে আসা হয় কাশীপুর উদ্যান বাটি।আজ যেটা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একটি শাখা কেন্দ্র। ১৮৮৫ সালে ১১ই ডিসেম্বর থেকে ১৮৮৬ সালের ১৬ই আগষ্ট ঠাকুররের প্রয়ান কাল পর্যন্ত এই কাশীপুর উদ্যান বাটিতেই ছিলেন।

সেখানেই ঠাকুরের চিকিৎসা চলতে লাগলো,তাঁর গৃহী সন্ন্যাসী সন্তানরা দিনরাত্রি ঠাকুরের সেবা করতে লাগলো।তাঁর গৃহী ভক্তরা নিয়মিত তাঁর পাশে পাশে থেকে সেবা ও দুর্লভ সান্নিধ্য লাভে ধন্য হতো।

ঠাকুর থাকতেন দোতালার ঘরে। নিচের তলায়  বাগান সংলগ্ন ঘরে থাকতো ত্রিশ জন গৃহী সন্ন্যাসী।যার মধ্যে বিখ্যাত নট নাট্যকার গিরিশ ঘোষ।তিনি ঠাকুরের অবতারত্ব, অনন্যতা,বিরাটত্ব সম্পর্কে বলে বেড়াতেন।

এমনই এক পয়লা জানুয়ারির দিন ঠাকুরের শরীর কিছু টা সুস্থ বোধ করায়,ঠাকুর দোতলার থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে,এসে গিরিশের সামনে দাড়িয়ে ঠাকুর তাকে বললনে”হ্যাঁ গো গিরিশ তুমি যে আমার সম্পর্কে এত কিছু বলে বেড়াও আমাকে তুমি কি বুঝেছো??”

গিরিশ ঘোষ সাথে সাথে নতজানু হয়ে ঠাকুরের পায়ের কাছে বসে পড়ে ,অদ্ভুত গদগদ কন্ঠে বলতে লাগলেন “ঠাকুর স্বয়ং ব্যাস বাল্মীকি যার ইয়ত্তা করতে পারেন নি আমি তার কি বলবো আমি বিশ্বাস করি ঠাকুর তুমি মানব কল্যাণের জন্য মর্ত্যে অবতীর্ণ ঈশ্বরের অবতার”অমনি ঠাকুর ভাব সমাধি হন।তার প্রত্যুত্তরে ঠাকুর বলেন”তোমাদের চৈতন্য হোক”

সেখানে আর যারা ভক্ত ছিলেন দৌড়ে এসে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ওরে তোরা কে কোথায় আছিস দৌড়ে আয় ঠাকুর আজ কল্পতরু হয়েছেন।

ঠাকুরের অন্যতম শিষ্য ডাক্তার রামচন্দ্র দত্ত ঠাকুরের এই ভাব সমাধিস্থ রুপকে পুরাণে বর্নিত কল্পতরু আখ্যা দেন। সেদিন গৃহি শিষ্য রা ঠাকুরকে স্পর্শ করে, সব ভক্তরাই  প্রত্যেকেরই এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক অনুভূতি হয়েছিল।সেইদিনটিকে কল্পতরু দিবস নাম দেওয়া হয়,পরবর্তীকালে কল্পতরু উৎসবে পরিনত হয়েছিল।উল্লেখ আছে সেই মুহুর্তের সাক্ষী ছিলো কেবলমাত্র গৃহি শিষ্যরা,সন্ন্যাসী শিষ্যরা সেদিন তার কাছে ছিলেন না।শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব সেদিন সকল কে অভয়দান করেন, ঠাকুর বলেছিলেন,”তোমাদের চৈতন্য হোক” “অর্থ নয়,যশ নয়,প্রতিপত্তি নয়,নাম নয় ঠাকুর সেদিন কল্পতরু হয়েছিলেন অন্তরস্থিত চেতনার উন্মীলনের জন্য।

কল্পতরু কল্পনারই গাছ.শুধু চাইতে জানতে হয়।মানব জীবনে আকাঙ্ক্ষার তো শেষ হয় না তা সম্পুর্ন পরিপূর্ণতা ও পায় না।ঠাকুর নিজে এমন রুপে প্রকাশ হয়ে সেই চেতনা কেই জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন।যেখানে চাইতে হবে সেই সত্যের সন্ধান যা চিরকালীন যা অনন্তস্পর্শী।

এই কল্পতরু উৎসবের লক্ষ্য একটাই ,আজ সমাজ সংসারে চৈতন্যের বড় অভাব ,আর এই চৈতন্যের খুব প্রয়োজন। সমস্ত সম্পদ থাকা সত্যেও আমরা ছুটে চলেছি এক অসীম অভাবের দিকে।

তাই এই দেবপুরুষ যুগাবতার সুস্থ সমাজের জন্য জানান দিয়ে গেলেন অন্তর থেকে ঈশ্বর সাধনা করলে ঈশ্বর তার মন বাঞ্ছা পুরণ করে. চাওয়া তোমার , কি চাইবে. কল্পতরু পূর্ণ  করবেই.

রামকৃষ্ণ শরণ্যাং শরণ্যে🙏

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 0 Average: 0]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত