পুড়ে ছাই ৮০০ বছরের ঐতিহ্য

প্রোজ্জ্বল বন্দোপাধ্যায়
4.7 রেটিং
795 পাঠক
রেটিং দিন
[মোট : 3 , গড়ে : 4.7]

পাঠকদের পছন্দ

শুধুই কি একটা অগ্নিকাণ্ড? শুধুই কি একটা ধর্মীয় উপাসনালয়ের পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া? তাই কি? এতই সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায় প্যারিসের নোতর দাম গির্জার অগ্নিকাণ্ড? সম্ভবত না।       নোতর দাম গির্জা প্রকৃতপক্ষে এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার সাথে আমাদের ছেলেবেলা জড়িত। পাঠক, চমকে উঠছেন? ভাবছেন অতিশয়োক্তি কিনা? পশ্চিমবঙ্গে বসে কখনো ইউরোপে পা না দেওয়া সত্ত্বেও কিভাবে দুম করে বলে দেওয়া যায় এসব কথা? বলা যায়, তার কারণ ক্ষতিগ্রস্ত গির্জাটি অন্য কোনও সাধারণ গির্জা নয়, এটি হল নোতর দাম। পাঠক, ফরাসী বিপ্লব কথাটি শুনে প্রথমেই চোখের সামনে কি ভেসে ওঠে? ভেসে ওঠে না একটা ক্লাসরুম? ইতিহাসের ক্লাস? ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা রয়েছে না বিপ্লবের সময়কাল? ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দের এই বিপ্লব পৃথিবী তে এনে দিয়েছিল সাম্য মৈত্রী ও স্বাধীনতার সুধা, দুনিয়া প্রথম পাঠ নিয়েছিল গণতন্ত্রের। তো পাঠক, ভাবছেন কেন হঠাৎ ইতিহাসের কথা? কারণ সেই যে নোতর দাম, ফরাসী বিপ্লবের গর্বিত সাক্ষী। ফ্রান্সের রাজবংশ, যা কিনা বুর্বোঁ বংশ নামে পরিচিত, এই গির্জার প্রতিষ্ঠাতা। এ এক বিশেষ সৌধ। ইউরোপ জুড়ে, ফ্রান্সের ও সর্বত্র গির্জার কি অভাব আছে? নাকি তখনও ছিল? কিন্তু এই গির্জাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ফরাসী সমৃদ্ধির প্রতীক হিসাবে। বিরাট ছিল সেই কর্মযজ্ঞ। ১১৬৩ খ্রিস্টাব্দে রাজা সপ্তম লুই এর হাতে শুরু হয়েছিল এই কর্মকাণ্ড, ১৩৪৫ সালে তার পূর্ণতা ঘটে। দুশো বছর লেগেই ছিল যে সৃষ্টির এই ধরাধামে আসার জন্য, সেই সৃষ্টির মান যে কেমন হবে সেটা বলাই বাহুল্য। গথিক শিল্পের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে ধরা হয় এই অনবদ্য সৃষ্টিকে। বেলজিয়ান গ্লাসের পেন্টিং, পাথরের কাজ, দামী কাঠের সিঁড়ি, বিশাল বিশাল দালান, উপাসনা গৃহ – লুইরা উদার হস্তে অর্থ বিলিয়ে গেছেন এই গির্জার পিছনে।         পাঠক, ফিরে আসা যাক আবার ফরাসী বিপ্লবের অধ্যায়ে। ফরাসী রাজশক্তির প্রতীক এই গির্জার প্রতি বিপ্লবীদের যে বিরূপ দৃষ্টি থাকবে সেটা খুব একটা অস্বাভাবিক আদৌ ছিল না। বিদ্রোহ কালে বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় গির্জাটি। যদিও ফরাসী আবেগের অপর নাম নোতর দামের খুব বেশি ক্ষতি করার সাহস কারোর ই ছিল না। তবে শোনা যায়, গির্জার অভ্যন্তরের কিছু অপরূপ শিল্পকর্মের চিরতরে বিলুপ্তি ঘটে বিদ্রোহী দের হাতেই।          

বামপন্থী ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ রাজ্যে বড়ো হয়ে ওঠা আমাদের। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট কি আমাদের অনেকেরই শৈশবের নায়ক ছিলেন না? সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা কাহিনী ‘নেপোলিয়নের চিঠি’ উপন্যাসে স্বয়ং লালমোহন বাবুই ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে তাঁর ও ছোটবেলার হিরো ছিলেন ‘গ্রেট ম্যান, বোনাপার্ট’। তো এ হেন নেপোলিয়ন ও শপথ নিয়েছিলেন এই নোতর দাম চত্বরেই। নিজেকে বিপ্লবের সন্তান ঘোষণা করা দিগ্বিজয়ী এই বীর ও পারেননি ফরাসী ঐতিহ্য কে অস্বীকার করতে। পরবর্তীকালে ফ্রান্সে রাজতন্ত্র পুনরায় ফিরে আসে, তার ও পরে গনতন্ত্র পাকাপাকি স্থান লাভ করে, কিন্তু মাথা উঁচু করে টিকে থাকে নোতর দাম।            আসুন আসা যাক একটু সাহিত্যের কথায়। হ্যাঁ, এবার ঠিক ধরেছেন। ১৮৩১ সালে প্রকশিত ভিক্টর হুগো র কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অফ নোতর দাম’ এর কথা বলছি। এই উপন্যাসের যে কোনও পাঠক একবার না একবার কৈশোরে নিজের মধ্যে কোয়াসিমোদোকে আবিষ্কার করেননি এমন হয় না বললেই চলে। আচ্ছা, কোয়াসিমোদো কি ভাবত চোখের সামনে প্রিয় গির্জা কে পুড়ে খাক হতে দেখে? দু ফোঁটা জল কি চোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ত না তার? আর আমরা যারা কখনও না কখনও নিজেদের মধ্যে কোয়াসিমোদোকে খুঁজে পেতে সফল হয়েছি, প্যারিসের মাটিতে কখনও পা না রেখেও এই দুঃখের শরিক কি আমরাও হচ্ছি না? কি অনবদ্য বিবরণ ই না দিয়েছিলেন হুগো, যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে নোতর দামের প্রতিটি অলিগলি, নাই বা গেলাম সেখানে সশরীরে, বইয়ের পাতা তো আছে, সৌজন্যে হুগো। শুধুমাত্র একটি গির্জাকে কেন্দ্র করে একটি বিখ্যাত উপন্যাসের সৃষ্টি, খুব একটা দেখা যায় না। আগ্রহী পাঠক মাত্রই জানবেন উপন্যাসটির সম্পূর্ণ শিরোনাম- ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অফ নোতর দাম দে প্যারিস ‘। প্যারিস শব্দটি যুক্ত করে হুগো বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন প্যারিসের কাছে এই স্থানটির গুরুত্ব, যা একটি ধর্মীয় স্থানের তুলনায় অনেক, অনেক বেশি গভীর।                আধুনিক ইউরোপে ধর্মের গুরুত্ব ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে, যুগের নিয়মই ধর্মকে সরিয়ে সামনে আনছে বিজ্ঞানকে। কিন্তু মূর্তিমান ব্যতিক্রম সেই নোতর দাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বাহিনীর কাছে প্যারিস যখন পদানত, শেষ প্রহরের শঙ্কায় প্যারিস বাসী, তখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল এই গির্জা। হিটলারের অনুগত নাৎসি বাহিনী, খ্রীষ্ট ধর্মের প্রতি যাদের অনুরাগের কথা কখনো শোনা যায়নি, তারাও আঁচড় পর্যন্ত কাটলো না এই গির্জার দেওয়ালে। শুধু তাই নয়, যুদ্ধকালে প্যারিসে বোমাবর্ষণের সময় বা সামরিক যুদ্ধের সময় বায়ুসেনা বা পদাতিক বাহিনী নির্বিশেষে সৈন্যবাহিনীর সদস্যরা নোতর দামের প্রতি বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করতেন বলেও শোনা যায়। অনেক ঐতিহাসিক যখন বিস্ময় প্রকাশ করেন যে সমগ্র ইউরোপ জ্বলে পুড়ে যাওয়া সত্ত্বেও নোতর দাম কিভাবে রক্ষা পেলো, তার কারণ খুঁজতে হলে ধর্মের থেকেও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ঐতিহ্যকে। প্যারিসবাসী র কাছে বিশেষ মর্যাদার এই স্থানটিকে আঘাত করার ঝুঁকি নিতে পারেননি কেউই।             এই দেখুন, এত কথা বলে ফেললাম, অথচ একটি গির্জা সংক্রান্ত আলোচনায় ধর্মীয় গুরুত্ব টিই আলোচনা হলো না। তা সেই গুরুত্ব ও আছে। গির্জায় ছিল ক্রুশবিদ্ধ হবার সময় যীশুর মাথায় থাকা কাঁটার মুকুট, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে যা অমূল্য। সুখের বিষয় এই যে, অগ্নির করাল গ্রাস থেকে এটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ছিল পাদ্রী লুইয়ের পোশাক, যার এখনও কোনও সন্ধান নেই। ছিল মধ্যযুগীয় মূল্যবান বহু গ্লাস পেন্টিং এবং তৈলচিত্র। ধর্ম ছাড়াও শিল্পকর্ম হিসেবেই যেগুলি অমূল্য। সন্ধান নেই সেগুলোরও। গির্জার প্রতিষ্ঠা কালের দুটি বিশাল আকৃতির ঘণ্টা ছিল এখানে, যা বাজত বিশেষ বিশেষ সময়ে। শেষ এগুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল হিটলারের বাহিনীর পরাজয়ের পর প্যারিসের মুক্তি ঘোষণা করতে। ঘণ্টা দুটি রক্ষার চেষ্টা করছেন কর্তৃপক্ষ। আশা করা যায় সফল ও হবেন।            আলোচ্য প্রবন্ধটি লেখার সময়েও পুরো নেভেনি আগুন, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাপ ও সম্ভব হয় নি, সম্ভবত হবেও না কোনোদিন। কারণ মানব সভ্যতার ঐতিহ্য ধারণকারী এই প্রতিষ্ঠানের অগ্নিকাণ্ডের যে আত্মিক ক্ষতি, তার বাজারী পরিমাপ সম্ভব ও নয়। আগুনের আঁচে আজ কাঁদছে প্যারিস বাসী, আদর করে যারা তাদের প্রিয় নোতর দাম কে ডাকে ‘দ্য গ্রেট ওল্ড লেডি’ বলে। যে প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাবের পিছনে ২০০ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম, যে প্রতিষ্ঠান ৮০০ বছর ধরে বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক ঝড় ঝাপটা অবলীলায় সামাল দিয়েছে, মাত্র ৬৩ মিনিটের একটি অগ্নিকাণ্ড ছাই করে দিল তার ঐতিহ্যকে। ভিক্টর হুগো তাঁর উপন্যাসে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, সকল ভালো জিনিসের মতোই নোতর দামের ও একদিন শেষ সময় আসবে। সেটি যে সত্যিই হাজির হবে, এটা কি তিনি আদৌ চেয়েছিলেন? নাকি এটাই বাইবেলে বর্ণিত সেই সময়, যখন মানুষের পাপের ফল ভোগ করবে তাদের প্রিয় বস্তু রা? সেই বিতর্ক দূরে সরিয়ে রেখেই বলা যায়, যেটি পুড়ে ছাই হচ্ছে, সেটি নিছক একটি ধর্ম প্রতিষ্ঠান নয়, সেটি ইতিহাস, মানব সভ্যতার ক্রম বিবর্তনের ইতিহাস, শিল্পের ইতিহাস, মনুষ্যত্বের ইতিহাস। তাই এই কঠিন সময়ে শুধুমাত্র প্যারিস নয়, কাঁদছে গোটা বিশ্ব। এই প্রবল শোকের সময়েও ভিক্টর হুগো দেখে তৃপ্তি পেতেন যে, নোতর দাম কেবলমাত্র একজন কোয়াসিমোদোর নয়, তা হাজার হাজার কোয়াসিমোদোর আবেগের নাম।   

আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

নতুন প্রকাশিত

হোম
শ্রেণী
লিখুন
প্রোফাইল