ফেরা … ( চতুর্থ পর্ব)

সুদেষ্ণা চক্রবর্তী
5 রেটিং
956 পাঠক

প্রথম পর্বের লিংক:
https://www.saabdik.com/fera/
দ্বিতীয় পর্বের লিংক :
https://www.saabdik.com/fera_2/
তৃতীয় পর্বের লিংক:
https://www.saabdik.com/fera-3/

শ্বেতার কাছ থেকে ঋষি ওর খোঁজ করছে শুনে সেদিন বাবলি প্রচন্ড অবাক হওয়ার পাশাপাশি ভয়ও পেয়েছিল, যে ঋষিকে এতদিন ও আপ্রাণ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিল, অথচ পেরে উঠছিলোনা কিছুতেই, তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে ভেবেই নার্ভাস লাগতে শুরু করেছিল। পুরো একটা পিরিয়ড সময় নিয়েছিল নিজেকে প্রস্তুত করতে। 

“ আরে, বাইরে কেন? ভিতরে এসো.. শ্বেতা তোমায় বলেনি কিছু?” ঋষির সাবলীল প্রশ্নের উত্তরে বাবলি কোনোমতে বলেছিল .. “ না.. মানে ” । এরপর ঋষি নিজেই এগিয়ে এসেছিল ওর দিকে.. “আমরা কোথাও বাইরে গিয়ে বসতে পারি?.. মনে যদি তোমার আপত্তি না থাকে..” 

ওরা সেদিন কলেজের কাছেই একটা ছোট চায়ের দোকানে গিয়ে বসেছিল.. ঋষি ওর চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কোনোরকম ভনিতা না করেই বলেছিল, “ আই থিংক , আই হ্যাভ ফিলিংস ফর ইউ.. আমি অনেক ভেবে তবেই এই সিদ্ধান্তে এসেছি নন্দিতা .. তুমিও ভেবে দেখো, কোনো তাড়া নেই, টেক ইওর টাইম .. বাট যেটাই ঠিক করো না কেন, আমায় জানিও”

নতুন করে ভেবে দেখার সময় বা ইচ্ছে কোনোটাই বাবলির আর হয়ে ওঠেনি। এর পরের তিনটে মাস কেমন যেন হওয়ায় ভর করে কেটে গিয়েছিল ওর। প্রতিদিন কলেজে আসা, কোনোমতে অনার্স এর ক্লাসগুলো আটেন্ড করেই ঋষির সাথে বেরিয়ে পড়তো। কোনোদিন সউথসিটি মল তো কোনো দিন দক্ষিণাপন। কখনো ন্যাশনাল লাইব্রেরি তো  আবার কখনো প্রিন্সেফ ঘাট। এই নিউ মার্কেট চত্তরেও ওরা এসেছিল এক দু দিন। ঋষি জোর করে বাবলিকে একটা ঘননীল রংয়ের স্কার্ফ কিনে দিয়েছিল। 

নিদেনপক্ষে আর কোথাও না হলে কলেজের ইউনিয়ন রুমেই ওদের সময় কেটে যেত। 

ফেব্রুয়ারির শেষ হবে.. সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি, বাবলি ফোনে ঋষিকে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও পেলো না। দাদুর শরীরটা গতকাল থেকে আচমকা খারাপ করেছে, একেবারেই সাড়া দিচ্ছে না , কিছু খাওয়ানো যাচ্ছে না একদমই.. বাড়িতে দুশ্চিন্তার পরিবেশ। বাবলির আজ কলেজে যাওয়ার একটুও ইচ্ছা নেই, সেটাই ঋষিকে জানানোর জন্য চেষ্টা করছিল ও। সন্ধের পর অমলকান্তিকে হসপিটালএ  ভর্তি করতে হলো, পরিস্থিতি ভালো না । পরের দিন কলেজে যেতেই হতো ওকে, গিয়ে জানতে পারলো, আগেরদিন সৌরভের বাড়িতে চলা হাউসে পার্টিতে ঋষি এতটাই ড্রিংক করেছে যে রাতে ওকে বাড়ি অব্দিও নেওয়া যায়নি। আজ সকালে বাড়ি ফিরেছে। বাবলি কলেজ থেকেই আরো কয়েকবার ফোনে ধরার চেষ্টা করলো, পেলো না । একদিকে দাদুর এই অবস্থা আরেকদিকে ঋষিকে নিয়ে দুশ্চিন্তা.. বাবলি সাতপাঁচ না ভেবে ঋষির বাড়ির দিকে রওনা দিলো। 

এর আগে একবারই মাত্র ঋষির বাড়িতে এসেছিল ও, তাও কিছু সময়ের জন্য.. তাই কিছুটা আন্দাজের ওপর ভর করেই চলে এসেছিল। অবস্থাপন্ন বাড়ি, বাবা মা দুজনেই সরকারি উচ্চপদস্থ অফিসার। কলিং বেলটা টিপতে সবসময়ের কাজের লোক এসে দরজা খুলে দিলো। ঋষি কোথায় জিজ্ঞাসা করতে বললো, “ দাদা তো ওপরে আছে, বন্ধু এসেছে .. কথা বলছে”

“বন্ধু?” একটু অবাক হলো বাবলি.. কথা বলছে মনে তো জেগে, অথচ ওর ফোন গুলো তাহলে রিসিভ করছে না কেন? 

দ্রুতপায়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ঋষির ঘরের কাছে এসে দাঁড়ালো সে। দরজা ভিতর থেকে লক.. দুবার নক করল, ভিতরে কারো সাথে কথা বলতে বলতে যেন উঠে এলো ঋষি .. দরজাটা খুলে গেল … অন্ধকার নেমে এলো নন্দিতা রায় এর চোখের সামনে.. ভিতরে ঋষির খাটে আধশোয়া হয়ে আছে  দেবলীনা।

 হসপিটালে ভর্তি করার পাঁচদিনের মাথায় অমলকান্তি মারা যান। সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাবলি সেদিন একফোঁটা চোখের জল ফেলেনি। শ্রাদ্ধশান্তি মিটে গেলে একদিন উঠে এসেছিল তিনতলায় দাদুর ঘরে। ফাঁকা , শূন্য খাটটার এককোনে গিয়ে বসেছিল চুপ করে। তারপর  একসময় সারা শরীর কাঁপিয়ে কান্না এসে আছড়ে পড়েছিল। ধাতস্থ হওয়ার পর ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসেছিল সে। সেদিনের পর থেকে কাউকেই আর কিছু বলার রইলো না বাবলির।


——সুদেষ্ণা চক্রবর্তী

(ক্রমশঃ)
চিত্র সৌজন্য : গুগল

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 1 Average: 5]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত