#আই 💖 #কোলকাতা-গ্যাস বেলুন

অর্পণ (শঙ্খচিল) ভট্টাচার্য্য
5 রেটিং
704 পাঠক

পর্ব-৪:- #গ্যাস_বেলুন

আগের পর্বগুলোতে যেসব বিষয় বস্তু পোস্ট করেছিলাম সেগুলো আক্ষরিক অর্থেই ‘পুরনো কোলকাতার হারিয়ে যাওয়া আভিজাত্য কেন্দ্রিক আর অতীত গৌরবের রোমন্থন।শহরের বুকে যে সব হেরিটেজ দর্শনীয় স্থানগুলি রয়েছে , মানে যেগুলোতে দেশি বিদেশি পর্যটকরা ভিড় করে সেগুলো অধিকাংশই কিন্তু ব্রিটিশ স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে আসছে, মানে চট করে তো বাইরে থেকে কেউ এসে প্রথমেই শ্যামবাজার আর বাগবাজার দেখতে ছুটে যায় না,কিন্তু প্রথমেই কলকাতার পর্যটন মানচিত্রে ভেসে আসে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল!না,আমি এই পর্বে ভিক্টোরিয়ার ইতিহাস ঘাঁটতে আসিনি, ভিক্টোরিয়া’কে ঘিরে আপামর কলকাতাবাসির শৈশব কৈশোর যৌবন আর বার্ধক্যের যে গল্পগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেগুলোই একটু জড়ো করার চেষ্টা করেছি নিজের মতো করে !সেই প্ৰচেষ্টায় ফুচকা , ভেলপুরি , বাদামভাজা, ভ্রাম্যমান কফিওয়ালা আর গ্যাস বেলুনের গাড়ি সমেত যেন এক মেলা মেলা ভাব ! এর মধ্যে শেষের বস্তুটি মানে ‘গ্যাস বেলুন’ এটিও কিন্তু হারানো সময়ের কোলকাতার গৌরব নিদর্শন যা কিনা আজ বিস্মৃতির অতলে প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে..

স্মার্ট ফোনের যুগে আমরা এতটাই আধুনিক হয়ে পরেছি,একটি বেলুন বিক্রেতার দিকে নজর নেই,ছোটো বেলায় বাবা-মার হাত ধরে মেলায় যাওয়া, কিছু খাওয়া হোক না হোক বেলুন কেনা টা অবশ্যক ছিল। রংবেরঙের বেলুনের, গ্যাস-বেলুন আকাশের দিকে উড়ে চলেছে। সত্যি বলতে দিন গুলি আর ফিরে পাওয়া যাবে না, শত চেষ্টা করলেও।ডিজিটাল যুগে শিক্ষিত বাবা-মা ছেলের হাতে বেলুন তুলে দেয় না, স্মার্টফোন তুলে দেয়। ক্ষুদে হয়তো ভুলে গেছে এইসময় প্রত্যেকে ডিজিটাল চশমা পরিহিত জনগণ বেলুন শব্দের সাথে পরিচিত নয়। বেলুন এখন কারোর নজর কারে না..।

  • চোখ রাখি হারিয়ে যাওয়া গ্যাস বেলুনের প্রবর্তন তার ইতিহাসে তার পথরেখার উপর..

মাইকেল ফ্যারাডের কথা বিজ্ঞানের জগতে সবসময়েই শুনতে পাওয়া যায়। বৈজ্ঞানিক কিছু ব্যাপারে ফ্যারাডের নাম ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানের ছোটখাটো অনেকগুলো পদের নাম তার দেওয়া। কিন্তু এসব কিছু জানলেও এটা কি আপনি জানেন যে মেলায় গেলে যে জিনিসটা সবসময়েই আপনার চোখে বেশি পড়ে, বাচ্চারা সবসময়েই যে জিনিসটি নিয়ে একটু বেশিই বায়না করে, সেই রবারের বেলুনের আবিষ্কারকও তিনিই ছিলেন? ১৮২৪ সালে রাবারের দুটো পাতলা পর্দাকে একত্র করেন মাইকেল ফ্যারাডে আর তাদের ভেতরে খানিকটা চালের গুড়ো মাখিয়ে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরে দেন তিনি। ব্যস! হয়ে গেল বর্তমান সময়ের অতিচেনা বেলুনের আবিষ্কার!

জন্ম থেকেই মানুষের আকাঙ্ক্ষা উপরে ওঠার, উন্নতি করার। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই মানুষ একদিন ভেবে বসল, আচ্ছা তাহলে আমরা মাটিতে কী করি? আমাদের আকাশে ওঠা দরকার না? পাখির মতো? তখন কেউ ইকারুসের মত গায়ে মোম দিয়ে পাখা লাগিয়ে উঠতে চাইল আকাশে কেউ বা অন্য কোনো পন্থায়।

মানুষের উড়তে শেখার শুরুটা তাই একদিনে হয়নি। হার না মানা মানুষের আকাশে ওঠার আবিষ্কারের গল্প প্রায় দুশো বছর ধরে। কখনও হামাগুড়ি দিয়ে আবার কখনও লাফিয়ে লাফিয়ে আমাদের এগিয়ে নিয়ে গেছে উড়তে শেখার পথে। আজকের লেখা সেই লাফ দেওয়ার মতোই এক আবিষ্কারের এবং সে আবিষ্কারের নায়ক দুই আপন ভাইকে নিয়ে।
না, ভেবো না আমি রাইট ব্রাদার্সের কথা বলছি। এই দুই ভাই, সেই দুই ভাই না। এদের পরিবারের নাম মন্টগলফিয়ার। এরা হলেন মন্টগলফিয়ার ভাইয়েরা। রাইট ব্রাদার্স যেমন আবিষ্কার করেছিলেন আকাশে উড়ার প্লেনের, এই দুই ভাই আবিষ্কার করেছিলেন আকাশে উড়ার বেলুনের। বড় ভাই এর নাম জোসেফ মন্টগলফিয়ার (Joseph-Michel Montgolfier)। তিনি একটু আবেগপ্রবণ, স্বপ্ন দেখতে ভালবাসতেন। ছোট ভাই এর নাম ইতিএন মন্টগলফিয়ার (Jacques-Étienne Montgolfier)। তার আবার ব্যবসায়িক বুদ্ধি বেশি।

তারা দুজনই বাবার কাগজের ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ইতিএন মন্টগলফিয়ার এর ব্যবসায়িক বুদ্ধির কারণে অল্পদিনের মধ্যেই তাদের কাগজের ব্যবসা বেশ বড় হয়ে উঠেছিল। একদিন ফায়ারপ্লেস এর আগুনের ধারে বসে ছিলেন জোসেফ মন্টগলফিয়ার। ফায়ারপ্লেসের পাশে একটা শার্ট শুকাতে দেওয়া ছিল। জোসেফ খেয়াল করলেন, আগুনের তাপে শার্টের পকেট ফুলে উঠে উপরে উঠে গেল। জোসেফ ভাবলেন, আগুন থেকে একটা বিশেষ গ্যাস বের হচ্ছে নিশ্চয়ই। তিনি এই গ্যাস এর নাম দিলেন ‘মন্টগলফিয়ার গ্যাস’।
ব্যাপারটা আরও ভালোমতো বোঝার জন্য, জোসেফ একটি তিন ফিট বাই তিন ফিট এর কাগজের বাক্সের মত জিনিষ বানালেন। তার নিচে আগুন আনলেন আর বাক্স গেল উড়ে । খুশিতে জোসেফ তার ছোটভাইকে চিঠি লিখলেন বাড়ি আসার জন্য। ছোটভাই ইতিএন সাথে সাথে জিনিষপত্র নিয়ে হাজির। দুই ভাই মিলে শুরু করলেন তাদের গবেষণা। দুজন মিলে একই রকম কিন্তু তিনগুণ বড় আর একটা বাক্সের মত জিনিস বানালেন আর তার তলায় আগুন রাখলেন। ফলাফল হল আগের মতোই। উড়ে গেল সেগুলো।

দুই ভাই যখন নিশ্চিত হলেন যে তাদের বানানো বেলুন কাজ করে; তখন তারা ঠিক করলেন, এবার ব্যাপারটাকে সবার সামনে আনতে হবে। নাহলে আবিষ্কারক হিসাবে ইতিহাসে তাদের নাম লেখা হবে না। তাই তাদের এই চেষ্টার ফল দেখাতে ১৭৮৩ সালের ৪ঠা জুনে ফ্রান্সের এনোনে (Annonay) শহরে প্রথম গরম বাতাসের বেলুন আকাশে উড়ল। সেদিনই তাদের এই আবিষ্কারের কথা ছড়িয়ে গেল সারা ফ্রান্সে।
এদিকে একই সময়ে প্যারিসে আবির্ভাব হয়েছে আরেক রকম উড়তে শেখার আবিষ্কারকের বেলুন। যার নাম ‘হাইড্রোজেন বেলুন’। জেকুয়েস চার্লস (Jacques Charles) নামের একজন ফ্রেঞ্চ কেমিস্ট এবং আবিষ্কারক ভেবে দেখলেন হাইড্রোজেন গ্যাস একটি ভাল উড়তে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু এই গ্যাস ব্যাবহার করে কিভাবে ‘হাইড্রোজেন বেলুন’ বানানো যায় তা তিনি জানতেন না। তাই উনি দ্বারস্থ হলেন আরেক দুই ভাই রবার্ট ভাইদ্বয়ের। এনি জিন রবার্ট (Anne-Jean Robert ) আর নিকলাস লুইস রবার্ট (Nicolas-Louis Robert) এই দুই ভাই মিলে জেকুয়েস চার্লস এর জন্য ‘হাইড্রোজেন বেলুন’ বানানো শুরু করলেন তাদের প্যারিস এর ওয়ার্কশপ-এ।

জেকুয়েস চার্লস আর রবার্ট ভাইয়েরা তাদের ‘হাইড্রোজেন বেলুন’ এর প্রথম প্রদর্শনীর উদ্যোগ নিলেন ১৭৮৩ সালের ২৭ অগাস্ট। তাদের জায়গাটা ছিল এখন যেখানে আইফেল টাওয়ার দাড়িয়ে আছে, প্যারিস এর ঠিক সেই জায়গাটা। তখন সে জায়গার নাম ছিল ‌’শেম্প দে মারস’ । মজার ব্যাপার হল, তাদের প্রদর্শনী দেখতে যারা এসেছিল, সেই ভিড় এর মধ্যে ছিলেন বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিনও।
জেকুয়েস চার্লস আর রবার্ট ভাইয়েরা সফলভাবে তাদের ‘হাইড্রোজেন বেলুন’ উড়ালেন। এই বেলুনের নাম ছিল ‘লে গ্লোব’ । ‘লে গ্লোব’ ছিল পঁয়ত্রিশ কিউবিক মিটারের রাবারের সাথে সিল্ক মিশিয়ে তৈরি। এটি প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট উড়ে প্যারিস থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে গনেস (Gonesse) গ্রামে গিয়ে পড়েছিল। গ্রাম এর লোকজন তো এ জিনিস তাদের জীবনে কখনো দেখেনি তাই বেলুনটা মাটির কাছাকাছি আসলে যার যা ছিল সব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পরেছিল বেলুনের উপর। তারা ভেবেছিল গ্রামে শয়তান এসেছে।

এখানে আরেকটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল, ‘হাইড্রোজেন বেলুন’ এর আবিষ্কারক জেকুয়েস চার্লস ছিলেন মন্টগলফিয়ার ভাই দের ‘হট এয়ার বেলুন’ প্রজেক্ট এর অন্যতম স্পন্সর। তারা একে অন্যকে সাহায্য করছিলেন বিভিন্নভাবে । তখনকার ফ্রান্সের রাজাও এই তিনজনের কাজের প্রতি নজর রাখছিলেন। দুই প্রকার বেলুনেরই মানুষ ছাড়া সফল উড্ডয়নের পর দুদলই রাজার কাছে প্রস্তাব করলেন যে তারা এবার মানুষ সহ বেলুন উড়াতে চান। সে আরেক মজার গল্প। ওটা না হয় অন্য কোনো অনুসর্গে উড়তে উড়তে করা যাবে।

  • জেনে রাখার মতো কিছু বিষয়:-

১৭৮৫ সাল, গ্যাস বেলুনে করে প্রথমবারের মত ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেওয়া হয়। ইংল্যান্ডের ডোভার থেকে ভ্রমণ শুরু করে ফ্রান্সের কালাই শহরে অবতরণ করেন গ্যাস বেলুনের সাহায্যে ওড়ার অন্যতম পথিকৃৎ ফরাসি উদ্ভাবক জন পিয়েরে ব্লাঞ্চারড, এবং আমেরিকান পদার্থবিদ জন জেফ্রিস।

১৯০৬ সাল, নিউইয়র্ক।
সর্বপ্রথম গ্যাস বেলুনের মাধ্যমে নিউইয়র্ক শহরের উপর থেকে গোটা শহরের ছবি তোলা হয়।

  • ব্যক্তিগত ভালোলাগা গ্যাস বেলুন কে নিয়ে-

আপন মনে চলে যাক অন্ধকার আকাশে ভেসে
গ্যাস ভরা বেলুনের মতো
হাজার তারার হাতছানি অঙ্গে জড়িয়ে
অন্তরীপ লক্ষ্য করে করে অন্তরীক্ষে
চন্দ্রের কক্ষপথে
জ্যোৎস্নায় প্লাবিত হতে হতে
চলে আসুক এই ব-দ্বীপাকাশে
চেয়ে দেখুন এখানেও মন আছে
আছে হৃদয়, প্রেম, ভালোবাসা
মাটির সোঁদা গন্ধে কর্দমাক্ত নরম মোলায়েম

ভালোবাসা কি শুধু তরুণ তরুণী কিম্বা যুবক যুবতী কেন্দ্রিক?হারিয়ে যাওয়া শৈশব কে ছুঁয়ে দেখুন না কেমন ভালোবাসার বন্ধন টের পাওয়া যায়..যেখানে সবুজের মাঝে তাজা নিঃশাস, নুড়ি পাথরের উপর অলস হাঁটা,আর দিন গোনার সূর্যাস্ত মেখে গোধূলির ক্যানভাসে গ্যাস বেলুনের উড়ে যাওয়া রোম্যান্টিক নয় বলছেন?ভাবুন বাঁচিয়ে রাখবেন কিনা,এই ভালোবাসার গ্যাস বেলুন নাকি ফুসসসস ভালোবাসা উড়ে যাবে…??

©️শঙ্খচিল

তথ্যসূত্র:-ব্যক্তিগত,গুগল

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 1 Average: 5]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত