কার্গিল যুদ্ধের 20 বছর

পার্থ চক্রবর্তী
3 রেটিং
294 পাঠক

কাশ্মীরের লাদাখ অঞ্চলের কার্গিল, দ্রাস, বাটালিক অঞ্চল গুলি বছরের ৪/৫ মাস থাকে জনবিচ্ছিন্ন। ২০/২৫ ফুট বরফের নিচে চলে যায় সমগ্র অঞ্চল। সেনাবাহিনী ওই অঞ্চল ছেড়ে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল নেমে আসে নিচে। তখন ওই অঞ্চলে জনমানবের প্রবেশ প্রায় অসম্ভব। তাই অরক্ষিত থাকলেও সমস্যা হয়না ওই সীমান্ত অঞ্চলের।আবার মে মাস থেকে সেনাবাহিনী ছেড়ে আসা ঘাঁটিতে গিয়ে সারা বছর থাকে অতন্দ্র প্রহরায়।

অঞ্চলটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি বিপজ্জনক। গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই অঞ্চল দিয়ে গেছে ভারত পাক সীমান্ত রেখা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ক্রমাগত ওঁত পেতে থাকে ওপারে। এই অঞ্চলটি দখল করতে পারলে কাশ্মীর উপত্যকা অরক্ষিত হয়ে যাবে হানাদারদের কাছে। চীন তিব্বত সব সীমান্তই দখলে রাখা যাবে। আর বিপদ এখানে পদে পদে। যেকোনো মুহূর্তে হানা দিতে পারে আত্মঘাতী বাহিনী। পাক গোলায় উড়ে যেতে পারে শিবির। তার ওপরে বরফের ধস, তুষারপাত, হিমাঙ্কের অনেক নীচে থাকা তাপমাত্রা, জনহীন তুষার মরুতে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যেতে পারে যে কোনো মুহূর্তে।তার মধ্যেই অতন্দ্র প্রহরায় সজাগ থাকে ভারতীয় সেনা।

সালটা ১৯৯৯। ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগের কপালে ভাঁজ। রাডারে ধরা পড়ছে দ্রাস বাটালিক অঞ্চলে পাহাড় চূড়ায় সন্দেহজনক শিবির, ও কিছু মানুষের উপস্থিতি। শুরু হলো খোঁজ খবর। স্থানীয় মেষ পালকদের থেকে জানা গেলো সন্দেহজনক সশস্ত্র বাহিনী ঘাঁটি গেড়েছে ওখানে।তদন্ত করে জানা গেলো প্রচন্ড শীত এবং তুষারপাতের সুযোগ নিয়ে পাক বাহিনী দখল নিয়েছে ওই অঞ্চলের।

শুরু হলো চাপান উতোর, দোষারোপ, আলাপ আলোচনা। পাকিস্তান অস্বীকার করলো সব অভিযোগ। তখন নির্দেশ গেলো ভারতীয় সেনার কাছে। দখলমুক্ত করতে হবে ওই অঞ্চল।কাজটি অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং চ্যালেঞ্জিং। বিপজ্জনক কারণ খাড়াই পাহাড়ের ঢাল, বরফের ধস, পাহাড়ের ফাটলে অতলে হারিয়ে যাবার ঝুঁকি। এর সঙ্গে রয়েছে শত্রুর অবস্থানগত অসুবিধা। পাহাড়ের চূড়ায় আছে শত্রুরা। যেখান থেকে যুদ্ধ করা, শত্রুর অবস্থান বোঝা অনেক বেশি সহজ। এইসব বাধা অতিক্রম করে জয় করতে হবে কার্গিল অঞ্চল। তার ওপর অভিযান করতে হবে রাত্রে। ওপরের শত্রুর সাথে দিনের আলোয় যুদ্ধ করা আর মৃত্যুকে ডেকে আনা একই ব্যাপার।কিন্তু অসম্ভবকে সম্ভব করার নামই ভারতীয় সেনা।শুরু হলো কার্গিল যুদ্ধ, অফিসিয়াল নাম অপারেশন বিজয়।

প্রথম পর্যায়ে কিছু অঞ্চল দখলমুক্ত করার পর, শুরু হলো আসল অভিযান। শৃঙ্গগুলি দখল মুক্ত করতে হবে। ভয়ঙ্কর সেই অভিযানের প্রস্তুতি শুরু হলো পুরোদমে। পাহাড় চড়ায় দক্ষ গোর্খা রেজিমেন্টের ওপর দেওয়া হলো দায়িত্ব। বাছাই করা সেনাদল কে বোঝানো হলো পরস্থিতি। পুরো ম্যাপ ধরে রাডার মিলিয়ে চিহ্নিত করা হলো শত্রুর অবস্থান। মেষপালকের ছদ্মবেশে নিযুক্ত হলো সেনার চর। শত্রুদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে, তারপর হবে আক্রমণ।

১৯৯৯ এর ১ জুলাই। সেনাবাহিনীর পরবর্তী টার্গেট ওই অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুড়া জুবার টপ দখল মুক্ত করা। এই শৃঙ্গটি অনেকটা উঁচু, তাই এখানে অভিযান ভীষণ কঠিন। আর উঁচু বলেই এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকে সমস্ত চুড়া গুলিতে নজরদারি চালানো যায়। এখান থেকে সহজে হামলা চালানো যায় অন্যান্য টপে। কিন্তু এর ঢাল মারাত্মক খাড়াই, একটু অসাবধান হলে খাদে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। আর এই টপটি জুড়ে বেশ কয়েকটি বাংকার করেছে পাক সেনা। যেখান থেকে নজরদারি আর আক্রমন দুটোই চালানো যায় নিরাপদে।

২ রা জুলাই রাত ৮ টা। ঝিরঝির করে তুষারপাত হচ্ছে। আবহাওয়া খারাপ। নির্দেশ এলো আজকে রাতেই জুবার টপ অভিযান করতে হবে। দায়িত্ব পড়লো গোর্খা রেজিমেন্টের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মনোজ পান্ডের ওপর। পুরু জ্যাকেট, হেলমেট,নাইট ভিশন চশমা, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, পিস্তল,বেয়নেট আর গ্রেনেড নিয়ে সজ্জিত হলেন তিনি। সঙ্গে ১৫ জনের বাহিনী থাকবে। তাদের ব্যাক আপ করতে রেডি থাকবে আরেক দল। রাত ১২ টা থেকে শুরু অভিযান।অন্ধকারে মিশে গিয়ে এগোতে থাকে মনোজের দল। কিছুটা ওঠার পর হঠাৎ ট্যা রা রা শব্দে গর্জে ওঠে শত্রুর মেশিনগান। উপস্থিতি টের পেয়েছে তারা। টানা ৫ মিনিট চলল ফায়ারিং। দুজন জোয়ান অস্ফুট আর্তনাদ করে হারিয়ে গেলেন অন্ধকারের বুকে। মনোজ নির্দেশ দিলেন পাথরের আড়ালে শেল্টার নেবার। তার আগেই একটি গুলি এসে লাগলো তাঁর ডান পায়ে। তীব্র যন্ত্রনায় চোখে অন্ধকার দেখলেন।তারপরেই দাঁত চেপে লুকিয়ে গেলেন পাথরের আড়ালে। শুরু হলো পরামর্শ। তিনি লিডার, তাই নেতৃত্ব দেবেন তিনি। চার জন সঙ্গীকে নিয়ে বুকে হেঁটে পাহাড়ের অন্য দিক দিয়ে উঠবেন। বাংকার আক্রমন করবেন আচমকা। শত্রুরা দিশাহারা হলে উঠে আসবে বাকি দল। শুরু করবে লাগাতার ফায়ারিং। তিনি গ্রেনেড দিয়ে গুঁড়িয়ে দেবেন সব ব্যাংকার। শিউরে উঠলো দল। এইভাবে চারজনে যাওয়া মানে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। কিন্তু শত্রুরা উপস্থিতি টের পেয়ে যাওয়ায় অন্য উপায় নেই।

এগিয়ে চললেন মনোজ।সাথে তিন যোদ্ধা। বুকে হেঁটে পিছনের পথ ধরে। ভয়ংকর খাড়াই আর দুর্গম এ পথ।পায়ে গুলির ক্ষত।রক্তপাত হচ্ছে। মনোজ অদম্য। বাংকারে চার পাক সেনা সতর্ক নজর রাখছে। হাতে উদ্যত রাইফেল। আচমকাই অশরীরীর মতো দু ফুট দূরে উঠে দাঁড়ালো দুই মূর্তি। কিছু বোঝার আগেই ফুটো করে দিলো পাক সেনাদের বুক। তাদের আর্তনাদে অন্য ব্যাংকার থেকে বাকি সেনারা ফায়ারিং শুরু করলো। তিন সেনার একজনের বুকে লাগলো গুলি। তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় বললেন স্যার পজিশন চেঞ্জ করুন। আমি এই ঘাঁটি থেকে ফায়ারিং জারি রাখছি।যতক্ষণ প্রাণ আছে গুলি বন্ধ হবে না। রক্তাক্ত সঙ্গীকে ছেড়ে অন্য দিকে সরে গেলেন মনোজ। এক সঙ্গীকে বললেন ফায়ারিং করতে। শত্রুরা সেদিকে মনোযোগ দিলে তিনি পৌঁছে গেছেন দ্বিতীয় ঘাঁটির কাছে। মুহূর্তে গ্রেনেড হানলেন ঘাঁটি লক্ষ্য করে। দাউদাউ করে জ্বলে গেলো ঘাঁটি। পাহাড়ের মূল ঘাঁটি থেকে শত্রু সৈন্য দল শুরু করলো লাগাতার ফায়ারিং। চারটি বুলেট ফুঁড়ে দিলো মনোজের শরীর। তিনি অপ্রতিরোধ্য। নেক্সট গ্রেনেড চার্জ করলেন। শত্রুর গোলায় তাঁর কপাল মারাত্মক ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলো। তিনি লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। ততক্ষণে পাহাড়ের অন্যদিক দিয়ে উঠে এসেছে ভারতীয় সেনার ৩০ জনের দল। তারপর শুধুই ফায়ারিং আর শত্রুর আর্তনাদ। জুবের টপ দখল মুক্ত হলো। ভারতীয় পতাকা উড়ল শৃঙ্গের মাথায়।

আর মনোজ? তিনি তখন রক্তে ভেজা ইউনিফর্মে মাটিতে পড়ে। ভোরের আকাশ লাল হয়ে সূর্য উঠছে পূর্ব দিকে। জাতীয় পতাকা উড়ছে আর তার নিচে চির ঘুমে মনোজ পাণ্ডে। দেশ মায়ের বীর সন্তান তৃপ্তির ঘুম ঘুমোচ্ছেন দায়িত্ব সেরে। এর চেয়ে গর্বের আর কি আছে সৈনিকের জীবনে?

সেনা অফিসাররা বলেছিলেন মনোজের ওই বীরত্ব আর লড়াইয়ের জন্যই সম্ভব হয়েছিলো জুবের টপ দখল। অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন তিনি। পেয়েছিলেন ভারতের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান, মরনোত্তর পরমবির চক্র।

আজ কার্গিল যুদ্ধ জয়ের ২০ বছর অতিক্রান্ত। গর্বের বিজয় দিবস আজ। বিজ্ঞাপনে, উৎসবে, বক্তৃতায় আড়ম্বরে পালিত হচ্ছে গর্বের দিন। বিস্মরনের অন্ধকারে চাপা পড়ে যান মনোজ পান্ডের মতো আসল নায়করা। তারা ছিলেন তাই এসেছিল গর্বের জয়। তাঁরা আছেন তাই আছে দেশ, আছি আমরা। বিজয় দিবসের শ্রদ্ধা জানাই সকল বীর সৈনিককে। জয় হিন্দ। জয় জওয়ান

… পার্থ চক্রবর্তী

তথ্য সূত্র ।। উইকিপিডিয়া

চিত্র সৌজন্য : গুগল

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 2 Average: 3]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত