হাসির দুনিয়ায় অনবদ্য শিবরাম

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়
0 রেটিং
289 পাঠক
রেটিং দিন
[মোট : 0 , গড়ে : 0]

পাঠকদের পছন্দ

বঙ্গাব্দ তেরশ দশ প্রাতে রবিবার/সাতাশে অগ্রহায়ণ শিবের কুমার/শিবরাম জনমিল লীলা-শঙ্খ বাজাইল/শিব-হৃদে উপজিল আনন্দ-অপার।

বাবা তার একটি কাব্যগ্রন্থে এই কয়েকটি ছত্রে এভাবেই ছেলের জন্মমুহূর্তটিকে কালেরবুকে স্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেদিনের সেই নবজাতক আপন প্রতিভার গুণেই পরবর্তীকালে নিজেকে স্মরণীয় করে তুলেছিলেন বাঙালির হৃদয়ে, মননে। পরিণত হয়েছিলেন বাংলার হাস্য-রসসাহিত্যের এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কে। হ্যাঁ, শিবরাম চক্রবর্তীর কথাই বলছি।

পিতৃ, মাতৃ — উভয়কুলের দিক থেকেই তিনি ছিলেন রাজবংশ-সম্পর্কিত। সেকালে বড় জমিদারদের ‘রাজা’ সম্বোধন করা হত। মাতামহকুলে জমিদারি ছিল কোনায়। আর পিতামহকুলের উত্তরবঙ্গের চাঁচোলে। সেখানকার কোন একসময়কার রাজন ঈশ্বরচন্দ্র অপুত্রক অবস্থায় মারা যান। তাঁর ছিল দুই স্ত্রী। সিদ্ধেশ্বরী ও ভূতেশ্বরী। মৃত্যুপূর্বে রাজা তাদের দত্তকগ্রহণের অধিকার দান করে যান। তবে প্রথম পত্নী আগে, দ্বিতীয় পত্নী পরে —- এভাবেই তারা তাদের সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। সেইমতই রাণী সিদ্ধেশ্বরী তার নিজের বোনের ছেলেকে দত্তক হিসেবে গ্রহণ করেন। যাঁর নাম ছিল শিবপ্রসাদ চক্রবর্তী। ইনিই শিবরামের পিতা। কিন্তু কী রাজ্যপালনে কী রাজসিক ভোগবিলাসে — কোনোটাতেই শিবপ্রসাদের এতটুকুও মতিগতি ছিল না। তিনি যেন ছিলেন আত্মবিভোর সন্ন্যাসীর মত সদাই বৈরাগ্যমনষ্ক। ভবঘুরে। আত্মভোলা। মাঝেমাঝেই নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন। শুধুই কী বাবা, মায়ের মধ্যেও ছিল গভীর ঈশ্বরমগ্নতার সদা-নির্লিপ্ততা। তাই শিবরামের চারপাশের পরিবেশ ছিল বাঁধাবাঁধনহীন একেবারে খোলামেলা, পরিষ্কার। যার সুযোগ নিয়ে বাবার স্থিতিহীন স্বভাব-প্রকৃতি খুব সহজেই তার মধ্যে সঞ্চারিত হবার সুযোগ পেয়েছিল। তাই কৈশোর টপকাতে না টপকাতেই মাঝেমাঝেই মন চায় যতদিন ততদিনের জন্য প্রায়ই অদৃশ্য হয়ে যেতেন হেথায়সেথায় নিরুদ্দেশে।

তারপর একদিন চাঁচোলে সস্ত্রীক এলেন দেশবন্ধু। তার স্বদেশী ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে শিবরাম সঙ্গ নিলেন তার। পাকাপাকি ভাবেই এবার বেরিয়ে পড়লেন ঘর ছেড়ে। একেবারে কপর্দকশূন্য অবস্থায়। হাজির হলেন কলকাতায়। উদ্ভট খেয়ালিপনার স্বভাবদোষেই তাকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল কিশোর স্বদেশীদের জন্য আবাসস্থলটি থেকে। তারপর একেবারে সটান কলকাতার রাজপথে। একা।

রাজপরিবারের ছেলে কিন্তু রাজবংশজাত আত্মগরিমার এতটুকুও বালাই নেই কোথাও তার মধ্যে। তাই অনায়াসেই ধাতস্থ হয়ে গিয়েছিলেন — ভোজনং যত্রতত্র শয়নং হট্টমন্দিরে। ঢালাও লঙ্গরখানায়ই হোক কিংবা ভিখারীদের সাথে পংক্তি ভোজ — কোথাও আপত্তি নেই তার। আপত্তি নেই ফুটপাথে শুয়ে রাত্রিযাপন করতেও। ওই ফুটপাথেই আলাপ হওয়া সমবয়সী একজনের পরামর্শে শুরু করেছিলেন দিনের বেলা খবরের কাগজ ফেরি করা। খেতে খুব ভালবাসতেন। ভালবাসতেন সিনেমা দেখতে। প্রতিদিন একটা সিনেমা তো দেখা চাইই। কাগজ বিক্রির পয়সা তাই মুহূর্তেই উড়ে যেত রাবড়ি, মিষ্টি, চপ-কাটলেট খেয়ে কিংবা সিনেমা দেখেই।

এর মধ্যেই চলল লেখালেখি। তার কথায়, তাও নাকি পেটের দায়েই। তিনি নিজেকে কখনো তথাকথিত সাহিত্যিকদের দলে ফেলতেন না। কারণ সাহিত্যিকরা স্রষ্টা। তাঁরা একটি বিশেষ প্রেরণায় লেখেন। তিনি ‘সামান্য লেখকমাত্র, কলমচালক কেবল’। পেটের দায়ে লেখেন। তার কথায় বলতে গেলে — “গায়ে জোর নেই বলে রিক্সা টানতে পারিনা তার বদলে কলম টানি।” তাই তার এই লেখালেখি শুধুই নিজের খাঁই মেটাবার জন্য।

স্কুলের পড়াশুনো শেষ করা হয়ে ওঠেনি তার। দেওয়া হয়নি এন্ট্রান্স পরীক্ষাও। ঘরের বাইরের বিশ্বজগতের অমোঘ আকর্ষণ ক্রমেই তার মধ্যে প্রবল হয়ে উঠছিল। তবে ঘর ছাড়ার আগে অবধি তিনি নির্বিচারে বই পড়েছেন, বলা যায় পড়ার দুর্নিবার নেশাতেই। বাবার নিজস্ব গ্রন্থাগারে ছিল অজস্র বইয়ের ভান্ডার। প্রবাসী, ভারতবর্ষ, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা থেকে শুরু কালীপ্রসন্ন সিংহের মহাভারত, কৃত্তিবাসী রামায়ণ, ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর, বঙ্কিমের রাজসিংহ, রজনী, দেবীচৌধুরাণী — কী নেই! না, ছিলনা শুধু রবিঠাকুরের উপস্থিতি। কারণ বাবার মতে কবির মত কবি হলেন শুধুমাত্র মধুসূদন, হেমচন্দ্র আর নবীন সেনেরাই। তবে স্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়ে বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে রবিঠাকুরের সংস্পর্শে আসার সুযোগ ঘটেছিল তার। প্রথম পাঠ চারু বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত রবীন্দ্রনাথের ‘চয়নিকা’। পরবর্তী কালে মালদা জেলার কালিগ্রামের জমিদার এবং সংস্কৃতিপত্র ‘গম্ভীরা’র প্রকাশক-সম্পাদক কৃষ্ণচরণ সরকারের বিরাট গ্রন্থাগারের বিচিত্র এবং বিভিন্ন গ্রন্থ সম্ভারের রসাস্বাদনের সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি।

প্রথমে কবিতা দিয়ে লেখা শুরু। লিখেছেন ‘বাড়ীওয়ালার বাড়াবাড়ি’, ‘নামবিভ্রাট’, ‘জমাখরচ’-এর মত কবিতাগুলি। ‘আজ এবং আগামীকাল’-এর মত অসংখ্য প্রবন্ধও লিখেছেন। লিখেছেন ‘পন্ডিত বিদায়’, ‘মামাভাগ্নে’র মত নাটকও। কিন্তু হাস্য-রসাত্মক কিশোর-সাহিত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়েই তার আকাশচুম্বী খ্যাতি লাভ। ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ তার একটি অন্যতম অবিস্মরণীয় উপন্যাস যার প্রধান কিশোর চরিত্র কাঞ্চন আর কেউ নয় — শিবরাম স্বয়ং। এই উপন্যাসের ছত্রেছত্রে শিবরাম অসামান্য নৈপুণ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন তার ভবঘুরে জীবনের ‘যেমন-খুশি’ স্বাধীনতার এক স্বতন্ত্র অভিজ্ঞতা। ১৯৫৮ সালে ঋত্বিক ঘটক এই উপন্যাসটিকে চলচ্চিত্রায়িত করেন।

ছোটদের মধ্যে তিনি অসম্ভব জনপ্রিয় ছিলেন। তার এই জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে তিনি মনে করতেন যে তিনি কখনোই ছোটদের ছোট বলে ভাবতেন না। তাদের বড় হওয়ার বড়বড় উপদেশ না দিয়ে তার সমকক্ষই ভাবতেন এবং তাদের ভাবনায় একটা বড়ত্বের স্বাদ এনে দিতেন — যা ছোটরা খুবই উপভোগ করত। তবে তার নিজেকে কখনোই শিশুসাহিত্যিক বলে মনে হয় নি। দক্ষিনারঞ্জন, উপেন্দ্রকিশোর, কুলদাচরণ, সুখলতা রাও, সুকুমার রায় — তার ধারণায় এরাই যথার্থ অর্থে প্রকৃতই শিশুসাহিত্যিক। এদের মত লেখনী এযুগে বড়ই দুর্লভ। যদিও একালের হেমেন্দ্রনাথ রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায় এরাও ছিলেন তাঁর খুব পছন্দের এবং আপনসৃষ্টিতে তারা এতটাই দক্ষ যে এদের ধারেকাছেও নিজেকে তিনি ভাবতে পারতেন না কখনো। বড়ই অদ্ভুত লাগে, এমনটি কী শুধুই তার বিনয় নাকি অভিমান? যারা তার সাহিত্যসৃষ্টির স্বাদ পেয়েছে তারা মাত্রই জানে, এমনি তার লেখনীর জাদু যে একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করা পর্যন্ত স্বস্তি নেই। তার সাহিত্যরসে ছোটরা তো বটেই যারা বড় তারাও অপার মুগ্ধতায় আজো আপ্লুত হয়ে যায়।

তার সৃষ্ট হর্ষবর্ধন, গোবর্ধন, নকুড় মামার মত চরিত্রগুলো এখনো সব বয়সের বাঙালি পাঠককে সমানভাবে আকর্ষণ করে। তার লেখার একটা বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে, তিনি শব্দ নিয়ে নানান মজার খেলা খেলতে খুবই ভালবাসতেন। শব্দকে দুমড়েমুচড়ে, ভেঙেচুড়ে বিকৃত করে শব্দটিকে, সেইসঙ্গে গোটা বাক্যটিকেই মজার মজার নানান ভিন্নার্থে প্রকাশ করতেন। তাই ‘হাতির সাথে হাতাহাতি’, ‘ঘোড়ার সাথে ঘোরাঘুরি’ —- এহেন পানিং সৃষ্টিতে তার অনায়াস-দক্ষতার অসাধারণ পরিচয় আমরা তার লেখায়লেখায় যত্রতত্র খুঁজে পাই। আর এমন পানিং সৃষ্টিতে তার পূর্বসূরিদের মধ্যে শরৎচন্দ্র পণ্ডিত বা দাঠাকুরই তাকে সব চেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বলে তিনি একদা এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন।

তার লেখায় মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে আশীর্বাদ করেছিলেন। পেয়েছিলেন শরৎচন্দ্রের অকুণ্ঠ প্রশংসাও। কিন্তু মনে তবু প্রশ্ন জাগে, এহেন মানুষটি কি সত্যিই তার সৃষ্টির প্রকৃত মূল্য, মর্যাদা, স্বীকৃতি এগুলো যথার্থই পেয়েছিলেন? তিনি ছোটদের জন্য লিখতেন তাই নিজেকে বলতেন ছোটলেখক। নিছক মজা করেই বলা। কিন্তু ঘটনাটা হল, যেহেতু তিনি ছোটদের লেখক তাই বইপাড়ার প্রকাশকদের কাছে তিনি বড়দের লেখকদের মত সমান মর্যাদা সেভাবে কখনোই পান নি। আসলে মানুষটা যে বড়ই ভোলেভালা। না আছে কোন মোহ না আছে এতটুকুও চাহিদা! খাওয়ার পয়সাটুকু জুটে গেলেই যেন বর্তে গেলেন। কখনোই কী পেলেন বা না-পেলেন — তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না। সত্যি কথা বলতে কি, ব্যক্তিজীবনে মানুষটি ছিলেন এমনতরাই। এতখানি আপনভোলা, আড়ম্বরহীন এবং সব বিষয়েই অগোছালো, এমন একজন মানুষ এ সংসারে যেন বড়ই বেনজির। নিজের জীবনের মত নিজের সৃষ্টির প্রতিও তিনি এতটুকুও যত্নশীল ছিলেন না। তাই সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে গেছে তার অনেক মূল্যবান লেখা।

শুনে অবাক হলেও সত্যি যে, তিনি তার প্রাপ্য পয়সার সবটুকু অনেকের কাছ থেকেই অনেকসময় পেতেন না। কিন্তু তা নিয়ে কখনোই তার তেমন কোনো অভিযোগ ছিল না। চালচুলোহীন এই মানুষটার পয়সা দিয়ে কী হবে — এই যুক্তি দিয়ে অনেকেই তাকে কিছুই না দিয়েও চেপে যেতেন। এমন কী শরৎচন্দ্রের মত মানুষও তাকে বঞ্চিত করেছিলেন তার প্রাপ্য থেকে। এই প্রসঙ্গে শিশির ভাদুড়ী মশাইকেও পুরোপুরি বাদ দেওয়া যায়না।

শরৎচন্দ্রের ‘দেনাপাওনা’ উপন্যাসটি শিবরামের কলমে অনবদ্য নাট্যরূপ পেয়েছিল ‘ষোড়শী’ নামে। ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘ষোড়শী’। কিন্তু বেরিয়েছিল শরৎচন্দ্রের নামে। যুক্তি হল — এতে নাকি বইটা ভাল কাটবে। মুখবুজে মেনে নিয়েছিলেন শিবরাম। তারপর শিশির ভাদুড়ী মহাশয় নাটকটি মঞ্চস্থ করেন যা সেইসময় দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল। প্রতিটি শো’য়ে প্রেক্ষাগৃহ ছিল কানায়-কানায়। শিবরামের আর্থিক টানাটানি তখন তুঙ্গে। তিনি শিশিরবাবুর কাছে লভ্যাংশের তার ভাগটা চেয়েছিলেন। শিশির বাবু বেনিফিট শো’য়ের দিন তাকে আসতে বলেন। সেইমত শো’য়ের শেষে সেদিন গ্রীনরুমে গিয়ে হাজির হন শিবরাম। কিন্তু গিয়ে শোনেন যে থলিভরে রাখা সেইদিনের বিক্রীত টিকিটের সব টাকা শরৎবাবু নিয়ে চলে গেছেন। শিবরামকে তার ভাগের একটা টাকাও না দেবার পেছনে শরৎবাবুর যুক্তি ছিল, শিবরাম বিয়েথা করেনি, ছেলেপুলে নেই, ও টাকা নিয়ে কী করবে? তাছাড়া তার বেনিফিট শো’য়ের টাকা তিনি অন্য কাউকে দেবেন কেন? যাহোক, শিশিরবাবু তার একটি প্রায়-নিঃশেষিত অ্যাকাউন্টের অবশিষ্ট একশ-কুড়ি টাকার একটি সেলফ-চেক তাকে দিয়ে কোনক্রমে কথা রেখেছিলেন। ওই টকুই।

শিশিরে নয়, শরতে একটু আঘাত পেয়েছিলেন শিবরাম। তার হৃদয়ের একটি উচ্চস্থলে এতদিন অবস্থান করে এসেছেন শরৎচন্দ্র। দুঃখ করে লিখেছেন,”…শিশিরবাবুর দিক থেকে ততটা নয়, শরৎচন্দ্রের ব্যবহারে আমার আঁতে লেগেছিল যেমনটা। উপন্যাসের দরদী শরৎচন্দ্র জীবনের বাস্তববিন্যাসে এক নিমেষে কোথায় যে হারিয়ে গেলেন।”

যে মানুষটি ছোটদের নাম করে সব বয়সের মানুষের জন্য রসসাগর মন্থন করে অমৃত তুলে নিয়ে এসে তার সৃষ্টিকে ভরিয়ে তুলতেন, তার খামখেয়ালী জীবনটাও ছিল কিন্তু তার সৃষ্টির মতই একটা আস্ত আজব কৌতুকী। কলকাতায় তার জীবনের গোটা সময়টাই তিনি কাটিয়ে ছিলেন উত্তর কলকাতার ১৩৪ নং মুক্তারাম স্ট্রিটের একটি ঘরে। কাটানো তো নয় — যেন ‘দিনগত পাপক্ষয়’। নিজেকে যেমন, তেমনি তার এই ঘরটাকেও তার বসবাসের দীর্ঘসময়ে অবহেলা ছাড়া আর কিছুই দেন নি। ঘরটি নেওয়া অবধি কোনোদিন পরিষ্কার করা হয়ে ওঠেনি। খাটেরতলাটার অবস্থা এতটাই ভয়ঙ্কর ছিল যে সেখানে বিষাক্ত সরীসৃপ লুকিয়ে থাকাও অসম্ভব নয়। একজন লেখকের ঘর হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ছিলনা একটি চেয়ার-টেবিলও। ছিলনা বইয়ের সেলফ। এমনকি গুটিকতক বইও। ঘরের দেওয়ালগুলোয় অজস্র আঁকিবুকির বকলমে আসলে নামঠিকানায় ভরা। কারো নাম-ঠিকানা লেখার দরকার পড়লে কাগজ-টাগজ নয়, ব্যবহার করতেন ঘরের চারটে দেওয়ালকেই। উত্তরের লোকের ঠিকানা উত্তরের দেওয়ালে, দক্ষিণের লোকের ঠিকানা দক্ষিণের দেওয়ালে….. এই ভাবেই লিখে রাখতেন ঠিকানাগুলো। এমনকি তালাবন্ধ ঘরের চাবি হারিয়ে যাওয়ার পর তালা না ভেঙে কব্জা থেকে দরজার একটা পাল্লা আলাদা করে তাকে চাগিয়ে তুলে ঘরে যাতায়াত করতেন। এমনি ছিল তার ‘চলে গেলেই হল’ প্রতিদিনকার দায়সারা জীবনযাপন।

প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত দুজনের সাথেই শিবরামের ছিল দারুণ সখ্যতা। প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাথে তার আলাপ সিনেমা হলে আর অচিন্ত্যকুমারের সাথে ফুটবল মাঠে। একসময়ে প্রেমেন্দ্র মিত্র তাকে নিয়ে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন যেটি তার নজরে আসলেও অচিন্ত্যকুমার যখন কল্লোল যুগে তাকে নিয়ে লিখলেন তা’ তিনি পড়েও দেখেন নি। কারণ বইটির নাকি বেজায় দাম! যদিও অচিন্ত্যবাবু এই বইয়ের একটি কপি তাকে ডি এম লাইব্রেরী থেকে নিয়ে নিতে বলেছিলেন। বইটি আনতে গেলে ডি এম লাইব্রেরীর কর্ণধার মশাই তাকে বলেছিলেন, আপনি বই নিয়ে কী করবেন, ফুটপাথে বেচে দেবেন তো। নাম খারাপ হবে প্রকাশকের। তিনি বই না দিয়ে বইয়ের দাম পাঁচটাকা শিবরামের হতে তুলে দিয়েছিলেন আর শিবরামও মহানন্দে ওই দোকানেরই উল্টোদিকে চাচার হোটেলে গিয়ে পরম তৃপ্তি-সহকারে ভালোমন্দ সহযোগে উদরপূর্তির স্ফূর্তিতে সদ্ব্যবহার করেছিলেন টাকাটি। তার কথায়,”আমার বাসায় বই রাখবার জায়গা কই? একটাও আলমারি কি বুক শেলফ আছে?”

এমনি অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ ছিলেন এই শিবরাম চক্রবর্ত্তী। একসময়ে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে ছিলেন। অর্থাভাব ছিল তার নিত্যসঙ্গী। দেশবন্ধু নেতাজির আত্মশক্তি পত্রিকায় একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন তার। ওই যে, সময়ের হিসাব কষে নিয়মের বাঁধনে চলা কোনোকালেই তার ধাতে সয় না। সেখানেও যেমনখুশি, যখনখুশি যেতেন, আসতেন। কয়েকবার সতর্ক করার পর বিরক্ত নেতাজি তাকে চাকরি থেকে ছাড়িয়ে দিতে একপ্রকার বাধ্য হন। এরপর বারিন ঘোষের যুগান্তর পত্রিকা কিনে নিয়ে সেখানে স্বদেশী মত ও পথের প্রচার শুরু করলে রাজরোষে পড়েন এবং জেল খাটেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেল থেকে তাকে বহরমপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই তার সাথে আলাপ হয় কাজী নজরুলের। কাজীর হৃদয়-মাতানো গান-কবিতার আবেশ আর তার সুস্বাদু রান্নার গুণে বড়ই উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল তার কারাবাসের দিনগুলো। জেল থেকে মুক্তি পাবার পর আবার তিনি পাঁচশ টাকায় ‘যুগান্তর’ বেচে দেন তুষারকান্তি ঘোষের কাছে।

কখনো বাউন্ডুলের মত লক্ষ্যহীনতায় কখনো আবার ছন্নছাড়ার চরম আত্মউদাসীনতায় যেমনতেমন বেঁচে থেকে বেশ কাটিয়ে দিয়েছিলেন গোটা জীবনটা। তবু বোধহয় শেষরক্ষা হল না। তীব্র অর্থকষ্টে এই আপনভোলা মানুষটার জীবনের শেষ কটাদিন তার কাছে বড়ই নিষ্করুণ হয়ে দেখা দিয়েছিল।খাবার পয়সা নেই।শরীরও ভেঙে গিয়েছিল। সরকারি ভাবে তার একটা মাসোহারার ব্যবস্থা করাও হয়েছিল। কিন্তু এতসব ঘটলেও তার মনের রসসিন্ধুর স্রোতে কোথাও এতটুকুও ভাটা পড়েনি। তাই মৃত্যুর পাঁচ মিনিট আগেও তিনি সহাস্যে বলতে পারেন — “ফাস্টক্লাস আছি।”

এটা খুবই দুঃখের যে মানুষকে একদিন মরতেই হবে তবু এই ভেবে আশ্বস্ত হই যে স্রষ্টা অমর। তাই দমফাটা হাসতে হাসতেই আপামর বাঙালি তাকে মনে রাখবে চিরকাল।
আজ যখন চারপাশে থেকে চাপচাপ সমস্যার ঘনকঠিন আক্রমণে এই পৃথিবীর সবটুকু স্বতস্ফূর্ত হাসি ক্রমেই গুটিয়ে এতটুকু হয়ে আসছে তখন কে বলতে পারে যে এই শিবরামদেরই আগামীকালের মানুষগুলোর বড্ড বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়বে না!!

                 -----------
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



  • নিলয় সরকার December 24, 2020 at 12:18 pm

    Khub sundor

  • নতুন প্রকাশিত

    হোম
    শ্রেণী
    লিখুন
    প্রোফাইল