বিলিতি টিফিনবাটি

প্রসূন রঞ্জন দাসগুপ্ত
4 রেটিং
1176 পাঠক

আজ পকাইএর খুব আনন্দ, নতুন স্কুলে তার নতুন বন্ধু হয়েছে, তাও একসঙ্গে ৫ জন। গত এক মাস ধরে পকাইএর মন খারাপ, আগের স্কুলে তার কত বন্ধু ছিল সবার সাথে কত মজা করত, স্কুলের মধ্যে, যাওয়া-আসার সময়, ছুটিতে, ক্লাস ফোরে খুব ভাল রেজাল্ট করলো পকাই, বাড়ির সবাই কত খুশি হয়েছিল মাঝখান থেকে কি এমন হল তার মা বাপির সাথে কথা বলে তাকে নিয়ে এই কলকাতায় চলে এল এবং তাকে এই কঠিন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি করে দিলো। পকাই শুনেছে তার মা এর অনুরোধে তার দাদু ওনার কোন বড় পুলিশ অফিসার বন্ধুকে বলে পকাই কে এই স্কুলে ভর্তি করেছে, নাহলে যে কেউ এই স্কুলে ভর্তি হতে পারে না, পকাই এর বাবাও পুলিশ আর মা কলকাতার সরকারী হাসপাতালে নার্স এবং পকাই এর দাদু ওনার বস, তাই ওনার আদেশ শিরোধার্য করে সবাই মিলে কলকাতায় এসে পকাই কে এই স্কুলে ভর্তি করান। এই স্কুলে বেসিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীরাই ক্লাস 1 থেকে পরে, তাদের সাথে পকাই ক্লাস ৫ এ এসে ঠিক মানিয়ে নিতে পারছিল না, আর স্কুলের স্যাররাও কেমন যেন, সবসময় গম্ভীর কেউ হাসেন না, ক্লাসে কোন গল্পও বলেন না, পকাই এর সহপাঠী রাও তেমনই সবাই যেন কেমন মেপে কথা বলে এবং পুরো ইংলিশ এ, পকাই ঠিক মানিয়ে নিতে পারছিল না। পকাইয়ের আগের স্কুলও ইংলিশ মিডিয়ামই ছিল কিন্তু বন্ধুরা ও স্যার-ম্যাডাম রা গল্প টা বাংলায় করত। ইংলিশে আবার গল্প হয় নাকি?

এই তো সেদিন পকাই ওর নতুন টিফিনবক্সে করে ডিম-পাউরুটি নিয়ে গেছিলো, এই বক্সটা এই স্কুল থেকেই বাপি কিনে দিয়েছে, সবাইকেই কিনতে হয় বাইরের কোন বক্স চলবে না। কোন এক বিলেতি কম্পানির তৈরি এতে নাকি “ফুড কোয়ালিটি” ঠিক থাকে, আর কি সুন্দর দেখতে, দেখলে এমনিই খেতে ইচ্ছে করে। অভ্যাসবসত পকাই বেশ কয়েকজনকে খাবার সাধল, কেউ নিল না,  আগের স্কুল হলে ওর টিফিন খোলার আগে বন্ধুরা ঝাঁপিয়ে পরত, পকাইও সবার থেকে খেত তাও তখন ওর স্টিলের টিফিনবাটি ছিল, এই বাক্স টা দেখলে তো হয়ত এটাই খেয়ে ফেলত, দুঃখে পকাই কেঁদেই ফেলল। এই দেখে আবার আশেপাশের কয়েকজন আবার মন্তব্য করলো “লুক লুক দ্যাট নিউ বয় ইস ক্রাইং লাইক আ বেবী “ এই শুনে পকাই খানিকটা লজ্জা পেয়ে শেষ বেঞ্চের কোনায় গিয়ে বসে সেদিনটা কাটিয়ে দিলো।

স্কুলের পর পড়া ছিল, রাতে বাড়ি ফিরে দেখে আরেক বিপদ, বসার ঘরে মা গম্ভীর মুখে বসে আছে, বাবা পায়চারী করছে, ও ঢুকতেই মা বলল বসো, পকাই জানে মা তুমি করে বলছে মানেই সমস্যা, মা বলল “তুমি আজ স্কুলে গিয়ে কান্নাকাটি করছিলে ? তার পর আবার লাস্ট বেঞ্চে বাজে ছেলেদের সাথে গিয়ে চোরের মত বসেছিলে?”। পকাই অবাক মা এতসব জানলো কোথা থেকে ! মা বলেই যাচ্ছে “ আজ কমপ্লেক্সে একটা পার্টি ছিল, সেখানে গিয়ে আমার আর তোমার বাবার তো লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার জোগাড়, সুস্মিতা বলল “তোমার ছেলে কি বাড়িতে abused হয়” হ্যাঁ রে, তোর জন্য নিজের বাড়ি ছেড়ে ফ্ল্যাটে এলাম, এতটাকা খরচ করে এই স্কুলে ভর্তি করালাম , রোজ সকালে হসপিটালে যাওয়ার আগে তোর জন্য ভাল টিফিন বানাই, এতগুলো টাকা দিয়ে মাস্টার রেখেছি, আর তুই আমাদের সম্মান নিয়ে টানাটানি করিস? আরেকদিন যদি হয়েছে তবে তোর একদিন কি আমার একদিন”। বাবা বলল থাক পকাই রাত হয়েছে খেয়ে শুতে যাও, পকাই বুঝল নতুন স্কুলে তার কাঁদারও অধিকার নেই।

এইভাবে মাসখানেক কেটে গেল, পকাই চুপচাপ স্কুলে আসে, ক্লাস করে, নিজের বাক্স খুলে টিফিন খায় বাড়ি ফিরে যায়, খালি নতুন টিফিনবক্সটা ওর খুব প্রিয়, ও ভাবে নতুন স্কুলে এই বক্সটাই ওর নতুন বন্ধু। এরমধ্যে ও লক্ষ্য করেছে ওর ক্লাসে শেষের দিকে কয়েকজন ছেলে মেয়ে আছে তারা যেন কিছুটা আলাদা বাকিদের থেকে, কেমনভাবে পোশাক পড়ে, কথাবার্তাও অন্যরকম খানিকটা যেন পকাইএর আগের স্কুলের মত। তবে বাকিদের থেকে শুনেছে যে ওরা নাকি বাকিদের মত অ্যাডমিশন টেস্ট ও ফিস দিয়ে ঢোকেনি চার্চের বিশেষ উদ্যোগে ওদের নেওয়া হয়, কেউ কথা বলেনা ওদের সাথে। পকাই ও এখন শেষের দিকেই বসে, ওই ছেলেমেয়েরা সেটা লক্ষ্য করেছে, দুএকবার পকাই এর সাথে কথা বলতে এসেছিল, তবে পকাই ভয়ে কথা বলেনি, আবার যদি মা এটা জানতে পেরে বকাবকি করে। সেদিন খেতে গিয়ে পকাই একটা খুব চেনা গন্ধ পেল, কুলের আচারের গন্ধ, দিদা বানাতেন, পকাইয়ের খুব প্রিয় ছিল, গত শীতকালের পর পকাই এখনও খায়নি, পকাই দেখল ওই ছেলে মেয়েদের একজন এই আচার নিয়ে এসেছে আর ওরা সবাই মিলে খাচ্ছে , পকাই কেমন হ্যাংলার মত ওদের দিকে তাকিয়ে রইল, একজন সেটা লক্ষ্য করলো আর বলল “কিরে বড়লোকের ছেলে আচার খাবি? “ পকাই সম্মোহিতের মত হ্যাঁ বলতেই বলল “তাহলে দাঁড়িয়ে কেন রে চলে আয়, বেশিক্ষন থাকবে না কিন্তু, মন্টুর বাপ হেব্বি আচার বানায়”। সত্যিই আচার টা দারুন খেতে, পকাই এর দিদাও এত ভাল আচার বানায় না, কথায় কথায় জানতে পারলো, মন্টু অর্থাৎ মনতোষ গোমস এর বাবা বিভিন্ন মেলায় বাঙালি খাবারের স্টল দেন, তাই মন্টু ওদের দলের মধ্যমনি, শুধু টিফিনের জন্য, আর বাকিরা হল দেব্লীনা (উচ্চারণ টা এরকমই) বর্মণ, পিটার সুভাষ, এথিনা হেম্ব্রম ও কমল মিটার ও দলের নতুন সদস্য হল পকাই অর্থাৎ শুভাশিস ভাদুরি। পকাই  দেখল এরা সবাই আচার-ব্যবহারে খানিকটা আলাদা হলেও আসলে খুবই ভালো, ওর আগের স্কুলের বন্ধুদের মতই এরা মন খুলে গল্প করে, টিফিন ভাগ করে খায়, তো পকাই ও নিজের টিফিন বের করলো, ওর নতুন বন্ধুদের সবারই সাধারন টিফিনবক্স , পকাইএর বাক্স দেখে সবাই উল্টে পাল্টে দেখতে লাগলো, সুভাষ বলল “এটার কত দাম হবে রে?”, পকাই বলল “আমি কি জানি? বাবা কিনে দিয়েছে”। এথিনা বলল “ওরে সুভাষ এটার দাম অনেক! আমি জানি, তোর থেকেও দাম বেশি হবে”। এই শুনে সবাই হেসে উঠলো।

এভাবে কয়েকমাস কেটে গেল, এরমধ্যে পকাই ওর অল্প বুদ্ধিতে বুঝতে পেরেছে যে এরা সকলেই গরিব পরিবারের থেকে এসেছে, স্কুলের কোন বিশেষ স্কিমের মাধ্যমে,কিন্তু মনের দিক দিয়ে এদের মত বন্ধু হয় না, পকাই যেন আগের স্কুলের দুঃখ প্রায় ভুলেই গেল। একটা জিনিস কমন ছিল রোজ একসাথে খাওয়া ও পকাই এর টিফিনবক্স নিয়ে ওদের একে অপরকে খ্যাপানো। এর মধ্যে পকাই আবার একদিন বাড়িতে খুব বকা খেল, সুস্মিতা আনটি মেয়ে সাহানাকে নিয়ে ওদের বাড়ি বেড়াতে এসেছেন, যে কিনা পকাইএরই ক্লাসে পড়ে, সে পকাইয়ের মাকে বলে দিলো পকাই এর নতুন বন্ধু দের কথা, ব্যাস মা আবার রেগে গেলেন , পকাইকে প্রচণ্ড বকলেন, এবং বললেন “কাদের সাথে মিশতে হয় সেটা কি সেখাতে হবে তোমায়? সাহানা বোঝে কাদের সাথে মিশতে নেই আর তুমি জান না? হ্যাঁরে একক্লাস ছেলেমেয়ের মধ্যে কি তুই ওই ছ্যাঁচোর গুলোকেই পেলি বন্ধুত্ব করার জন্য, কোনদিন দেখব তোর সব জিনিস চুরি হয়ে গেছে। শেষবারের মত বলে দিচ্ছি আর মিশবি বা ওদের সাথে, আর মা সাহানা, মা তুই একটু দেখবি তো শুভাশিস যেন আর না মেশে ওদের সাথে আর যদি দেখিস সাথে সাথে আমায় জানাবি, তাহলে মেরে ওর ঠ্যাং ভেঙ্গে দেব“

পকাই আবার ভয়ে ভয়ে বন্ধুদের থেকে আলাদাই বসে , খালি টিফিনের সময় সবাই মিলে কোন এক কোনায় বসে খায় ও মজা করে। এরমধ্যে একদিন কমল আর দেব্লীনা এসে ওকে বলল “শুভাশিস তোর টিফিনবাটিটা একদিনের জন্য দিবি, আর তুই তো পকেটমানি পাস, সেখান থেকে কিছু টাকা ?” পকাই অবাক হয়ে বলল “কেন রে?” ওরা বলল পরের সপ্তাহে মন্টুর জন্মদিন, ও সবাইকে সারাবছর খাওয়ায় তাই সবাই ঠিক করেছে সবাই টাকা তুলে মন্টুকে পকাইএর মত একটা টিফিনবাটি উপহার দেবে, পকাই খুশি মনেই বন্ধুদের ওর বাটি আর পকেটমানি থেকে ৫০ টাকা দিয়ে দিলো। যাওয়ার আগে বন্ধুরা প্রমিস করিয়ে নিলো যে পকাই এই ব্যপারটা কাউকে বলতে পারবে না, বাড়িতেও না।

পকাই স্কুলের পর টিউশন পড়ে এসে রাতে কিছুক্ষন টিভি দেখে ঘুমিয়ে পড়লো। সকালে তখনো পকাইয়ের ঠিক করে ঘুম ভাঙ্গেনি, ওর মা এসে কাঁধ ধরে ঝাকাতে ঝাকাতে তুলে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো “কিরে টিফিনবক্সটা কোথায় হারিয়েছিস ?” পকাই খানিকক্ষণ কিছু বুঝতেই পারলো না, কারপর যখন প্রমিসের কথা মনে পড়লো তখন বলল “জানি না”,  মা ওকে আরেক ঝাঁকুনি দিয়ে বলল “তা জানবে কেন, পয়সা তো আর রোজগার করতে হয় না, জানা আছে ওটার দাম কত? আমার হসপিটালে একটা ডেলিভারিতে অত খরচ হয় না, দেখি সুস্মিতা কে ফোন করে” ব্যস যা ভয় ছিল তাই হল, সাহানা জানাল, কমলের হাতে ওই টিফিনবক্সটা ও দেখেছে ছুটির সময়, ব্যস আবার ওর মা চেঁচিয়ে উঠলো, “জানতাম ওগুলো একদিন তোর জিনিস চুরি করবেই? দেখলি তো, খুব তো বন্ধু বলতিস, তোর বাবাকে বলে ওকে আমি পুলিশে দেব”। ভয় পেয়ে পকাই সব ঘটনা বলল, এবং বলল আজই ও টিফিনবক্সটা নিয়ে আসবে। মা শুধু বলল “আদিখ্যেতা”।

স্কুলে গিয়ে পকাই দেখল ওর বন্ধুরা মন্ মরা হয়ে বসে আছে কারন কাল ওরা ২০০ টাকা নিয়ে টিফিন বাটি টা কিনতে গিয়েছিল স্কুলের কাউন্টারে, ওখানথেকে ওদের ভাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। পকাই বলল” চিন্তা করিস না স্কুলের পেছনে মেলা হচ্ছে ওখান থেকে কিনে আনবো, আর বাটি যাই হোক সেটা তো আর আমরা খাবো না , টিফিন টা খাবো”। আর মনে মনে ভাবল সত্যিই যে টিফিনবাটির দাম ওর থেকে মানে একটা মানুষের থেকে বেশি সেটা কি আর ওদের মত ছোটদের পক্ষে কেনা সম্ভব।

©- প্রসূন রঞ্জন দাশগুপ্ত

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 4 Average: 4]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



  • Tamal Ghosh March 21, 2019 at 6:06 pm

    Khasa

  • Bikram March 27, 2019 at 9:33 am

    Khub bhalo

  • নতুন প্রকাশিত