👣 #শারদ_প্রতিবেদন_৩ 👣

অর্পণ (শঙ্খচিল) ভট্টাচার্য্য
5 রেটিং
935 পাঠক
রেটিং দিন
[মোট : 1 , গড়ে : 5]

পাঠকদের পছন্দ

বিগত পর্বের লিঙ্ক:-

www.saabdik.com/sarod-protibedon-porbo-1

www.saabdik.com/sarod-protibedon-2


বাঙালী তথা বিশ্বের সব থেকে বড় উৎসব শারদীয়া নিয়ে নানা জানা অজানা তথ্য তুলে ধরা শুরু হয়েছে অনেক আগে থেকেই..আপনাদের ভালোলাগার এই পর্ব চলতে থাকবে..পড়ুন এবং পড়ান
অনার্য সভ্যতায় প্রাধান্য ছিল দেবীদের। তারা পূজিত হতেন আদ্যাশক্তির প্রতীক রূপে। মাতৃতন্ত্রের পরিবারের গঠন ও উর্বর শক্তির সমন্বয়ের কথা বিবেচনায় এনে অনার্য সমাজে গড়ে উঠে মাতৃ প্রধান দেবী সংস্কৃতির ধারনা। ভারতে অবশ্য মাতৃরূপে দেবী ধারনা নতুন কিছু নয় ২২,০০০ বছর পূর্ব ভারতে প্যালিওলিথিক জন গোষ্ঠি থেকেই দেবী পূজা প্রচলিত হওয়ার প্রমাণ মিলেছে ইতিহাসে। সিন্ধু সভ্যতায় এসে তা আরো গ্রহণযোগ্য, আধুনিক ও বিস্তৃত হয়। মাতৃপ্রধান পরিবারের আর্দশকে সামনে রেখে দেবী বিশ্বাসে গড়ে উঠে শাক্ত সম্প্রদায়। এই মত অনুসারে দেবী হলেন শক্তির রূপ, তিনি পরব্রহ্ম।শাক্ত মতে কালী বিশ্বসৃষ্টির আদি কারণ। অনান্য দেব দেবী মানুষের মঙ্গলার্থে তাঁর বিভিন্ন রূপে প্রকাশ মাত্র।

প্রধান শাক্ত ধর্মগ্রন্থ দেবীভাগবত পুরাণে দেবীই সকল শক্তির উৎস। তিনিই সব। এখানে দেবী স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন:
“আমিই প্রত্যক্ষ দৈবসত্ত্বা, অপ্রত্যক্ষ দৈবসত্ত্বা, এবং তুরীয় দৈবসত্ত্বা। আমি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব; আবার আমিই সরস্বতী, লক্ষ্মী ও পার্বতী। আমি সূর্য, আমি নক্ষত্ররাজি, আবার আমিই চন্দ্র। আমিই সকল পশু ও পাখি। আবার আমি জাতিহীন, এমনকি তস্করও। আমি ভয়াল কর্মকারী হীন ব্যক্তি; আবার আমিই মহৎ কার্যকারী মহামানব। আমি নারী, আমি পুরুষ, আমিই জড়।

শাক্তরা ব্রহ্মের শক্তিরূপে দেবীর পূজা করেন। এ সব দেবীর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হল- চন্ডি বা কালী। তবে পুরুষতন্ত্রে বিশ্বাসী আর্যদের আগমনের পর অনার্য এই সব দেবীদের একক প্রভাব আস্তে আস্তে কমে গিয়ে আর্য পুরুষ দেবতাদের সাথে সমন্বিত হয়ে পাশাপাশি অবস্থান নেয় এইসব দেবী। তাই শাক্তমতে ব্রহ্মের পুরুষ রূপটি দেখা যায় শিবের।

শাক্তধর্মের মূলতত্ত্ব অনুসারে- “শক্তির সহিত মিলিত হইলে শিব সৃষ্টিক্ষম হন; না হইলে তাঁহার আলোড়ন তুলিবার ক্ষমতা পর্যন্ত নাই।”

শাক্তদের এই দেবী শক্তির একক নেতৃত্ত্ব পুরুষ তান্ত্রিক শৈব সম্প্রদায় পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব হয়নি কখনো। তাই শৈব ও শাক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রথম দিকে আপন আপন বিশ্বাসে অটল থাকায় ছিল প্রচন্ড বিরোধ। পরে একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে অর্থাৎ সমন্বয়ে এসে স্থির হতে সময় লেগে যায় বেশ কিছু দিন।
শিবের সাথে সম্পর্ক সমন্বয় করে কেউ হয়েছেন শিবের স্ত্রী, কেউ বা কন্যা, আবার কারো স্থান হয়েছে পুত্রবধূ রূপে।

শাক্তদের কাছে প্রধান দেবী হলেন কালী। তাঁর গায়ের রং মিশ কালো চিত্রিত করার পেছনে অনার্য দেবী হওয়াকে দায়ী করেন ইতিহাসবিদেরা। কারণ অনার্যদের দেহের রং ছিল কালো। বাংলায় কালীর বিভিন্ন রূপের কথা বলা আছে। যেমন – দক্ষিণাকালী, শ্মশানকালী, ভদ্রকালী, রক্ষাকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, চামুণ্ডা ইত্যাদি। কালী সাধকদের মধ্যে রামকৃষ্ণ পরমহংস, রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য, রাজা রামকৃষ্ণ বেশ খ্যাতি লাভ করেছেন বাঙ্গালী হিন্দু সমাজে। কিছুকাল আগেও কালী প্রভাবের অবস্থান এতটাই শক্তিশালী ছিল ভিন্নধর্মী হয়েও কাজী নজরুল ইসলামের উপর পড়েছিল তার রেশ যা আমরা দেখি তাঁর লেখা শ্যামাসংগীতে। তাঁর অনেক কবিতাতে পড়েছে কালী প্রভাবের ছাপ।

বাংলায় কখন থেকে শক্তির আদি বলে খ্যাত কালী পূজার প্রচলন শুরু হয় সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না ইতিহাসে। খ্রিষ্টীয় ৭ম শতাব্দী হতে বাংলায় কিছু কিছু অঞ্চলে কালী পূজার প্রমাণ মিলে। নবদ্বীপের তান্ত্রিক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশকে বাংলায় কালীমূর্তি ও কালীপূজার প্রবর্তক মনে করা হয় ।

মহাভারতে কাল রাত্রি বা কালী নামে এক দেবীর কথা আছে যিনি মৃত যোদ্ধা ও পশুদের আত্মাকে বহন করেছিলেন।

এই রকম আরেক শক্তিশালী দেবী ছিলেন মনসা। মনসা পূজা ছিল কিছুটা প্রাচীণ। দূর্গার আগে থেকেই নিম্ন বর্ণের আদিবাসী হিন্দুরা মনষা পূজার চর্চা করত। নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের এই সব পূজিত দেবী উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের কাছে কখনো পূজার গুরুত্ব লাভ করেনি। ফলে মনষা দীর্ঘ দিন উচ্চ বর্ণর কাছে থাকেন নিপ্রভ। খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দী থেকে মনসাকে শিবের কন্যারূপে কল্পনা করে তাঁকে শৈবধর্মের অন্তর্ভুক্ত করে নিলে মনসার গুরুত্ব কিছুটা বেড়ে যায়। এর আগে পুরাণ অনুসারে মনসা পূজিত হতেন সর্প পিতা কস্যপ কন্যা রূপে। শিব কন্যা বিবেচিত হওয়ার পর উচ্চ বর্ণের কাছে মনসা কিছুটা মর্যাদা পান বটে তবে থেকে যান তুলনা মূলক কম আলোচনায়, কম শক্তিধর দেবী হিসাবে। অন্যদিকে চন্ডি, দূর্গা বা কালী শিবের স্ত্রী কল্পিত হওয়ায় সুবাদে লাভ করেন প্রভূত মর্যাদা, বিবেচিত হন অসীম শক্তির অধিকারিণী দেবীর ভুমিকায়।

মহাভারত অনুসারে দূর্গা বিবেচিত হতে থাকেন কালী শক্তির আরেক রূপ হিসাবে। নানা অমিল ও বৈচিত্র থাকা সত্বেও কিভাবে কালী দূর্গার রূপের সাথে মিশে এক হয়ে গেল সে রহস্য আজো অজানা।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে দূর্গা পূজার প্রথম প্রবর্তক কৃষ্ণ, দ্বিতীয় বার দূর্গা পূজা করেন স্বয়ং ব্রহ্মা আর তৃতীয়বার দূ্র্গা পূজার আয়োজন করেন মহাদেব। আবার দেবী ভাগবত পুরান অনুসারে জানতে পারি ব্রহ্মার মানস পুত্র মনু ক্ষীরোধসাগরের তীরে দূর্গার আরাধনা করে বর লাভে সফল হতে, মূল বাল্মীকির রামায়ণে দূর্গা পূজার কোন অস্থিত্ব আমরা দেখতে পাই না। মধ্য যুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তশালী কবি কৃত্তিবাস ওঝা সংস্কৃত রামায়ণ বাংলা করার সময় মূল রামায়ণের বাইরের তৎলালীন সমাজে প্রচলিত অনেক মিথ, গল্প বাংলা রামায়ণে ইচ্ছাকৃত ভাবে ঢুকিয়ে বাংলা রামায়ণ আরো অধিক সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তাঁর এই অনুবাদকৃত রামায়ণ পরিচিত পায় কৃত্তিবাসী রামায়ণ নামে। যা বাংলাভাষী হিন্দু সমাজে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় দ্রুত। সেখানে তিনি কালিকা পুরাণের ঘটনা অনুসরণে ব্রহ্মার পরামর্শে রামের দূর্গা পূজা করার কথা উল্লেখ করেছেন। শক্তিশালী রাবনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিজয় নিশ্চিত করতে প্রাক্ প্রস্তুতি হিসাবে রাম দূর্গা পূজা করে দূর্গার কৃপা লাভ করেন বলে বর্ণনা করেছেন তিনি (রামায়ণ কৃত্তিবাস বিরচিত, হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ও ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখিত ভূমিকা সম্বলিত, সাহিত্য সংসদ, কলকাতা, ১৯৫৭ সংস্করণ), তবে দূর্গা পূজার সব চাইতে বিশদ বর্ননা পাওয়া যায় মার্কন্ডুয়ে পুরানে। যেখানে মহির্ষী জৈমিনি ও মহির্ষী মার্কন্ডুয়ের কথোপকথনের ভিত্তিতে পুরাণটি রচিত হয়। এই পুরাণের মধ্যে তেরটি অধ্যায় দেবীমহাত্ম্যম নামে পরিচিত। বাংলায় শ্রীশ্রী চন্ডি নামে সাতশত শ্লোক বিশিষ্ট দেবী মহাত্ম্যম পাঠ আছে যা দূর্গা পূজার প্রধান ও অবিচ্ছদ্য অংশ হয়ে স্থায়ি হয়ে গেছে পূজার আসরে।

তা যা হোক এগুলো সব পুরাণের কথা। ঘটা করে দূর্গা পূজা চালুর আগে কিছু কিছু উচ্চ বর্ন হিন্দুদের গৃহকোনে ঘরোয়া পরিবেশে চালু ছিল এই পূজা। করা হত অত্যন্ত সাদামাঠা ভাবে। ঘটা করে দূর্গা পূজার ইতিহাস খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। কখন থেকে ঘটা করে এই পূজা চালু হল তা নিয়ে পরিষ্কার বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক কোন প্রমান পাওয়া যায় না। যতটুকু জানা যায় তা হল- কারো মতে ১৫০০ খ্রীষ্টাব্দের শেষের দিকে দিনাজপুরের জমিদার প্রথম দূর্গা পূজা করেন, আবার কারো মতে প্রথম দূর্গা পূজা আয়োজন করেন তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ন। অনেকে মনে করেন ১৬০৬ নদিয়ার ভবনানন্দ মজুমদার দূর্গা পূজার প্রবর্তক। দূর্গার ছেলে মেয়ে সহ সপরিবারে পূজা চালু করেন ১৬১০ সালে কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার। ১৭৯০ সালের দিকে এই পূজার আমেজে আকৃষ্ট হয়ে পশ্চিম বঙ্গের হুগলি জেলার গুপ্তি পাড়াতে বার জন বন্ধু মিলে টাকা পয়সা (চাঁদা) তুলে প্রথম সার্বজনীন ভাবে আয়োজন করে বড় আকারে দূর্গা উৎসব। যা বারোইয়ার বা বারবন্ধুর পূজা নামে ব্যাপক পরিচিতি পায়। কাসীম বাজারের রাজা হরিনাথ ১৮৩২ সালে বারোইয়ারের এই পূজা কলকাতায় পরিচিত করান। পরে তাদের দেখাদেখি আস্তে আস্তে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে উচ্চ বর্নের হিন্দু বাঙ্গালী জমিদারদের কাছে।

ব্যাপক লোকের সমাগম, মেলা, হৈ হুল্লুর, উৎসবের আমেজে ধনী জমিদারেরা কিছু দিনের জন্য ডুবে থাকতেন গরীব প্রজাদের সাথে বিনোদনে যা বাঙ্গালী সমাজে এনে দেয় নতুন মাত্রা। ভক্ত কুলের সহায়তায় হু হু করে বাড়তে থাকে দূর্গার শক্তির মহাত্ম, বাড়ে পূজার সমর্থন। ধনীদের দেখা দেখি এই পূজা দ্রুত জনপ্রিয় হতে শুরু করে দরিদ্র ও নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের কাছে। ভক্তি ও বিনোদনের স্বাদ এক সাথে পাওয়ায় তারাও শুরু করে পূজা উৎসব। প্রথম দিকে নিম্ন বর্ণের এই পূজা উৎসবে ধনী ও উচ্চজাত ব্রাহ্মণদের সাদরে অংশ গ্রহণ করতে বেশ মানসিক সমস্যা দেখা দিলেও এক সময় মেনে নেন।

মানুষের দুঃখ-দূর্দশা, অভাব-অনটন, রোগ-শোক, সামাজিক নানা অনাচার দূরীকরণে পূজা অর্চনা শতভাগ বিফল প্রমাণিত হলেও চলমান জীবনযুদ্ধ ব্যস্ততার ডামাডোলে খানিকটা রেশ টেনে বাঙ্গালী হিন্দু সমাজকে দূর্গা পূজা বইয়ে দেয় কিছুটা স্বস্তির হাওয়া, দেয় আনন্দঘন অনাবিল উৎসবের আমেজ, তৈরী করে ক্ষণস্থায়ী মানব মিলনের অপূর্ব ক্ষেত্র, ব্যস্ততা বাড়ে উচ্চকূল দাবীদার ব্রাহ্মনদের, তরুণ তরুণীরা ঘুরে বেড়ায় রঙ্গিন সাজে, বাঙ্গালী হিন্দু সমাজে আনায়ন করে প্রাণ চাঞ্চল্য। বাঙ্গালী জন গোষ্ঠির সৃষ্ট এই দূর্গা পূজা উৎসবের জোয়ার স্বাভাবিক ভাবে সীমিত থেকে যায় বিশেষ করে বাঙ্গালী হিন্দু জনগোষ্ঠির সংস্কৃতির মাঝেই। বহু দেবতায় বিশ্বাসী ভারতবর্ষের অনান্য অঞ্চলের হিন্দুদের কাছে এ পূজা উৎসব খুব একটা জনপ্রিয়তা লাভ করতে সক্ষম হয়নি আজও।

©️শঙ্খচিল

নিয়মিত চোখ রাখুন শাব্দিকের পেজে,প্রতিটি পূর্ববর্তী পর্বের লিংক পরবর্তী পর্বের সাথে পেয়ে যাবেন..তাই মিস করার কোনো অবকাশ নেই..
চিত্র সৌজন্য : গুগল

আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত

হোম
শ্রেণী
লিখুন
প্রোফাইল