অজিত ওয়াদেকার : ভারতীয় ক্রিকেটের  গেম চেঞ্জার

প্রোজ্জ্বল বন্দোপাধ্যায়
4.3 রেটিং
2032 পাঠক

2018 সালের আগস্ট মাস টিকে যুগাবসানের সন্ধিক্ষণ বললে বোধ হয় খুব অত্যুক্তি হবে না। এই মাসেই চলে গেলেন ভারতের তিনটি জনপ্রিয় ক্ষেত্রের তিন আইকন। অটলবিহারী বাজপেয়ী যদি হন সুশাসনের মুখচ্ছবি, সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় যদি হন সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শ ব্যক্তিত্ব, তখন অজিত ওয়াদেকার নিঃসন্দেহে স্থান পাবেন ভারতীয় ক্রিকেটের অন্দরমহলে। একশো ত্রিশ কোটির দেশে কত ক্রিকেটার ই তো আসেন, হারিয়ে ও যান। অজিত সেখানে এক উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। খেলোয়াড় হিসেবে অসাধারণ কৃতিত্বের অধিকারী না হওয়া সত্ত্বেও অনায়াসে তিনি জায়গা করে নিতে পারেন ভারতীয় ক্রিকেটের হল অফ ফেমে।
                            যাঁকে নিয়ে আজ আমাদের আলোচনা, ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব কি? অপর কথায়, গাভাসকার, তেন্ডুলকর, কোহলি দের মত ব্যাটসম্যান উপহার দিয়েছে যে দেশ, সেই ভারতে ওয়ান ডাউন ব্যাট হিসেবে ওয়াদেকারের স্থান কোথায়? অপ্রিয় সত্য এটাই যে, মাত্র একটা টেস্ট শতরানের অধিকারী ওয়াদেকারের  স্থান ভারতীয় ব্যাটিংয়ের রথী মহারথীদের তালিকায় আদৌ আসে না। ওয়াদেকার অনন্য প্রথমে অধিনায়ক, পরে কোচ হিসেবে দুর্দান্ত মগজাস্ত্রের প্রয়োগের জন্য। অধিনায়ক হিসাবে অত্যন্ত কঠিন সময়ে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় তাঁর হাতে। তার আগে পর্যন্ত ভারতীয় ক্রিকেট আর মনসুর আলি খান পতৌদি সমার্থক ছিলেন। পতৌদি  অধিনায়ক হিসাবে দলকে দিশা দেখাতে ব্যর্থ হওয়ার পরেই দায়িত্ব নেন অজিত। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, এমনকি দলের অভ্যন্তরেও পতৌদির প্রভাব অত্যন্ত বেশি থাকায় কার্যত কাঁটার মুকুট পরেই যুদ্ধে নামতে হয় ওয়াদেকারকে। কিন্তু নিজের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব কাজে লাগিয়ে দলের রাশ নিজ হাতে নিতে দেরি করেননি তিনি। অধিনায়ক হিসাবে অত্যন্ত ভাল  ম্যাচ রিডিংয়ের জন্য সুনাম আছে তাঁর।ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসে বিদেশে সিরিজ জয়ের অমৃত পানের ঘটনা ঘটে তাঁরই নেতৃত্বে। দিগ্বিজয়ী ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরাজয়, তাও আবার দেশের মাটিতে, ছিল অভাবনীয় ঘটনা। কিন্তু কঠিন এই কাজটি অনায়াসে করে ফেলে ওয়াদেকারের নেতৃত্বাধীন তরুণ ভারতীয় দল। 1971 এর ইংল্যান্ড সফরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সিমিং কন্ডাক্টর ও মেঘলা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়াকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তুখোড় গেমপ্ল্যানে বাজিমাত করেন ওয়াদেকার। কিন্তু একইসাথে অধিনায়ক হিসেবে একাধিক তরুণ প্রতিভাকে জায়গা করে দেওয়া এবং তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ভারতীয় ক্রিকেট তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। কারণ ঐ তরুণ ক্রিকেটার দের মধ্যে দুটি নাম ছিল সুনীল গাভাসকার এবং গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ, আর দশ বছরের মধ্যেই যাঁরা পরিণত হবেন কিংবদন্তীতে। জহুরির ভুল হয়নি জহর চিনতে! বহু বছর পর সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াদেকার মডেল অনুসরণ করে ফের তুলে আনেন একঝাঁক প্রতিভা।অনেকেই দাবি করেন অসাধারণ বাঁহাতি  ব্যাটসম্যান ছিলেন অজিত, নেতৃত্বের চাপের কারণে তাঁর ব্যাটিং প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পায়নি। যদিও ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীরা তাতে দুঃখিত নন। ওয়াদেকারের মধ্যে ভারতীয় ক্রিকেট পেয়েছিল আদর্শ এক অধিনায়ককে, যিনি জানতেন জিততে, চাইতেন জিততে, পারতেন জিততে। নেতিবাচক মনোভাবের কোন স্থান ছিল না অধিনায়ক ওয়াদেকারের নোটবুকে। তরুণ খেলোয়াড়দের সুযোগ দিতেন অকৃপণ ভাবে, কারণ জিততে ভালবাসতেন তিনি এবং জিততে গেলে যে ঝুঁকি নিতে হয়, তা বিলক্ষণ জানতেন। যে মনোভাবের পরিচয় আমরা পাই ভারতীয় ক্রিকেটে তাঁর দ্বিতীয় ইনিংসে ও।
                                                                  নব্বইয়ের দশকে পুনরায় প্রত্যাবর্তন ঘটে অজিত ওয়াদেকারের। কোচ হিসেবে তাঁকে নিয়োগ করে তাঁর দুর্দান্ত ক্রিকেটবুদ্ধির ফসলটুকু তুলতে চেয়েছিল বিসিসিআই এবং পুনর্বার ভারতীয় ক্রিকেটের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি তিনি নিজেও। সফল অধিনায়ক ছিলেন বলেই হয়তো বুঝেছিলেন এই খেলায় কোচের ভূমিকা সীমিত, অধিনায়কই সর্বেসর্বা। তুখোড় ম্যান ম্যানেজমেন্ট দক্ষতার অধিকারী ওয়াদেকারের ভুল হয়নি নিজের  কাজটা বুঝে নিতে। অধিনায়ক হওয়ার মতোই এক সন্ধিক্ষণে তিনি কোচের দায়িত্ব নেন যখন কপিল দেবের মত খেলোয়াড়দের ক্রিকেটজীবন উপস্থিত হয়েছে গোধূলিলগ্নে এবং পুব আকাশে উদয় হচ্ছেন সচিন তেন্ডুলকার, অনিল কুম্বলেরা। সর্বোপরি মহম্মদ আজহারউদ্দিনের মত এক তরুণ অধিনায়ক। দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আজহার-ওয়াদেকার জুটি চলে আসে আলোচনার কেন্দ্রে। বলাই বাহুল্য যে,অধিনায়ককে ওয়াদেকারের মত বিতর্কহীন ভাবমূর্তি কোচ ওয়াদেকারের ছিল না। সাফল্য সত্ত্বেও বেশ কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেছেন কোচ ওয়াদেকার। তাঁর সময়েই শুরু হয় দেশের মাটিতে ভারতের জয়যাত্রা। খোলাখুলি টার্নিং  পিচ বানিয়ে দুই বা তিন স্পিনার লেলিয়ে দিয়ে তিন দিনের মধ্যে যেনতেন প্রকারেণ বিদেশী দলগুলিকে বধ করা- এই গেমপ্ল্যানকে প্রায় শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল আজহার-ওয়াদেকার জুটি। ওয়াদেকার মনে করতেন দেশের মাঠে খেলার সুবিধা নেওয়া অন্যায় কিছু নয়। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত স্পিন নির্ভরতা ভোঁতা করে দেয় ভারতের পেস আক্রমণ। এর প্রভাব পড়ে বিদেশে দলের পারফরমেন্সে । একের পর এক বিদেশি সফরে কচুকাটা হতে থাকে ভারত। পশ্চিমী মিডিয়া ভারতীয় দলকে বলতে শুরু করে ,’’দেশে বাঘ, বিদেশে বিড়াল ‘’। যদিও ওয়াদেকারের এতে বিশেষ হেলদোল ছিল না । দেশের মাটিতে সাফল্যের জন্য স্পিনের সঙ্গ ছাড়তে তিনি মোটেই রাজি ছিলেন না । 1996 বিশ্বকাপ যেহেতু উপমহাদেশের মাটিতেই হয়েছিল, তাঁর মতের সমর্থক ও কম ছিল না। সে বিশ্বকাপে অত্যন্ত সাড়া জাগিয়ে শুরু করেও ইডেনের সেই  বিখ্যাত সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে বিদায় নেয় ভারত। ঘটনাচক্রে আজহার-ওয়াদেকার জুটির টসে জিতে নেওয়া ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্তই হারের অন্যতম কারণ বলে বিবেচিত হয়। সেটিই ছিল কোচ ওয়াদেকারের শেষ ম্যাচ। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন যে ওয়াদেকার সেই ম্যাচে জয়ের ব্যাপারে এতই নিশ্চিত ছিলেন যে, আকস্মিক হারের পরে বহুক্ষণ কথাই বলতে পারেননি । কোচ ওয়াদেকারের প্রস্থান তাই সুখের হয়নি।
              ভারতীয় ক্রিকেটে অজিত ওয়াদেকারের অবদান খেলোয়াড় হিসেবে যতটা, তার থেকে অনেক বেশি তুখোড় মগজাস্ত্রের প্রয়োগের জন্য ।  অধিনায়ক, কোচ এবং পরবর্তীতে নির্বাচক হিসেবে সেই মগজাস্ত্রের শক্তির প্রমাণ তিনি দিয়ে গেছেন। সুনীল গাভাসকারের অভিষেক এবং একদিনের ক্রিকেটে  ওপেনার হিসেবে সচিন তেন্ডুলকারের আবির্ভাব – দুটির সাথেই জড়িত তাঁর নাম। রঞ্জি ট্রফি হোক বা অন্য প্রথম শ্রেণীর প্রতিযোগিতা- কোথাও এর আগে ওপেন করেননি সচিন । অথচ নিউজিল্যান্ডের মত কঠিন সফরে তাঁকেই অজিত নামিয়ে দেন ওপেনার হিসেবে । বাকিটা ইতিহাস। তাই তো এতে অবাক হবার কিছুই নেই যে  আজীবন তাঁকে ভারতীয় ক্রিকেটমহল শ্রদ্ধাবনত চিত্তে ‘স্যার ‘ বলে সম্বোধন করেছে। আজহারউদ্দিন যথার্থই বলেছেন –‘’অজিত স্যার ই প্রথম মানুষ যিনি দলকে জেতার জন্য মাঠে নামাতেন, ড্রয়ের জন্য নয়।‘’ অধিনায়ক ও কোচ হিসেবে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুয়ের সাক্ষী থেকেছেন অজিত। কিন্তু তাঁর যথার্থ মূল্যায়ন করার জন্য সুনীল গাভাসকার একটিমাত্র মন্তব্যই যথেষ্ট –‘’He will always remain my captain. ‘’ এখানে গাভাসকার যেন হয়ে ওঠেন ভারতের ক্রিকেটমহলের প্রতিনিধি।
                                                          ————————————————————–

আপনার রেটিং দিন:
[Total: 3 Average: 4.3]
আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন:

রেটিং ও কমেন্টস জন্য



  • প্রত্যূষ রায়
    প্রত্যূষ রায় October 8, 2018 at 1:13 am

    বাহ ,ভাই

  • Niloy October 30, 2018 at 10:46 am

    দারুন।

  • নতুন প্রকাশিত