দুয়ো রানী

পার্থ চক্রবর্তী
5 রেটিং
576 পাঠক

জুলাই এর শুরুর দিক। গোটা ভারত তখন মেতে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে। বিরাট, রোহিত, বুমরা, ধোনিদের বড় বড় ছবি ঝুলছে চারদিকে। বড় বড় জাতীয় পতাকায় সেজেছে গোটা দেশ। কাগজের পাতা জুড়ে শুধু ক্রিকেট ক্রিকেট আর ক্রিকেট। তারা কী খাচ্ছে, কী ড্রেস পড়ছে, কোন হোটেলে আছে, প্র্যাকটিস কেমন হচ্ছে সব খবর ঢুকে পড়ছে আমাদের অন্দরমহলে। তাদের জন্য যজ্ঞ হচ্ছে, শুভেচ্ছা বার্তা আছড়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ার ওয়াল জুড়ে। গ্যালারি জুড়ে সমর্থকদের উন্মাদনা, নানান সাজে সেজেছে সকলে। গ্যালারি আলো করে ক্রিকেটারদের স্ত্রীরা বসে আছেন।

সব আলোর থেকে অনেক দূরে পোল্যান্ডের মাটিতে দাঁতে দাঁত চেপে রানিং শু এর লেস বাঁধছিল ১৯ বছরের এক ভারত কন্যা। অসমের হিমা দাস। কোন খবর ছিল না পেপারের পাতায়। শুভেচ্ছা বার্তা ছিল না একটাও। সমর্থক, জাতীয় পতাকা কিছুই ছিল না গ্যালারিতে। তবু সে মোটিভেট করছিলো নিজেকে। মোটিভেশন বলতে ছিল তার উঠে আসার দিন গুলো।

আসামের নওগাঁ জেলার হতদরিদ্র কৃষক পরিবারের বাবা মা এর ষষ্ঠ সন্তান সে। পেট ভরে খাবার জুটত না। পড়াশোনা ছাড়তে হয়েছিল অভাবের তাড়নায়। আর খেলনা পাতি কোথায় পাবে? তাই খেলত পাড়ার ছেলেদের সাথে। মাঠে ফুটবল আর দৌড়োদৌড়ি। তাতেই নজর কেড়েছিল। কী স্পিড কি পাওয়ার!! অবাক হতো সবাই আধপেটা মেয়ের ওই দম দেখে।আন্তঃ জেলা প্রতিযোগিতায় সস্তার কেডস পরেই অসম্ভব গতিতে ফিনিশ করা দেখে মুগ্ধ সবাই। শুধু হিরে থাকলেই হবে না, তাকে চেনার জন্য, কাটার জন্য জহুরি দরকার পড়ে। সেই জহুরি হলেন নিপন দাস। আসাম যুব কল্যান দপ্তরের অ্যাথলেটিক্স কোচ।তার বাবাকে বুঝিয়ে মেয়ের সব দায়িত্ব নিলেন নিজের কাঁধে। হিমা কে নিয়ে চললেন গুয়াহাটি।কিন্তু সেখানের রাজ্য ক্যাম্পে বক্সিং আর ফুটবলের কোচিং হয়।অ্যাথলেটিক্সের ব্যবস্থা নেই। কর্তাদের দরজায় দরজায় ঘুরলেন নিপন স্যার। একবার একবার দেখুন মেয়েটাকে। অনেক দূর যাবে। একটা চান্স দিন। অনুরোধে মানুষ ঢেঁকি গেলে। তাই অনিচ্ছাতেও হিমার একটা দৌড় দেখতে রাজি হলেন কর্তারা। দেখার পর আর কিছু বলতে হয়নি। বুঝে গেলেন শুধু আসাম না সারা দেশকে অনেক কিছু দেবে এই মেয়ে। অ্যাকাডেমিতে প্র্যাকটিসের সুযোগ হোল তার।

সেখানে আধুনিক ট্রেনিং, পুষ্টিকর ডায়েট, আধুনিক উন্নত রানিং শু সবকিছুর ব্যবস্থা করলেন স্যার। আর কানে দিলেন এক মন্ত্র, ” আমি প্ল্যাটফর্মটা দিলাম। এরপর অনেক পথ বাকি, খরচ অনেক, স্বপ্নও অনেক। বাকিটার জন্য দরকার পারফরমেন্স। যদি দৌড়কে ভালোবাসো, যদি ওই দরিদ্র জীবন থেকে, ওই ক্ষিদে, অপুষ্টি অভাবের গর্ত থেকে উঠে দাঁড়াতে চাও। তো দৌড়াও। জান প্রান দিয়ে জীবনের জন্য, মুক্তির জন্য দৌড়াও”। কোনির ক্ষিতদার মতোই নিপন দাস ঢুকিয়ে দিলেন লড়াইয়ের মন্ত্র। আর সেই মন্ত্র বলে লড়াই শুরু হোল হিমার। রাজ্য, দেশের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাক লাগিয়ে দিলেন গতিতে। দেশের গণ্ডি ছেড়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এলো চমকপ্রদ সাফল্য। ২০১৮ সালের অনূর্ধ্ব ২০ জুনিয়র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, ফিনল্যান্ডের ট্যামপেয়ারে, মহিলাদের ৪০০ মিটারে স্বর্ণ পদক জিতে নিতে সময় নিয়েছিলেন ৫১.‌৪৬ সেকেন্ড।

তারপরেও লড়াই শেষ হয়নি। কোচ বারবার বলেছেন অনেক পথ বাকি। পারফরমেন্স খারাপ হলেই শেষ হয়ে যাবে সব সুযোগ, প্রচার, স্পন্সরদের সাহায্য। তাই চাই আরও আন্তর্জাতিক পদক। আরও সাফল্য। আরও আরও। সেই সব ভেবেই ২ রা জুলাই পোল্যান্ডের মাটিতে তৈরি হচ্ছিলেন কুটনো অ্যাথেলেটিক্স মিট-এ মহিলাদের ২০০ মিটার দৌড়ে।

শুরু হোল দৌড়। কমাস পিঠের ব্যাথায় খুব ভুগেছেন, প্র্যাকটিস হয়নি ঠিকমতো, এখনও সারেনি পুরোপুরি। কিন্তু আজ সব অতীত। এক চিতা যেন ভেসে চলেছে হাওয়ার বেগে।সামনে এক সোনার হরিন। সে হরিন এক স্বপ্ন। নিপন স্যারের দেখানো স্বপ্ন। সারা বিশ্ব ছুটছে। সবার আগে হিমা। তাকে ছোঁবে কে? এ যে তার জীবনের লড়াই। সবার অলক্ষ্যে, সমর্থক হীন, করতালি বিউগল হীন মাঠে চোখের জল আর পিঠের ব্যাথা চেপে উনিশের মেয়েটা যখন জাতীয় পতাকা দুহাতে মেলে ধরলেন তখন বুঝি ভারতমাতার চোখটাও চিকচিক করে উঠলো তার সোনার মেয়ের জন্য। ৬ই জুলাই আবার। সোনা আনলেন হিমা। তারপর আজ আবার সোনা জয়ের হ্যাট্রিক হোল তার হাত ধরে। সবার শুভেচ্ছা আর কোটি টাকার স্পন্সর সমর্থিত ক্রিকেট দল ফিরে এসেছে পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে। তখন দেশকে বারবার সম্মানিত করে চলেছেন অবহেলিত, খেলার দুয়ো রানী অ্যাথেলেটিক্সের সেই সোনার মেয়ে হিমা।

আজ পতাকা উড়ুক হিমার জন্য। সফল হোক সেই দরিদ্র মেয়ের লড়াই, বাস্তব হোক নিপন স্যারের স্বপ্ন। বহু দূর যাক হিমা। শুভেচ্ছা জানাই তাকে।

…..পার্থ চক্রবর্তী

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া

চিত্র সৌজন্য : গুগল

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 1 Average: 5]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত