দুগ্গি দেখলাম চাচা

দেবলীনা সাহা রায়
4.5 রেটিং
16107 পাঠক

সক্কাল সক্কাল এমন ঝাঁঝা করা রোদ! রোদের তেজে মাথা ঝিমঝিম করত্যাচে। সকাল থেইক্যা পেটে তেমন কিছু পরে নাই।তার ওপরে এই মাইকের চিলচিৎকার কান ঝালাপালা কইরা দিতেছে। সেই কাক ভোর থেকে কি শুরু কইরেছে ! আলোর বেনু, রঙিন ধেনু না কি সব হাতি ঘোড়া! শান্তিতে ভোরের আজান টাও আজ করতে পারিনাই। বাপজান কইত, “ ফজল , আল্লারে ডাকনে কোনোদিন কিপ্টামি কৈর না। চার বখত মন দিয়া নামাজ আদায় কোরো।” তাই করি। বাপজান মইরা গ্যাছে তাও বসর (বছর) দুয়েক হব গিয়া। আমি বাপজানের কথা ভুলি নাই। আল্লাই এখন আমার জানপরান। এই ঠেলা করে ফল বেচি আর আল্লারে ডাকি। সাদীও করি নাই। আমি আর আমার আল্লা, আর কিছু চাওনের নাই আমার।

এই হিন্দুর বাচ্চা গুলান তাতেও বাগড়া দেয়। অগো উপর হেব্বি রাগ আমার। আমার বাপের দ্যাশ রে কটু কথা কয়। আরে, শখ করে কি কেউ নিজের দ্যাশ ছাড়ে! আমার বাপজান ও কি শখ করে নিজের দ্যাশ ছাড়ছিলো নাকি! কত কষ্ট বুকে চিপ্যা দ্যাশ  ছাড়ছিলো একটা বাচ্চা পোলা। হ, তহন কত হবেক বয়েস আমার বাপজানের, আট কি নয় বছর। আমি তো এদ্যাশে ই জন্মেছি। আমি তো এদ্যাশ টা রেই নিজের দ্যাশ ভাবি। কিন্ত কেউ আমার বাপের জন্ম ভিটা নিয়া কিছু কৈলে, আমাগো আল্লা রে নিয়া কিছু কৈলে আমার খুন চড়ে যায় মাথায়। থাকনা তোরা তোদের মত, আমারে আমার মত থাকতে দে না। কটু কথা ক্যান কস!! তয় আমিও কই। এখন আবার কত দিন ধরে চলবে এদের উৎসব। আমার যে ভাল লাগে না, এমন টা নয়। ভালোই লাগে। মাঝে সাঝে মন চায়, ওদের আনন্দে আমিও সামিল হই। ধুনুচি নাচ নাচি। তাকদুমাদুম ঢাক বাজাই। কিন্তু তখনি মনে ভয় জাগে। ওরা যদি তাড়ায়ে দ্যায়, অপমান করে, কষ্ট হইবেক। তাছাড়া, আমার তো আল্লা আছে।আচ্ছা,  দুগ্গা পুজো করলে আল্লা কি গোঁসা করেন? আমার অত জানা নাই। আমি আরবি পড়তে পারিনা। কোরান পড়া হয় নাই তাই। কোরানে কি লিখা আছে আমি জানি না। আমি বাপজানের থিকা যা শুনছি ,তা মেনে চলার চেষ্টা করি। তবে বাপজান কখনো দুগ্গা নিয়ে কিছু কয় নাই আমারে। তবে বাপজান এক মজার গান গাইত মাঝে মাঝে। “একি দুগগি দেখলাম চাচা, এ কি দুগগি দেখলাম চাচা, আছেন যিনি সিংহের পরে,অসুর খানার টিক্কি ধরে, গলায় দিছে সাপ জড়ায়ে আর বুকে মারছে খোঁচা/ একি দুগগি দেখলাম চাচা”..এই গান টা শুনলেই আমার খুব হাসি পাইত ছোটবেলায়। কিন্তু এহন আমার রাগ। ভারী রাগ।

ছোটবেলায় অমন এক পূজার দিনে, আমার ছোট্ট বোন টা রে নিয়ে বেড়াইছিলাম।কত বয়স হবে তখন ওর, তিন কি সাড়ে তিন। আমি তখন ফুল প্যান্ট পরি।বয়স কাল অত জানা নাই। হব গিয়া বছর দশেক। সাকিনা, আমার মা হারা বোন টা, ওরে নিয়া এই দুগ্গা দেখতে বাইরিয়েছিলাম। সবুজ সবুজ কাঁচের চুড়ি কিনা দিয়াছিলাম। কি আনন্দ তার।কাজল টানা চক্ষু বড় বড় কইরা  হাত ঘুরায়ে ঘুরায়ে আমারে দেখায় আর খিলখিল কৈরে হাসে। বাপজান কইলো, “ফজল, চোখে চোখে রাখিস সাকিনা রে, আমি তো যেতে পারতাছি না, দুকান থেকে ছুটি পাই নাই। উৎসবের দিন। বুঝতেই পারস, খাবারের দোকানে ভিড় এখন ঠাইস্যা। বেশি কাজ করলে উপরি মিলবে।”

আর কি। সাকিনারে কোলে নিয়া আমিই একা বেড়াইছিলুম।পিলপিল কইরা মানুষ বাইর হয়েছে রাস্তায়। ভিড়ের ঠেলায় অস্থির। সাকিনারে একটা ঠাকুর দেখাই চুড়ি কিনে দেওয়ানের লগে খারাইলাম এক দোকানে। চুড়ি পেয়ে ছুঁড়ি মহা খুশি। দুটো মাত্র দাঁত হইছে। তাই বের করে হাসে। হাত ঘুরিয়ে চুড়ি দেখায় আর আদো আদো গলায় “দ্যে দ্যে” করে। ও ছুঁড়ি, তোমার আরো চুড়ি চাই! আমার কাছে যে আর টাকা নাই। চৌকির  তলা থেকে যা পাইছি, যা বাপজান রাইখ্যা গেছিল, তাই নিয়া আসছি। ওরে কইলাম, একটু নাম কোল থিকা, আমি টাকা মিটিয়ে তোরে নিতেছি। টাকা মিটিয়ে পিছন ফিরা চেয়ে দেখি নাই। বুকটা ধক করে উঠলো আমার। হাঁটি হাঁটি পা পা করে, ভিড়ের মধ্যে মিশে গেছিল আমার পুতুল পুতুল বোন টা। মানুষের ধাক্কা আর পায়ের চাপে কখন মাটিতে পইড়ে পিষা গেছে আমার বোন টা, কেউ ফিরেও দেখেনাই। ভিড় ঠেলে অনেক্ষণ পর যখন খুঁজে পাইছিলাম, বেটির হুশ ছিল না। মাথা ফেটে গেছিল। কেউ সাহায্য করে নাই সেদিন। এখন দেখি কত প্যান্ডেলে পুলিশ থাকে, ওষুধ থাকে, সেদিন কিছু পাইনাই। আমার মাথায় সাদা টুপি আর পায়ে নাগরা আর চোখে সুরমা  ছিল বলে কিনা জানিনা সেদিন বছর দশের ফজল কে সাহায্য করতে কেউ আসে নাই। সবাই তখন দুগগির পুজোর আনন্দে মাতোয়ারা। সাকিনা চলে যাওয়ার পর থেইক্যা আমি আর কোনোদিন ওই দুগ্গির মুখ দেখি নাই।


যাক, দুগ্গির কথা ভেবে লাভ নাই। জলদি এখন বাসায় ফিরতে পারলে বাঁচি। এটারে নাকি উত্তর কলকাতা কয়। কয় তো কয়। আমার কি ?? আমার কাছে উত্তর দক্ষিন সব কলকাতাই এক। সবটাই আমার দ্যাশ, আবার কোনোটাই আমার দ্যাশ না। আমি ঈদের দিনে নামাজ পড়ি আর ঘরে সেঁধিয়ে যাই। আমার কেউ নাই। আমিও কারো নই। আমার শুধু আল্লা আছে। আর কেউ নাই। তো, যা কইতেছিলাম, এখানে দু পা এগুতে না এগুতেই একটা করে দুগ্গা। আমি দুগ্গার মুখ দেখি না। মুখ ঘুরায়ে নি। চারিদিকে ঢাক ঘন্টা কাসর বাজছে। এরা আবার কেউ কেউ নিজের নিজের বাড়িতেও দুগ্গা এনে পুজো করে। আমি আমার ঠেলা টা পাশে রাইখ্যা একটা গাছ তলায় একটু নিরিবিলি দেখ্যা বইসলাম। হাত কয়েক দূরে একটা বাড়িতে মনে হয় পুজো হচ্ছে। আওয়াজ পাইতাছি। গন্ধ ও পাইতাছি ভালো ভালো। কখনো ধূপের, কখনো খিচুড়ির। চক্ষু বুইজা গাছের ছায়ার আরাম নিতে নিতে কখন ঘুম আইসে গেসল টের পাইনাই। ঘুম টা ভাঙলো একটা ডাকে।

“দ্যে দ্যে” করে আদো আদো গলায় একটা বাচ্চা মাইয়া  কি যেন কইতাছে আমার সামনে খাড়ায়ে।। ধড়মড় কইরে উইঠে বইসলাম। বাচ্চা টার পড়নে লাল পাড় সাদা শাড়ি। কাজল টানা চক্ষু। গা ভর্তি গওনা। সোনার ই তো মনে হইতাছে। তার ওপর ফুলের মালা, ফুলের মুকুট পরা, হাতে সোনার চুড়ি। হাত ঘুরায়ে ঘুরায়ে দ্যে দ্যে করে কি যেন চাইতেছে। ওরে দেইখ্যা আমার এক নিমেষে সাকিনারে স্মরণ হইল। ঠিক যেন সেই সবুজ চুড়ি পড়া হাত দুখান ঘুরায় ঘুরায় দ্যে দ্যে করতাছে। কিন্তু এমন গা ভর্তি গহনা পড়া বাচ্চাডা আইল কুতথিকা? হায় আল্লা! হেইডা দুগ্গা নয় তো!! আমি কি স্বপন দেখতাছি!! চোখ ডইললাম বার কতক। ও বেটি দেখি তহন ও খাড়ায়ে খাড়ায়ে দ্যে দ্যে করে আঙ্গুল দেখাইতেছে আমার ঠেলার দিকে। আমার ঠেলায় আপেল আছে, পানিফল আছে, আর আছে কিছু চেরি , কাজু , কিসমিস, খেজুর। বললাম, “ কি চাও! কি নেবা?” মাইয়া দেখি হাসে। দুটো মাত্তর দাঁত। আমার সাকিনার মতই। এটা ওটা দেখাইতে লাগলাম। চেরির বয়াম টা খোলা মাত্তর সে আবার দ্যে দ্যে করতি লাগলো। বুঝলাম, চেরি চাই তার। লাল রং টা মনে ধরসে হয়তো। শিশু রা যে কোনো সুন্দর রং দেখলে তাতে ভুলা যায়। সাকিনারে যদি সেদিন খান কতক লাল চুড়ি কিনা দিতে পারতাম!

দীর্ঘনিঃস্বাস টুকু ছাড়নের আগে সামনের সেই পুজো বাড়িটা থেকে হল্লা শুনতে পাইলাম। ঢাকের আওয়াজ থেমে গিয়া কান্নার আওয়াজ আসছে অস্পষ্ট। আমি দৌড়ে গেলাম। ও বেটি কে দুটো চেরি দিয়ে ওখানেই খাড়াইয়া রাখছি। আশপাশে এহন কেউ নাই। বাচ্চা চুরি যাওনের ভয় নাই। বাড়ির সদর দরজা হাট করে খোলা। ভেতর হতে সব লোক এদিকেই আসতাছে। জিজ্ঞেস করতে একজন কইল, “ একটা বাচ্চা কে দেখেছেন?? আমাদের মা দুর্গা, আজকের কুমারী পুজোর মা দুর্গা। পূজোর শেষে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”


আমি কিছু বুঝলাম, কিছু বুঝলাম না। তবে এটুকু বুঝলাম , সাকিনা কে আর হারিয়ে যেতে দেয়া যাব না। “ হ, দেখছি, আসেন আমার সাথে।”বলে দৌড়ে গিয়ে বাচ্চাটারে কোলে তুলে নিলাম। সে তহন পরমানন্দে চেরি খাইতেছে চুঈশ্যা চুইশ্যা। কিন্তু তার পরেই ভয়ে আমার বুক শুকায়ে গেল। আমি মুছলিম। ওদের দুগ্গা কে চেরি খাইতে দিয়াছি। এরা আমারে আস্ত রাখলে হয়! বাচ্চাডা র বাপের কোলে ওরে তুইলা দিতে উনি আমার দিকে চাইয়া রইলেন একদৃষ্টে। । আমি ঘাবড়ে গিয়া কইলাম, “আমারে ছাইড়া দ্যান। আমি কিছু করি নাই”। উনি কইলেন, “কর নি বলেই তো, আমার মেয়ে টা কে আমার কোলে ফিরিয়ে দিয়েছো বলেই তো….তোমার এই উপকার আমি সারাজীবনেও ভুলব না ভাই।”বলেই আমার হাত দুটা চিপ্যা ধরলেন। তারপর আমারে জড়ায়ে নিয়া  উনি এহন বাড়ির ভেতরে যাইতেছেন। এহন থেকে টানা এই কদিন নাকি আমি এই বাড়ির পেসাদ খাবো। এই বাড়ির কর্তা কইছেন, ওনাদের পূজা করা কুমারী কে আমি রক্ষা করছি, তাই আমি নাকি স্বয়ং গিরিরাজ হিমালয়। কে হিমালয়? আমি চিনি না। হিমালয় তো পাহাড় ছিল, বাপজান কইত “ফজল একদিন আমি আর তুই হিমালয়ে যাবো। ওখানে নাকি বরফ আর বরফ।” তা আমি হিমালয় হব ক্যাম্নে?? পাশে খাড়ায়ে অগো পন্ডিত মশাই, কি যেন কয় উনারে, পুরুত না কি … উনি কইলেন “ বাবা, ভয় পাচ্ছ কেন? তন্ত্রসারে বলেছে, – কুমারী ভোজিতা যেন ত্রৈলোক্যঙ তেন ভোজিতম। অর্থাৎ যিনি কুমারীকে ভোজন করান তাঁর দ্বারা ত্রিলোকেরই তৃপ্তি হয়। তুমি আমাদের ত্রিধামূর্তি কে ভোজন করিয়ে ত্রিলোকের তৃপ্তি সাধন করেছ।” বুইজলাম বেটির নাম ত্রিধামূর্তি। কইলাম, “ কি কঠিন নাম রাখছেন কর্তা, তিধা….” । পুরুত মশাই হেসে কইলেন , “ তিন বছর বয়স্কা কুমারী কে ত্রিধামূর্তি বলে, এক বছরের কন্যা কে বলে সন্ধ্যা, দুই বছরের কন্যা কে বলে সরস্বতী।” আমার সব গুলায়ে যাইতেছিল।  আমি সব ঘটনা শুনেও তেমন কিছু বুঝি নাই , আর এসব ভারী কথা শুইন্যা তো আরোই কিস্যু বুঝি নাই। শুধু এই টুহান বুইঝলাম, ও দুগগি বেটি, তুই তো ভারী দুস্টু! অন্যের বাসায় এসে পূজা পাইচস তাও তোর পেট ভরে নাই! এই মুছলমান ডা যে তর মুখ দেখে না, তুই তার কাছে গিয়া চেরি চেয়া খাস! আমি আজ বুঝেছি, হয়তো আল্লাও চান, আমি তোরে যা তা কথা না কই। না হইলে কি আর তর মধ্যে আমারে সাকিনারে দেখায় আল্লা!! আসলে যা কিছু আঁধার আছে তা আমাদের হেই পরানডার ভিতর। আল্লারেই ধরেন আর দুগগি বেটিরেই ধরেন, ইবাদত আর পূজা কি আলাদা? ডাকত্যচি তো হেই পরম শক্তিমানরেই। বাপজানের গাওয়া গান টা হঠাৎ মনে পইড়া গেল “একি দুগগি দেখলাম চাচা!”

©দেবলীনা সাহা রায়


**সমাপ্ত***


পুনশ্চঃ – এই ভাষা টি আমার বা আমার পরিবারের কারোরই কথ্য ভাষা নয়। তবু এই ভাষাটি আমার  অত্যন্ত প্রিয়। যখনই এই ভাষায় কথোপকথন শুনি, শব্দ গুলো তৎক্ষণাৎ মগজস্থ করার চেষ্টা করি। এই গল্পটি সেই ভালোবাসা ও প্রচেষ্টার ই মিলিত প্রয়াস। ভাষা সংমিশ্রণে ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমা প্রার্থনীয়।


				
আপনার রেটিং দিন:
[Total: 4 Average: 4.5]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



  • Niloy October 7, 2018 at 5:08 pm

    দারুন। এভাবেই তুলে ধোর বাংলার ঐতিহ্য কে আগামী দিনে। ধন্যবাদ

  • প্রসূন রঞ্জন দাসগুপ্ত
    Prasun Ranjan Dasgupta October 8, 2018 at 12:46 pm

    অসাধারন

  • Ronny September 8, 2020 at 7:46 am

    I don’t ordinarily comment but I gotta state thanks for the post on this perfect one
    :D.

    Also visit my blog post … download – https://pbase.com

  • Alta September 8, 2020 at 9:53 am

    I was just looking for this info for a while.
    After 6 hours of continuous Googleing, finally I got it
    in your website. I wonder what is the lack of Google strategy that do not rank this type of informative web sites in top of
    the list. Usually the top sites are full of garbage.

    Also visit my blog post :: download (pedicure.com)

  • Felix September 8, 2020 at 7:39 pm

    I believe you have remarked some very interesting points, appreciate it for the post.

    my web blog … download (https://pbase.com/topics/redmagic32/selling_your_used_books_at_a)

  • নতুন প্রকাশিত