ঝড়ের সৈনিক

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়
5 রেটিং
97 পাঠক
রেটিং দিন
[মোট : 1 , গড়ে : 5]

পাঠকদের পছন্দ

ঝড়ের সৈনিক

গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়

(হাজারো রঙ্গে ভরা হালের রাজনীতির রঙ্গমঞ্চ থেকে কবেই বিদায় নিয়েছে আদর্শ, নীতি, মূল্যবোধ। মানুষের দল নয়, দলের মানুষগুলোই একচেটিয়া দখল নিয়েছে আজ রাজনীতির। মানুষের শুভবুদ্ধির কাছে রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা আজ তলানিতে এসে পৌঁছেছে। প্রশ্নচিহ্নের মুখে রাজনৈতিক দায়বদ্ধতাও। তাই তো রাজনীতির আকাশ আজ অবক্ষয়ের কালো ধোঁয়ায় ক্রমেই আরো নিবিড় হয়ে আসছে দুঃসহ অন্ধকারে। তবু মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ আজো সততার, নৈতিকতার ঘুম ভাঙিয়ে সত্যিসত্যি মানুষের জন্য কিছু করতে চায়। চারপাশে এত অন্ধকার! পদেপদে পথভ্রষ্ট হবার আশঙ্কা! ছড়িয়ে ছিটিয়ে চতুর্দিকে বিপথগামিতার অজস্র চোরাবালি! কোথায় তারা খুঁজে পাবে তাদের পথের দিশা? তবু আশাবাদী মানুষ ওদের ঘিরেই বুক বাঁধে — খুঁজে পেলে একমাত্র ওরাই খুঁজে পাবে কোনো একদিন, কারণ ওরাই যে ঝড়ের সৈনিক।)

(এক)

কোমরের ব্যথাটা খুব বেড়েছে প্রতিমাদেবীর। খুব কষ্ট হচ্ছে উঠতেবসতে। তবুও দুহাতে ভর দিয়ে কোনক্রমে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ছেলেকে শুধালেন ,”এত সকালসকাল কোথায় বের হচ্ছিস বাবলু?”

“পার্টি অফিসে। কর্মীসভা আছে।”
বছর বাইশের বাবলু আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে উত্তর দিল।

— কটা থেকে সভা?

— দশটা।

কী একটা ভাবতে ভাবতে মাথা ঝাঁকালেন প্রতিমাদেবী। খানিকটা সময় নিয়ে তারপর একটু ইতস্তত করে তার আবারো প্রশ্ন,”যেতেই হবে, নারে?”

মা যেন আজব কিছু একটা বলেছে — এমনভাবেই রিঅ্যাক্ট করে ছেলে বলে উঠলো,” কী বলছো তুমি, যেতে হবে না? এটা একটা ভাইটাল মিটিং। ব্লক সভাপতি আসছেন। জেলানেতৃত্বেরও দুএকজন আসতে পারে।

এধরনের কথাগুলো ভীষণভাবে চেনা প্রতিমাদেবীর কাছে। বাবলুর বাবাও খুব বলতো। বাবলুর মতই রাজনীতি-পাগল মানুষ ছিল কিনা!

—- ঘরে কিচ্ছুটি নেই। যদি একটু বাজারটা ঘুরে আসতিস।

—- এখন এসব করার সময় আছে আমার? ইলেকশনের আর ক’দিন বাকি আছে? সামনেই নমিনেশন জমা দেওয়ার পর্ব। তারপর পথসভা। বাড়িবাড়ি গিয়ে প্রচার। কী সাঙ্ঘাতিক চাপের মধ্যে যে আছি আমরা —- তা’ বোধহয় বলে কাউকে বোঝাবার নয়। অপোনেন্ট ক্যান্ডিডেট এবার খুব স্ট্রং।

মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। তারপর যদিও জানেন অনর্থক, তবুও কী এক অকারণ বাধ্যবাধকতা থেকেই বললেন, “আরো তো অনেকে আছে, তুই না হয় একটু পরেই গেলি….”

—- তুমি কি এটাকে একটা ছেলেখেলা ভাবো?

—- আমি কিছুই ভাবছি না বাবা। বিয়ের আগে বাবাকে রাজনীতি করতে দেখেছি, বিয়ের পর স্বামীকে, আর এখন তোকে। কখনোই নিজেকে রাজনীতির সাথে জড়াই নি, ইচ্ছাও ছিল না, কিন্তু তা’ বলে রাজনীতির ঝড়ঝাপটা কি আমাকে একেবারেই ছুঁয়ে যায় নি? তাই তো বলছি, রাজনীতি জিনিসটা যে আসলে কী — কিছুটা হলেও আমি আন্দাজ করতে পারি বই কী!

চিরুনিটা সস্থানে রাখতে রাখতে বাবলু বললো,”ওইটুকু থেকে রাজনীতিকে কিছু বোঝা যায় না মা।”

—- বুঝতে চাই কে বললো তোকে, বুঝতে তো কোনোদিন চাই নি আমি! পরেরপর রাজনীতিওয়ালারা এসেছে আমার জীবনে — সেই জীবনের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত, কিন্তু এতখানি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার পরও রাজনীতিকে এতটুকুও বুঝতে চাওয়ার তাগিদ আগেও যেমন নিজের মধ্যে কোনোদিন অনুভব করিনি, আজো তেমনি করি না।

—- এটা তোমার একান্তই নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার মা।

—- রাজনীতি আমার কাছে শুধুই পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার নয়, অনেকক্ষেত্রেই সেটা দুর্বিষহ।

—- সেটাই তো স্বাভাবিক। দাদু পাগল হয়ে গিয়েছিল। বাবা খুন হয়েছিল প্রকাশ্য দিবালোকে। আর এখন তো সবসময় আমাকে নিয়ে সন্ত্রস্ত থাক। অজানা একটা আতঙ্কে কাঁটা হয়ে আছো প্রতিটা মুহূর্ত। আমি সবকিছুই অনুমান করতে পারি মা।

—- এতখানিই যখন পারিস, তখন এই মায়ের কথাটা চিন্তা করে রাজনীতিতে না এলে এমন কী আর ক্ষতি হতো?

—- লাভক্ষতির হিসাব কষে সবাই কি রাজনীতিতে আসে?

—- আমার প্রশ্নটা তোর রাজনীতিতে এসে লাভ ক্ষতির হিসাব কষা নিয়ে নয়, তোর রাজনীতিতে আসাটা নিয়েই। আর সত্যি কথা বলতে কী, তুই হিসেব কষলি কী, না কষলি — তাতে কী এসে যায়? খোঁজ নিয়ে দেখ তোর দলের অনেকেই চুলচেরা ওই হিসেব কষেই দলে মাথা গলিয়েছে। কারণ কামিয়ে নিতে, গুছিয়ে নিতে গেলে ওই হিসেবটা না কষে আর কোনো গত্যন্তর নেই।

বাবলুর শিরা-উপশিরায় একটা একরোখা উষ্ণতা চকিতে চিড়িক মেরে গেল। মায়ের চোখে সরাসরি চোখ রেখে বললো,”ওদের দলে আমি পড়ি না মা।”

—- সে তো আমি ভালোমতই জানি। তুই তো ওই বাপেরই ছেলে, মরে গেলেও ওকম্ম তোর দ্বারা হবে না। কিন্তু এটাও তো ঠিক, তুই তো ওই দলেরই একজন। এতো ধরি তো মাছ না ছুঁই পানি! বিশ্বাস করি, তুই তোর আদর্শে সৎ, খাঁটি — সেখানে আমার বিন্দুমাত্র সংশয়ও নেই, কিন্তু তোর দলে কোথায় সেই আদর্শ? সে তো কবেই নিপাত গেছে। এখনো টিমটিম করে যতটুকু টিকে আছে তা’ ওই দলের বিজ্ঞাপনে ‘কখনোই না-মানা’ হলফনামায় কতকগুলো নিষ্প্রাণ শব্দগুচ্ছ হয়ে মাত্র।

মায়ের কথায় বাবলুর বেবাক ভিতরটা ঝনঝন করে বেজে উঠলো। আর ঠিক তখনি …টিক… টিক… টিক….দেওয়াল ঘড়িটার পিছন থেকে ঘাপটি মেরে থাকা একটা টিকটিকি হঠাৎ করেই ডেকে উঠলো।

যা প্রতিমাদেবী কানে শোনামাত্রই, সংস্কারবসেই বিছানায় আঙ্গুল দিয়ে টুসকি মেরে বলে উঠলেন,”ঠিক, ঠিক, ঠিক।”

বাবলুর দৃষ্টিও আকর্ষিত হলো ঘড়ির দিকে। দশটা বাজতে চলল প্রায়। ভাবনায় মায়ের কথাগুলো খচখচ করেই চললো। তবুও সভায় পৌঁছুতে দেরি হয়ে যেতে পারে — এই বিবেচনায় ঘরের বাইরে পা বাড়ালো।

(দুই)

জমে গেছে ভোটযুদ্ধ। সামনের তিন চার দিনের মধ্যেই মনোনয়নপত্র জমা দেবে বিভিন্ন দল। পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে তোড়জোড়। আজকের এই কর্মীসভা ডাকার পেছনে যে উদ্দেশ্য, সেটাও আর কিছুই নয় — সবাই মিলে আলোচনা করে আসন্ন ভোটকেন্দ্রিক বৃহত্তর কর্মযজ্ঞের একটা সুষ্ঠ এবং সংগঠিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। ইতিমধ্যেই সবদলই প্রায় প্রার্থী নির্বাচনপর্বটি সেরে ফেলেছে। পাবলিকের মধ্যে সেটা চাউর হতেও সময় লাগে নি। বাবলুদের আজকের এই সভায় দলের যিনি ভাবীপ্রার্থী তিনি নিজেও উপস্থিত থাকবেন। উপস্থিত থাকবেন ব্লক এবং জেলাস্তরের বেশ কয়েকজন বড়সড় নেতাও। তা ছাড়া দলের পক্ষ থেকে সদ্য যে ইস্তাহার প্রকাশ করা হয়েছে তা’ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করার কথা আছে। কথায়কথায় বিশ্বজিৎ দু-তিনদিন আগে বলেছিল, দলের অন্দরে একটা চাপা গুঞ্জন খুব ভেসে বেড়াচ্ছে —- প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে খোদ দলের মধ্যেই নাকি তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

দলের সহকর্মীদের মধ্যে বিশ্বজিতের সাথেই বাবলুর সবচেয়ে বেশি মনের মিল। দুজন দুজনের কাছে অনেকখানি বিশ্বস্ত। তাই অন্তরঙ্গতাও বেশি। সেদিন সভা শুরু হওয়ার আগে বিশ্বজিৎ আলাদা করে বাবলুকে একটু আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়ে নিচুগলায় বলেছিল, “তোকে কতকগুলো খবর দেওয়ার আছে। প্রার্থী বাছাই নিয়ে ভিতরে ভিতরে বেশ বড়সড়ই একটা ঘাপলা হয়েছে। দলের প্রভাবশালী অংশের, যাদের স্বজনপোষণের বিস্তর অভিযোগ এখন দলের গা-সহা হয়ে গিয়েছে, তাদের প্রচ্ছন্ন মদতেই একাজটা হয়েছে। এবার যাকে প্রার্থী করা হচ্ছে তাকে যেমন একেবারে গ্রাসরুট লেবেল থেকে লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা পোড়খাওয়া কোনো নেতার মধ্যে রাখা যাবে না, তেমনি দলের নৈমিত্তিক কর্মকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত মূলস্রোতের কোনো জনপ্রিয়, লড়াকু নেতা হিসাবে অভিহিত করাও কোনভাবে সম্ভব নয়।

বিশ্বজিৎ আরো বলেছিল, ” তুই বল না, ওই লোকটা আবার নেতা হলো কবে থেকে?”

বাবলু অবাক চোখে তাকিয়েছিল বিশ্বজিতের মুখের দিকে।

বিশ্বজিৎ না থেমে বলে গিয়েছিল, “ও তো দলে উড়ে এসে জুড়ে বসা পাবলিক। আদতে বিজনেসম্যান। গোটা ভারতের নানান প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেকগুলো ব্যাবসা। লোকটা একেবারে বাপ কা ব্যাটা! ওর বাবাও পাক্কা ধান্ধাবাজের মতই ব্যবসার স্বার্থে একসময়ে দলীয় রাজনীতিতে হাতেখড়ি নিয়েছিল এবং অত্যন্ত করিৎকর্মার মতই অতি কমসময়ের মধ্যে দলের অন্যতম একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারে নি। হঠাৎকরেই একগাদা অনিয়ম আর দুর্নীতিতে ফেঁসে গিয়েছিল। এতটাই যে দলকে বাধ্য হয়েই তাকে বহিষ্কার করতে হয়েছিল। সেই সময়ে এই ঘটনা নিয়ে বিস্তর বাজার গরম করেছিল মিডিয়াগুলো। রাজ্য-রাজনীতিতে একেবারে হুলুস্থুল বাঁধিয়ে ছেড়েছিল। তারপর যাহোক, সময়ের নিয়মেই সব কিছু ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল একসময়ে। দলের রাজনীতির ফোরফ্রন্টে ওই লোকটাকে আর তেমনভাবে কোনোদিনই দেখা যায় নি। কিন্তু দেখা না গেলেও গোপনে গোপনে দলের ভিতরে তার সক্রিয়তা সমানভাবেই অটুট ছিল এবং এখনো আছে। শুধু তাই নয়, শোনা যায় দলের ওপর এখনো তার এতটাই নিয়ন্ত্রণ যে দলের সো-কলড হেভিওয়েট নেতাদেরও ক্ষমতা নেই তার কথার এতটুকু নড়চড় করে। কথাটা যে মিথ্যা নয়, তার প্রমাণ তো হাতের কাছেই রয়েছে, সত্যি কী দলের মধ্যে প্রার্থী হবার মত উপযুক্ত আর কেউ ছিল না, যে ওই লোকটার ছেলেকেই প্রার্থী করতে হলো? আসল খেলাটা যে ঠিক কোথায় — দলের বাইরে তো বটেই, দলের ভিতরেও অনেকের পক্ষেই তা’ তিলার্ধমাত্র বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। বুঝতে দেওয়াটাও বোধহয় দলের কাম্য নয়! তবে এনিয়ে দলের একশ্রেণীর নেতাকর্মীদের অভিমত হলো — আজকের দিনে দল চালাতে অনেক পয়সা লাগে, এই ধরনের মানুষগুলোকে এন্ট্রি দিয়ে নেতা বানাতে না পারলে পয়সাটা আসবে কোথা থেকে? আর যারা পয়সা ঢালবে তাদের একটু আধটু আবদার তো মেনে নিতেই হবে! পাল্টাপ্রশ্ন অনেকেরই, সত্যি কি দল চালাতে এত পয়সার প্রয়োজন হয় যে ন্যায়নীতি বিকিয়ে দিতে হবে, নাকি আসল সত্যিটা অন্যখানে — যারা বিকিয়ে দিয়েই বসে আছে পয়সার প্রয়োজন তাদেরই সবচেয়ে বেশি?”

এতদিন বাবলু দলে তার নিজের কাজটুকু মনপ্রাণ দিয়েই করে এসেছে। মেনে এসেছে দলের প্রতিটি নির্দেশ। কিন্তু এতসব ভেতরের খবর তার জানা ছিল না? তাগিদও ছিল না। অথচ এই দলটাকে ঘিরেই আছে কত আদর্শ, নীতি, দর্শন, ইতিহাস…কত মানুষের আত্মত্যাগ! বিশ্বজিৎ ঠিক বলছে তো? আসলে রাজনীতিটা তার কাছে সবসময়েই একটা আদর্শের প্রশ্ন, নীতির প্রশ্ন। তার পরিচ্ছন্ন ভাবনায় আজো পর্যন্ত কখনোই আঁচড় কাটতে পারে নি কামিয়ে নেওয়া,গুছিয়ে নেওয়ার মত ধান্ধাবাজি রাজনীতির এতটুকু দূষণও। তাই এসব যে সত্যি হতে পারে — এযেন সে ভাবতেও পারে না।

প্রশ্নটা মনে আসামাত্রই পত্রপাঠ করে বসলো বিশ্বজিৎকে,”তুই এতসব জানলি কী করে?”

—- জানতে চাইলেই জানা যায়। যদি আগের ঘটনারগুলোর কথাই বলিস তবে বলব, কত দিনেরই বা আর পুরোনো ঘটনা ওসব। সেই সময়কার মিডিয়ার দৌলতে আমাদের আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন অনেক মানুষের মনেই এখনো জ্বলজ্বল করছে সেই স্মৃতি যা একটু খোঁচা দিলেই গড়গড় করে উগড়ে দেবে। তবে দলের ভিতরে বড়বড় নেতাদের গোপন যোগসাজশে যে সমস্ত কুকীর্তিকলাপ গুলো সংগঠিত হয়েছিল সেগুলো তো আর তাদের জানার কথা নয়! সেই খবরের কিছুকিছু পেয়েছি দলের ভিতর থেকেই। তবে যেটুকু খবর পেয়েছি, পাই নি তার চেয়ে অনেক বেশি। অনেকে আরো অনেক কিছুই জানে বলেই আমার বিশ্বাস — ভয়ে বলে নি। চোখের সামনে অন্যায় দেখে প্রতিবাদ করব — তাতে কিসের যে এত ভয়? দল থেকে তাড়িয়ে দেবে? দিলে দেবে। যারা সৎভাবে রাজনীতি করে, তারা কি দল করে কখনো পেটের ভাত জুটিয়েছে? কিন্তু তবুও কেন ওদের একশ্রেণীর এত ভয় — ঠিক বুঝে উঠতে পারি না! …..

একটু দম নিতেই কিছুক্ষণ থামলো বিশ্বজিৎ। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবারো বললো, “তুই এতসব বুঝবি না বাবলু, বুঝলি! আসলে তুইতো রাজনীতিটা করিস সত্যিকারের সততা আর নিঃস্বার্থপরতার মূল্যবোধ থেকেই, তাই তোর কাছে কে কী করলো সেটা নয়, তোকে কি করতে হবে সেটাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমিও রাজনীতিটা সৎভাবেই করি কিন্তু কেন জানি এতটা করে উঠতে পারি না।”

—-সে না হয় হলো, কিন্তু যেখানে অন্যায় রাজত্ব করে, সেখানে তো কোনোদিনই ভালো কিছু হওয়া সম্ভব নয়। তাই ঘরেই হোক আর ঘরের বাইরেই হোক, ভালো কিছু যদি করতেই হয় তবে সবার আগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তাকে তো নির্মূল করতেই হবে।

—- কাজটা বোধহয় যতটা সহজ ভাবা যায় ততটা মোটেও নয়।

—- হতে পারে। তবে অসম্ভবও নয়। এটাও আবার ঠিক যে কাজটা কাপুরুষদের জন্যও নয়।

—- যাদের সাহস ছিল তারাও তো এগিয়ে আসে নি অনেকে। সনাতন কুন্ডু, নামটা শুনেছিস কোনোদিন?

—- উঁ..হু, এ নাম কোনোদিন শুনেছি বলে তো মনে করতে পারছি না!

—- মনে পড়বে না। দলের ইতিহাস থেকে এই নামটা অনেককাল আগেই ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন এই মানুষটাই তোর আমার মতই সবকিছু তুচ্ছ করে এই দলটার উপর গভীর আস্থায় আর বিশ্বাসে ভীষণভাবে নির্ভর করেছিল। আর সেই নির্ভরতা থেকেই নিশ্চিন্তে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল একটার পর একটা দুঃসাহসিক লড়াই-সংগ্রামে। না নিজের জন্য নয়, প্রতিটি মানুষের আপন খুশিতে বেঁচে ওঠার একটা নতুন ভোরের আলো দেখানোর জন্য। ওঁর স্বপ্ন সার্থক হয় নি। একরাশ হতাশায় ডুবে গিয়ে উপলব্ধি করেছিলেন, কোথাও যেন একটা তাল কেটে গেছে। বুকের দৃঢ়-অটল সংকল্প থেকে দূরে সরে গেছে অনেকেই। সামনের লক্ষ্য স্পর্শ করার সেই তীব্র সদিচ্ছার সবটুকুই যেন নিঃশেষিত। মুখথুবড়ে পড়েছিল সংগ্রাম-আন্দোলন। চুলচেরা আত্মসমীক্ষায় ব্যর্থতার কাটাছেঁড়া করতে গিয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন গোড়ায় গলদ। সত্যি তো, চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে কি আর আকাশ ধরা যায়?

—- তারপর?

—- তারপরের ঘটনাটা বড় মর্মান্তিক। স্বপ্নের রাজপ্রাসাদটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়েছিল তাসের ঘরের মত। বীতশ্রদ্ধ মানুষটা একবুক ধ্বংসস্তুপের নৈরাশ্য নিয়ে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন দলের সাথে। সিদ্ধান্তহীনতার সংকটে দিশেহারা হয়ে পাগলের মত এলোমেলো ঘুরে বেড়িয়েছেন পথে পথে, দিনের পর দিন। তারপর এই পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক উষ্ণতার মতই একটু একটু করে একদিন জুড়িয়ে গিয়েছিলেন। সনাতন কুন্ডু রাজনীতি থেকে সন্ন্যাস নিয়ে চারদেওয়ালের মধ্যেই আশ্রয় নিয়েছিলেন চিরকালের মত। এখন নিজের মধ্যেই ডুবে থাকেন সারাক্ষণ। ছোটদের আনন্দ দেওয়ার জন্য লেখালেখি করেন। কখনো আপন মনে ছবি আঁকেন। হয়তো এভাবেই সবকিছু ভুলে থেকে বেঁচে থাকতে চান।

বিশ্বজিতের মুখ থেকে কথাগুলো শুনতে শুনতেই খেয়াল করছিল বাবলু। একটু দূরেই একটার পর একটা নামিদামী ঝাঁ-চকচকে গাড়ি এসে দাঁড়াচ্ছে পার্টি অফিসের সামনে। কেতাদুরস্ত পোশাকে সজ্জিত হয়ে নেমে আসছেন দলের তেল-চিকচিকে, মেদবহুল সব তাবড়তাবড় নেতারা। ওদের দেখে আরেকদল নেতাকর্মী যেন ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না কীভাবে তাদের অভ্যর্থনা করবেন। উদভ্রান্তের মত ছুটোছুটি করছেন এদিকওদিক। কোথায় যেন মনে হচ্ছে, ওদের মধ্যে একটা চাপা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। সবাই চাইছে ওই হেভিওয়েটদের নজর কাড়তে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো সভা। প্রথাগত নিয়ম মেনে দুএক কথায় উদ্বোধনী ভাষণ। তারপর একএক করে শুরু হলো সমস্ত আমন্ত্রিত নেতাদের গা-গরম করা টানটান বক্তব্য। উদ্দেশ্য একটাই — এই নির্বাচনকালীন সময়ে সমস্ত দলীয় কর্মীদের চাঙ্গা করা। এবার স্বয়ং প্রার্থীর পালা। সভার পরিচালক তথা ঘোষক তাকে একগুচ্ছ বাছাবাছা বিশেষণে ভূষিত করলেন। জনদরদী। বিশিষ্ঠ সমাজসেবক। সততার প্রতিমূর্তি। দলের আদর্শপরায়ণ অনুগত সৈনিক। আরো কত সব! এসব শুনে গদগদ প্রার্থী মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়িয়ে যেন কৃতজ্ঞতায় বাঁচে না। তখন বিশ্বজিৎ বাবলুর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে ফিসফিস করে বললো,”বছর খানেক আগে ওই লোকটার অফিসেই কিন্তু ইনকাম-ট্যাক্স রেইড করেছিল আর অবাক হলেও সত্যি, এই ব্যাপারটা এখানে উপস্থিত কারোরই অজানা নয়।” সবশেষে এল ইস্তাহার। বাবলুর রাজনীতির জীবনে এমন উপলব্ধি যেন আজই প্রথম হলো — দলের ইস্তাহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোকে বড্ড অলীক, অবাস্তব মনে হলো। যেন এটা কোনো ইস্তাহার নয় জলজ্যান্ত মিথ্যাচার। সভা শেষ। এমন একটা সভা শেষ হলে আগে বাবলু নিজের মধ্যে কেমন যেন একটা উজ্জীবিত ভাব অনুভব করতো। আজ কিন্তু ব্যাপারটা অন্যরকম হলো। হঠাৎ কঠিন প্রশ্নে পরীক্ষাটা কেঁচে গেলে, পরীক্ষা শেষে নিজেকে যেমন একটা আশাহত নির্লিপ্ততা গ্রাস করে — ঠিক তেমনি একটা অনুভবে ঝিমিয়ে থাকলো। সম্মিলিত-কণ্ঠ স্লোগানে গমগমিয়ে উঠেছিল তখন। বাবলুর যেন হুঁশই নেই। তার নৈঃশব্দের আড়ালে অস্থির হয়ে উঠেছিল একরাশ প্রশ্ন। এত সব কিছু তার অজানা ছিল? যে দলের প্রতি তার আকাশচুম্বী আনুগত্য, তা’ কি সত্যিসত্যি কায়েমী স্বার্থের কাছে এভাবে বিকিয়ে গিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে? ক্রমেই কি আলগা হয়ে আসছে তার সত্য আর আদর্শের শিকড়টা? সরে যাচ্ছে মানুষের পাশ থেকে? “We cannot safely leave politics to politicians, or political economy to college professors.” আচ্ছা হেনরি জর্জ এই উক্তিটি কি নিছক রসিকতারছলেই করেছিলেন?

বিশ্বজিৎ বাবলুর কাঁধে হাত রেখে বললো,”কী রে চুপ মেরে গেলি যে বড়?”

বাবলু সচকিত হয়ে বললো,”না, ও কিছু না। হ্যাঁ, ওই কী যেন নাম বললি — মনে পড়েছে — সনাতন কুন্ডু, আচ্ছা ওনার সাথে একটু দেখা করা যাবে?”

—- রাজনীতির মানুষরা তার কাছে আসুক, এটা তার এখন আর একদম পছন্দ নয়। মানুষটার অনেক পড়াশুনা, অনেক বিষয়ে। খুব ভালোলাগে ওনার সাথে কথা বলতে। উনি পছন্দ করুক আর না-ই করুক আমি যাই মাঝেমধ্যে। ঠিক আছে বলে দেখবো ‘খন। রাজি হলে একদিন নিয়ে যাবে তোকে সঙ্গে করে।

(তিন)

“পাবলিকের সামনে বেশ গুছিয়ে বক্তৃতা করার সময় ছাড়া রাজনীতিতে আজকাল অন্য কোথাও আর আদর্শের তেমন প্রয়োজন পড়ে না।”

সনাতন কুন্ডু হাসতে হাসতে বললেন।

বাবলুর চোখে বিস্ময় ভাসছিল।

“আমি কিন্তু এতটুকুও হেঁয়ালি করছি না। একেবারে ঠিক কথা বলছি। তুমি তো রাজনীতি কর — তুমি তো বুঝতে পারবেই, কিন্তু যারা করে না তারাও পারবে যদি চারপাশে চলা রাজনীতির গন্ধটা একটু শুঁকে দেখে। তবে হ্যাঁ একটা সময় ছিল যখন মতবাদকে কেন্দ্র করে এবং তাকে অক্ষরেঅক্ষরে পালন করার মধ্যে দিয়েই আবর্তিত হত রাজনীতি। আসলে মানুষ তখন অন্তর থেকে রাজনীতি করতো, হৃদয় দিয়ে রাজনীতি করতো, মূল্যবোধের রাজনীতি করতো, মানবিক শুভবুদ্ধিতাড়িত হয়ে রাজনীতি করতো। আর এই কারণে সত্য, সততা, নীতি, মূল্যবোধ এগুলো সম্পর্কে তাকে সদা-সর্বদা সচেতন থাকতেই হতো। সেই যুগটা আর নেই। কবেই গেছে। আমিও ঠিক সেভাবে পাই নি সেই যুগটাকে। আজকে বড্ড বদলে গেছে মানুষ, কিন্তু তার চেয়েও বোধহয় বেশি বদলে গেছে আজকের রাজনীতি। দুর্ভাগ্যের হলেও সত্যি, দেশ-দশের উন্নয়ন নয়, ক্ষমতার ভোগদখল করাটাই যেন আজকের রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য।”

কোনরকম ভূমিকার আশ্রয় না নিয়ে বাবলু সরাসরি জানতে চেয়েছিল,”আপনি রাজনীতি থেকে সরে এসেছিলেন কেন?”

—- হয়তো বুঝেছিলাম, রাজনীতি থেকে আমার আর কিছু পাওয়ার নেই তাই।

—- আমি তো ঠিক তার উল্টোটা শুনেছি, কোনো কিছু পাওয়ার আশা নিয়ে আপনারা রাজনীতি করতেন না।

—- যে কথাটা শুনেছো, সেটা নিয়ে কখনো ভেবে দেখেছো যে বাস্তবতার নিরিখে তার সম্ভাব্যতা কতটুকু? প্রতিটা কর্মের একটা ফল থাকবেই — এটাই তো জাগতিক নিয়ম, তাই কিনা? রাজনীতি করাটাও তো একটা কর্ম, কর্ম নয়? আবার যে আনাড়ি, অর্বাচীন সে ফলের চিন্তা না করে কর্ম করতেই পারে, কিন্তু যে এতটুকু হলেও নিজেকে বিচক্ষণ ভাবতে পারে, সে কেন করতে যাবে? ঠিক উল্টোটাই করবে অর্থাৎ ফলের চিন্তাটা মাথায় রেখেই কর্ম করবে। এই যে কর্মের ফল এবং ফলের নিমিত্ত আগাম চিন্তা এটাই কি প্রকারান্তরে পাওয়া এবং পাওয়ার আশা নয়? তুমিই ভেবে বল, আমি কি ভুল বললাম কিছু?

—- ভুল-ঠিক বিচার করার কত টুকুই বা যোগ্যতা আছে আমার? আমার বোঝায় যদি খুব একটা ভুল না হয়ে থাকে তবে এটুকু আন্দাজ করতে পারছি যে, আপনি যুক্তি দিয়ে যা-ই প্রতিষ্ঠা করতে চান না কেন, অন্য কোনো একটা কিছুকে ইঙ্গিত করতে চাইছেন। ওই ফল বা পাওয়ার মধ্যেই হয়তো সেটা লুকিয়ে আছে।

শব্দ করে হেসে উঠলেন সনাতন কুন্ডু। হাসতে হাসতেই তর্জনী নাচিয়ে নাচিয়ে তারিফ করলেন বাবলুর,”ইউ আর সো ইন্টেলিজেন্ট — স্বীকার করতেই হবে। রাজনীতি একটা সমষ্টিগত শব্দ তাই রাজনীতিতে দল অপরিহার্য। কিন্তু একসময় দল দলবদ্ধভাবেই, নিঃস্বার্থচিত্তে আপামর মানুষের জন্য লড়াই করতো তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, আর আজ দল সেই অধিকারের প্রশ্ন ঝেড়ে ফেলে দিয়ে দলবদ্ধভাবে করেকম্মে খেতে চাইছে। ভন্ডামি-ধাপ্পাবাজি নয়, সত্যিসত্যি যদি নীতি-আদর্শ-বিশ্বাসের প্রশ্নে তুমি দলের আর পাঁচজনের থেকে একটু অন্যরকম হতে চাও, তবে পরিষ্কার জেনে রাখো — সেক্ষেত্রে তোমার জন্য দলে কোথাও কোনো স্থান না-ও থাকতে পারে। তবে দরজা খোলা আছে। আর সেই দরজার বাইরে পা রাখার আগে শুধু একটা কথা ভাববে — হয়তো চারপাশে তোমার জন্য আরো অনেকগুলো দরজা খোলা থাকবে, কিন্তু সেখানেও অন্যরকম কিছু হবে না, ওই নীতি-আদর্শ গুলোকে ওই দরজাগুলোর বাইরে রেখেই ঢুকতে হবে। সব দল দলেদলে এক হয়ে গেছে। তুমি যদি মনে কর পালিয়ে গিয়ে নয়, যা করার দলের মধ্যে থেকেই করবে, তবে বলা যায় না লোকেশ চৌধুরীর মত তুমিও খুন হয়ে যেতে পারো। আর তুমি লাশ হয়ে যাবার আগে ঘুণাক্ষরেও কখনোই জানতে পারবে না যে তোমার নামে শহীদবেদীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার প্রস্তুতিটা তলেতলে শুরু হয়ে গেছে।”

—- কী নাম বললেন?

—- ভরতপুরের লোকেশ চৌধুরী। তাকে তুমি দেখো নি। দেখার কথাও নয়। কারণ যখন সে খুন হয়েছিল তখন তোমার বোধহয় জন্মও হয় নি।

—- হয়েছিল। তখন আমার একবছর বয়স। যদিও অতটুকু বয়সে কোনোকিছুই মনে থাকার কথা নয়। মায়ের মুখে শুনেছি, বাবা খুন হওয়ার কয়েকদিন পরেই আমরা ভরতপুরের পাট চুকিয়ে নতুনবাজারে চলে আসি।

—- তুমি লোকেশ চৌধুরীর ছেলে? অমন আদর্শবাদী, নির্ভীক মানুষ আমি দুটো দেখি নি। আজো যখন মনে পড়ে তখন অবাক হয়ে ভাবি — কী নিখুঁত অপারেশন! সবাই জানে কে বা কারা আছে পিছনে, কিন্তু কোথাও এতটুকুও প্রমাণমাত্র নেই। যদিও লোকেশ চৌধুরী একাই নন। আরো অনেককেই এমন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হয়েছিল। হয়তো এখনো হয়ে চলেছে।

সনাতন কুন্ডু থেমে যাওয়ার অনেকটা সময় বাদে বলা শুরু করেছিল বাবলু —
“আমি জানতাম বাবা দলের আদর্শের জন্য লড়াই করেই শহীদ হয়েছিলেন। আজ এতদিন বাদে সেই জানাটাকে শুধরে নিলাম। না, এতটুকুও অবাক হচ্ছি না। অনেককিছুই তো জানাছিল না!

নিজের ভাবনার মধ্যে খানিক আনমনা থেকে আবারো বললো বাবলু,”এটুকু ভেবেই কষ্ট হয় — যারা তাকে চোখে দেখে নি, তাদের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম কিন্তু এমন মানুষ তো অনেকই আছে যারা তাকে খুব কাছ থেকে দেখেছে — তারাও তো কেউ মনে রাখে নি তাঁকে। তার শহীদবেদীটা অযত্নে, অবহেলায় অনেককাল আগেই জীর্ণ হয়ে গিয়েছিল, এখন তো বনজঙ্গলে ঢেকে গিয়ে আর খুঁজেই পাওয়া যায় না। ভাবতে অবাক লাগে, এতবড় পৃথিবীতে আজ লোকেশ চৌধুরী শুধুমাত্র অমর হয়ে আছে তার বিধবা স্ত্রীর ধূ ধূ সিঁথির শূন্যতায়।”

কথাগুলো বলে উঠে দাঁড়ালো বাবলু।
“আজ তাহলে আসি।”

দুহাতে ভর দিয়ে অনেকটা কষ্ট করেই খাট থেকে নেমে টাল খেতেখেতে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন সনাতন কুন্ডু। বয়সের ভারে দেহটা যেন আর নিতে চায় না। পায়ে পায়ে এগিয়ে এলেন। বাবলুর দুটো হাত নিজের দুটো হাতের মধ্যে নিয়ে বললেন, তোমার বাবা একটা কথা বলতো — ‘নেতাদের দলে দালালি করে হয়তো রাজনীতি করা যাবে কিন্তু সত্যিকারের লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতির চিরস্বপ্নের সেই সমাজ আর দেশটাকে কোনোদিন মানুষের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না।”

মানুষটার চোখে জল। বাবলুর চোখে আগুন। সে আগুনে যেন ঝলসে গেল সনাতন কুণ্ডুর কান্নাভেজা দৃষ্টি। তার শিথিল চোয়ালদুটো এতখানি বয়সে এসেও আবার পাথুরেশক্ত হয়ে উঠতে চাইলো। বাবলুর যৌবন চুঁইয়ে ভেসে আসে বারুদের গন্ধ। বার্ধক্যে মজে যাওয়া বুকে সেই ঘ্রাণ ভরে নিয়ে যেন বিস্ফোরণের নস্টালজিয়ায় আবার উজ্জীবিত হয়ে উঠতে চাইলেন সনাতন কুন্ডু। আর ঠিক তখনই এতদিন জোর করে বুকে চেপে রাখা আত্মগ্লানিগুলো হঠাৎই ডুকরে-ডুকরে কেঁদে উঠলো —-

“আমরাও চেয়েছিলাম …. ভীষণভাবে চেয়েছিলাম … পারি নি … পারি নি ……পরের পর বিফলতা-ব্যর্থতা গুলো শিথিল করে দিয়েছিল আমাদের স্বপ্ন দেখার মনোবলকে। ভঙ্গুর আবেগের আচ্ছন্নতা নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল নতুন করে বুকবেঁধে আবার শপথ নেওয়ার সাহসটুকুকেও। আমরা সরে এসেছিলাম আমাদের পথ থেকে। না না, পালিয়ে এসেছিলাম। কী জানি হয়তো ভয় পেয়েও থাকতে পারি। বিশ্বাস করো, আমরা স্বীকার করি — কাজটা ঠিক করি নি। কিন্তু অমন কাজ তোমরা কক্ষনো করো না। কক্ষনো না….”

উত্তেজনায় হাঁফাতে থাকেন সনাতন কুন্ডু। লম্বালম্বা দম নিতে নিতে বেশ কয়েকটা মুহূর্ত নীরবতার আশ্রয় নিলেন। তারপর আবার শুরু করলেন।

“আবারও বলছি, আমরা যে ভুলটা করেছিলাম, তুমি বা তোমরা যেন সেই ভুলটা কখনোই করো না। দলের মধ্যে ঈপ্সিত লক্ষ্যের পথটা খুঁজে না পেয়ে যদি কখনো বাইরে বেরিয়ে আসতেই হয়, তবে একেবারে ঘরে ঢুকে যেও না। দৃষ্টি প্রসারিত করে ভালোভাবে চারপাশটা তাকিয়ে দেখো। দেখবে এদেশের সিংহভাগ মানুষই দলের বাইরে। গণতন্ত্রের ললাটে কেবলমাত্র জয়টিকা এঁকে দিতেই ওরা বারবার দলেদলে দল থেকে দলে ভেসে বেড়ায় যাযাবরের মত। ওরা জাতেপাতে, বর্ণেলিঙ্গে, ভাষায়ধর্মে ভেঙেচুরে গিয়ে কখনো, কোনোদিন একদল হতে পারে নি। অথচ ওরা জানেও না, ওরা কী ভীষণভাবে দলবদ্ধ হতে চায়। সত্যি কথা বলতে কী জান — ওরা কোনো দলই চায় না, শুধু দলবদ্ধ হবার জন্য নেতা চায়। সত্যিকারের নেতা। সেই নেতা যে ওদের টুকরোটুকরো পরিচয়গুলোকে দূরে সরিয়ে দিয়ে মানুষের একটা বিরাট পরিচয়ে এক করে মিলিয়ে দেবে ওদেরকে।…”

হঠাৎ বলা থামিয়ে একেবারে চুপ মেরে গেলেন সনাতন কুন্ডু তারপর আচমকাই হো হো করে হেসে উঠে বললেন, “আমি নিজেই একজন পরাজিত সৈনিক, তোমাকে আবার জ্ঞান দিচ্ছি….” হাসি থামিয়ে আবারো নিশ্চুপ রইলেন তিনি।

কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল বাবলু। কিন্তু ঠিক তখনি আবার বলা শুরু করলেন সনাতন কুন্ডু —

তবুও বলছি, এই যে এতসব বললাম তোমাকে তার সবটুকুই ওই একসময়ে মানুষকে সাথে নিয়ে চলার বাস্তব অভিজ্ঞতার উপলব্ধি। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে নিটোল একটা সফলতার সম্পূর্ণতাকে চোখে দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নি। আসলে আচমকা আঘাতে উদাসীন সময়ের একটা দীর্ঘপর্যায়ে আমাদের চোখে কোনো সাড়া ছিল না। তারপর দৃষ্টি যখন চেতনায় ফিরেছিল, ততক্ষণে জীবনে সন্ধ্যে নেমে গিয়েছে। আর কিচ্ছুটি দেখার উপায় ছিল না। নিজেদের দোষেই বড্ড দেরি করে ফেলেছিলাম।”

বাবলুর দুচোখের অণ্বেষায় তখন অপ্রতিরোধ্য গতিময়তা। সনাতন কুণ্ডুর দুচোখের তারায় ঘোলাটে ছানির পুরু আচ্ছাদনে লেপ্টে থাকা সময়ের স্তব্ধব্যবধান মুহূর্তে উড়ে গিয়েছিল খড়কুটোর মতো। তাঁর ভাবনায় মানুষের বুকের ঝড় আবার পথ খুঁজে নিয়েছিল তার পরিচিত ধারাবাহিকতায়।

বাবলু নিচু হয়ে পা ছুঁতেই তার মাথায় আশীর্বাদের হাত রাখলেন সনাতন কুন্ডু। তার দুচোখে তখন আনন্দাশ্রু। মুখে স্বর্গীয় প্রশান্তি। কণ্ঠে সংশয়াতীত বিশ্বাস।
“আমি জানি তুমি লোকেশ চৌধুরীর ছেলে, তাই তুমি আর যা-ই হও, থেমে যাওয়ার ছেলে নও। আমার তো বয়স হয়েছে, তাই বলছি, এটুকু যেন দেখে যেতে পারি যে তুমি শুরুটা অন্তত করেছো। চিন্তা করো না, ততদিন আমি যেমন করে পারি মৃত্যুকে ঠিক ঠেকিয়ে রাখবোই।”

আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



নতুন প্রকাশিত

হোম
শ্রেণী
লিখুন
প্রোফাইল