কবিকথা ও প্রেম (পর্ব- ৭)

অর্পণ (শঙ্খচিল) ভট্টাচার্য্য
5 রেটিং
1388 পাঠক
রেটিং দিন
[মোট : 2 , গড়ে : 5]

পাঠকদের পছন্দ

বিগত পর্বগুলোর লিঙ্ক:-
১.www.saabdik.com/kobi-katha-o-prem
২.www.saabdik.com/kobikotha_o_prem_part_2
৩.www.saabdik.com/kobikotha_o_prem_part_3
৪.www.saabdik.com/kobikotha-o-prem-part-4
৫.www.saabdik.com/kobikotha-o-prem-part-5৬.www.saabdik.com/kobikotha-o-prem-part-6
সহধর্মিণীর কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা কি ছিল সেকথা আমাদের সকলেরই জানতে ইচ্ছে করে। কিভাবে তিনি তাঁদের যৌথ জীবন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেকথা জানা যায় মৃণালিনীকে লেখা কবির পত্র পড়ে। একটি পত্রে তিনি লিখছেন , “আমাকে সুখী করবার জন্যে তুমি বেশী কোন চেষ্টা করো না— আন্তরিক ভালোবাসাই যথেষ্ট। অবশ্য তোমাতে আমাতে সকল কাজ ও সকল ভাবেই যদি যোগ থাকত খুব ভালো হত — কিন্তু সে কারো ইচ্ছায়ও নয়। যদি তুমি আমার সঙ্গে সকল রকম বিষয়ে সকল রকম শিক্ষায় যোগ দিতে পার তো খুশি হই — আমি যা কিছু জানতে চাই তোমাকেও তা জানাতে পারি — আমি যা শিখতে চাই তুমিও আমার সঙ্গে শিক্ষা কর, তাহলে খুব সুখের হয়। জীবনে দুজন মিলে অগ্রসর হবার চেষ্টা করলে অগ্রসর হওয়া সহজ হয় — তোমাকে কোন বিষয়েই আমি ছাড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করিনে — কিন্তু জোর করে তোমাকে পীড়ন করতে আমার শঙ্কা হয়। সকলেরই স্বতন্ত্র রুচি অনুরাগ এবং অধিকারের বিষয় আছে — আমার ইচ্ছা ও অনুরাগের সঙ্গে তোমার সমস্ত প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ মেলাবার ক্ষমতা তোমার নিজের হাতে নেই — সুতরাং সে সম্বন্ধে কিছুমাত্র খুঁৎখুঁৎ না করে ভালোবাসার দ্বারা যত্নের দ্বারা আমার জীবনকে মধুর — আমাকে অনাবশ্যক দুঃখকষ্ট থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করলে সে চেষ্টা আমার পক্ষে বহুমূল্য হবে।”

দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী হেমলতাকে লেখা কয়েকটি চিঠি থেকে মৃণালিনীকে পাওয়া যায়। সুরসিকা মৃণালিনী দেবীর একটা দুটো চিঠি অবশ্য রক্ষা পেয়েছে। এই ছোট্ট সাংসারিক চিঠির মধ্যেও তাঁর পরিহাসপ্রিয় সহজ মনটি ধরা পড়েছিল। সুধীন্দ্রনাথের স্ত্রী চারুবালাকে লেখা একটি চিঠিতে দেখা যায় মৃণালিনী তাঁকে অনুযোগ করছেন দীর্ঘদিন চিঠি না লেখার জন্য। তার মধ্যে যে অনাবিল স্বচ্ছতা আছে, তার সৌন্দর্য বুঝি কোন সাহিত্যিক চিঠির চেয়ে কম নয়। মৃণালিনী দেবী লিখছেন ——
“তোমার সুন্দর মেয়ে হয়েছে বলে বুঝি আমাকে খবর দাওনি পাছে আমি হিংসে করি, তার মাথায় খুব চুল হয়েছে শুনে পর্যন্ত “কুন্তলীন” মাখতে আরম্ভ করেছি, তোমার মেয়ে মাথা ভরা চুল নিয়ে আমার ন্যাড়া মাথা দেখে হাসবে, সে আমার কিছুতেই সহ্য হবে না। সত্যিই বাপু, আমার বড় অভিমান হয়েছে, না হয় আমাদের একটি সুন্দর নাতনী হয়েছে, তাই বলে কি আর আমাদের একেবারে ভুলে যেতে হয়…??”

শান্তিনিকেতন চলে গেলেও জোড়াসাঁকোর একান্নবর্তী পরিবারটির জন্য মৃণালিনীর আন্তরিকতা কখনো হ্রাস পায়নি। শিলাইদহে তাঁর কাছেই ছুটে যেতেন ভাশুরপো ভাশুরঝিরা। বলেন্দ্রনাথ সংস্কৃত, ইংরেজি, বাংলা যখন যে বই পড়তেন, কাকীমাকে পড়ে শোনাতেন। শুধু কি আত্মীয় স্বজন??? মৃণালিনী সবার সুখেই সুখী আবার সবার দুঃখেই দুঃখী। শিলাইদহে একদিন মুলা সিং নামে এক পাঞ্জাবি তাঁর কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে নিজের দুরবস্থার কথা জানিয়ে বললে, “মাইজী, একটি চাকরী দিয়ে আমাকে রক্ষা করুন, নতুবা আমি সপরিবারে মারা পড়িব।” রবীন্দ্রনাথ তখন শিলাইদহে ছিলেন না, মৃণালিনী তাঁকে কুঠিবাড়ির দারোয়ানের কাজে বহাল করলেন। কদিন পরে দেখলেন, মুলা সিং তখনো বিষণ্ণ। মৃণালিনী কারণ জানতে চাইলেন। সে জানাল, তার মাইনের সবটাই খরচ হয়ে যায় দুবেলা চার সের আটার রুটি খেতে। করুণাময়ী মৃণালিনী সেইদিন থেকে তাঁর নিজের সংসার থেকে মুলা সিংয়ের জন্য চার সের আটা বরাদ্দ করলেন। মাইনে বাড়ল, তবু আটার ব্যবস্থা আগের মতোই রয়ে গেল। দিনে দিনে তাঁর যে মূর্তিটি বড় হয়ে উঠেছে, সে তাঁর জননী মূর্তি। শান্তিনিকেতন আশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় তার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া গেল। ‘সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী’ সেখানে হয়ে উঠলেন অন্নপূর্ণা।

মৃণালিনী দেবী রূপসী ছিলেন না, কিন্তু অপরূপ মাতৃত্বের আভা তাঁর মুখে লাবণ্যের মতো ঢলঢল করত, একবার দেখলে আবার দেখতে ইচ্ছে হয়, এই ছিল প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিমত। পাঁচটি সন্তানের জননী মৃণালিনীর এই মাতৃমূর্তি আরও সার্থক হয়ে উঠেছিল, শান্তিনিকেতনে ঘর থেকে দূরে পড়তে আসা শিশুগুলিকে আপন করে নেওয়ার মধ্যে।

কবির প্রত্যাশা পূর্ণ করেছিলেন মৃণালিনী। জীবনের সব ক্ষেত্রে এমনকি শান্তিনিকেতনে আদর্শ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বাসনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেখানে গেলে মৃণালিনীও তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ধরণের কান্ডজ্ঞানহীনতায় আত্মীয়স্বজনের উপদেশ, উপহাস, বিরুদ্ধতা, বিদ্রূপ সবই সহ্য করতে হয়েছিল। আত্মীয়দের খুব দোষ নেই, সর্বনাশের মুখোমুখি গিয়ে কেউ দাঁড়াতে চাইলে তাকে তো সাবধান করবেনই। নাবালক পাঁচটি সন্তান, তার মধ্যে তিনটি মেয়ে…. অথচ কবি তাঁর যথাসর্বস্ব ঢেলে দিচ্ছেন আশ্রম বিদ্যালয়ে। লোকে বলবে না কেন??? মৃণালিনীর মনেও এই নিয়ে ভাবনা ছিল। তবুও তিনি স্বামীকে সব কাজে হাসিমুখে সাহায্য করেছেন। যখনই কোন প্রয়োজন হয়েছে, তখনই খুলে দিয়েছেন গায়ের এক একটি গয়না। মৃণালিনী পেয়েছিলেন প্রচুর। বিয়ের যৌতুকের গয়না ছাড়াও শাশুড়ীর আমলের ভারী গয়না ছিল অনেক। সবই তিনি কবির কাজে গা থেকে খুলে দিয়েছিলেন। রথীন্দ্র লিখেছেন, “শেষ পর্যন্ত হাতে কয়েক গাছা চুরি ও গলায় একটি চেন হার ছাড়া তাঁর কোন গয়না অবশিষ্ট ছিল না। “

শুধু গয়না দিয়ে নয়, আশ্রমের কাজেও মৃণালিনী স্বামীকে যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন। আধুনিক অর্থে তাঁকে হয়তো প্রগতিশীল বলা যাবে না কারণ শিক্ষা দীক্ষায় ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের ছাড়িয়ে অন্যান্য মেয়েরাও ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিলেন। উগ্র আধুনিকতা এ বাড়ির মেয়েদের রক্তমজ্জায় প্রবেশ করেনি। দীর্ঘকাল ধরে জ্ঞানদানন্দিনীই সেখানে উগ্র আধুনিকতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। কিন্তু মহৎ নারীর পরিচয় মৃণালিনীর মধ্যে আছে। “চারিত্রপূজা” গ্রন্থ লেখবার সময় রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছেন, “মহাপুরুষের ইতিহাস বাহিরে নানা কার্যে এবং জীবন বৃত্তান্তে স্থায়ী হয়, আর মহৎ নারীর ইতিহাস… তাঁর স্বামীর কার্যে রচিত হইয়া থাকে ; এবং সে লেখায় তাঁহার নামোল্লেখ থাকে না।” এই লেখার মধ্যে দিয়ে আমরা মৃণালিনীর আসল পরিচয় খুঁজে পাব। তিনি রবীন্দ্রনাথের জীবনে, ঠাকুরবাড়িতে, শান্তিনিকেতনের আশ্রম-বিদ্যালয়ে মিশে আছেন ফুলের সুরভির মতো। দেখা যায় না, কিন্তু অনুভবে মন ভরে যায়।

মৃণালিনী আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে রবীন্দ্রনাথের আশ্রম-বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা আরো সার্থক হতে পারত। তিনি ব্রহ্মচর্য আশ্রমের দেখাশোনা করতেন এবং অপরের কচিকচি শিশুদের অপরিসীম মাতৃস্নেহে নিজের কাছে টেনে নিয়ে, তাদের হোস্টেলে আসার দুঃখ ভুলিয়ে দিতেন। বাড়ির থেকে দূরে এসেও বাচ্চারা মাতৃস্নেহের পরশ পেত। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের তীব্র আঘাত সহ্য করতে না পেরে, আশ্রম-বিদ্যালয় স্থাপনের মাত্র এগারো মাস পরেই বিদায় নিলেন মৃণালিনী। কবির সমস্ত সেবা যত্ন ব্যর্থ করে দিয়ে শীতের পদ্মটি ম্লান হয়ে এল, হারিয়ে গেল কবির প্রিয় পত্র-সম্বোধনটি ‘ভাই ছুটি’। কে জানত এত শীঘ্র জীবন থেকে, সংসার থেকে ছুটি নিয়ে তিনি চলে যাবেন!! জীবনের প্রতি পদে লোকান্তরিতা মৃণালিনীর অভাব অনুভব করেছেন রবীন্দ্রনাথ…. “এমন কেউ নেই যাকে সব বলা যায়—“। “স্মরণে”র কবিতায় ঝরে পড়েছে লোকান্তরিতা পত্নীর জন্য বেদনা। সংসারে যখন শুধুই কথার পুঞ্জ জমে উঠেছে তখন তিনি বারবার স্মরণ করেছেন তাঁর স্বর্গত স্ত্রীকে।অনুভব করেছেন তাঁর আশ্রম-বিদ্যালয় অসম্পূর্ণ থেকে গেছে কারণ, “আমি তাদের সব দিতে পারি, মাতৃস্নেহ তো দিতে পারি না।” বাংলাদেশের আরো কয়েকজন আদর্শ জননীর পাশে মৃণালিনীর মাতৃমূর্তিটিও চিরস্থায়ী আসন লাভ করতে পারে।

©️শঙ্খচিল

ক্রমশঃ

আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত

হোম
শ্রেণী
লিখুন
প্রোফাইল